বাদশার কোনো অনুগ্রহ লাভের জন্য দরবারে হাজির হলেই কিছু না-কিছু উপঢৌকন সঙ্গে নিয়ে যেতে হয়। প্রতিদানে বাদশা সেই উপঢৌকনের বহুগুণ ফিরিয়ে নেয়। প্রজাসাধারণ যখন এই উপঢৌকন আদান-প্রদানের ব্যাপারে অভ্যস্থ হয়ে উঠলো, ভারত ও সিন্ধুর মহাজনগণ তখন প্রজাদের হাজার-হাজার দিনার ধার দিয়ে অথবা উপঢৌকনের সামগ্রী জোগান দিয়ে সাহায্য করতে লাগল। মহাজনরা বিদেশী আগন্তুকদের প্রয়োজন মতো টাকা তো ধার দেয়ই; অধিকন্তু নিজেরাও খাটে। তারপর নবাগত ব্যক্তি একদিন সুলতানের সঙ্গে দেখা করে যে মূল্যবান উপঢৌকন পায় তার থেকেই তাদের দেনা পরিশোধ হয়। মহাজনদের এ ব্যবসায়টি বেশ লাভজনক। সিন্ধুতে পৌঁছে আমাকেও এই পন্থাই অনুকরণ করতে হলো। একজন মহাজনের কাছ থেকে আমি ঘোড়া, উট ও শ্বেতকায় পেলাম। এবং সেই সঙ্গে আরো কয়েকটি প্রয়োজনীয় জিনিষ সংগ্রহ করে নিলাম। এছাড়া গাজনার এক ইরাক সওদাগরের কাছ থেকে আগেই আমি ত্রিশটি ঘোড়া, একটি উট এবং এক বোঝা তীর কিনেছিলাম। সে গুলোও পরে সুলতানের দরবারে সওগাত দিয়েছি। এই মহাজনটি কিছুদিনের জন্য খোরাসানে চলে যায় এবং ভারতে ফিরে এসে আমার কাছ থেকে প্রাপ্য টাকা আদায় করে নিয়ে যায়। একমাত্র আমাকে দিয়েই সে বহু টাকা মুনাফা করে একজন খ্যাতনামা মহাজন বা সওদাগর বলে গণ্য হয়। এ-ব্যাপারে বহু বছর পরে এই মহাজনটির সঙ্গে আমার একবার দেখা হয় আলেসো বন্দরে। আমার যথাসর্বস্ব তখন বিধর্মীরা লুট করে নিয়ে গেছে। সে-অবস্থায় এ-লোকটির শরণাপন্ন হয়ে কোনো সাহায্যই আমি সেদিন পেলাম না।
সিন্ধু নদী পার হয়ে আমাদের পথ আরম্ভ হলো নলখাগড়ার ভিতর দিয়ে। এই বনেই জীবনের প্রথম আমি একটি গণ্ডার দেখতে পেলাম। ক্রমাগত দু’দিন হাঁটার পর আমরা এসে পৌঁছলাম জানানী নামক এক শহরে। সিন্ধু নদীর তীরে জানানী সুন্দর একটি শহর। এর অধিবাসীদের বলা হয় সামিরা। সাতশো বারো খ্রীষ্টাব্দে আল-হাজ্জাজ এর কাল থেকে এদের পূর্বপুরুষরা এখানে বসবাস করেছে। এরা কারো সঙ্গেই কখনো একত্র আহার করতে রাজী হয় না। এমন কি আহারের সময় কাউকে দেখাও দেয় না। তাছাড়া নিজেদের গণ্ডীর বাইরে কখনো বিয়ে-থা করতে বা দিতে রাজী হয় না। জানানী ছেড়ে আমরা গিয়ে পৌঁছলাম সিওয়াসিতান (সেহওয়ান) নামক এক বড়ো। শহরে। শহরটার বাইরেই বালুকাময় মরুভূমি। একমাত্র বাবলা জাতীয় গাছ ছাড়া এ মরুভূমিতে অপর কোনো গাছপালার চিহ্নই নেই। এখানকার নদীর তীরবর্তী অঞ্চলেও একমাত্র লাই ছাড়া বড়ো একটা কিছুই ফলে না। অধিবাসীদের প্রধান খাদ্য যোয়ার ও মটরের তৈরী রুটি। তাছাড়া এখানে পাওয়া যায় প্রচুর মাছ আর মোষের দুধ, এরা ছোটো এক প্রকার টিকটিকি জাতীয় জীবের মাংস খায়। এ ক্ষুদ্র জীবটিকে এদের খেতে দেখেই আমার কিন্তু ঘৃণার উদ্রেক হয়। আমি কখনো ও-জিনিষ খেতে রাজী হইনি।
আমরা সিওয়াসিতানে এসে পৌঁছি গ্রীষ্মের সবচেয়ে গরমের সময়টায়। অসহ্য গরম। আমার সঙ্গীরা তো প্রায় উলঙ্গই কাটাতে লাগল। তারা শুধু কোমরে জড়াতো এক টুকরা কাপড় আর কাঁধে ভিজিয়ে রাখতে এক টুকরা। গ্রীষ্মের প্রবল উত্তাপে অল্পক্ষণের মধ্যেই কাপড় শুকিয়ে যেতো, অনবরত তারা সে কাপড় পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখতো।
এই শহরেই আমি খোরাসানের প্রসিদ্ধ চিকিৎসক আলা-অল-মুলকের প্রথম সাক্ষাৎ পাই। এক সময়ে তিনি ছিলেন হিরাতের কাজী। সেখান থেকেই ভারতে আসেন এবং সিন্ধুর লাহারী শহরের শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। আমি তাঁর সঙ্গেই এ-অঞ্চলে ভ্রমণে বের হব সঙ্কল্প করি। শাসনকর্তা আলা-অল-মুলকের পনর-খানা জাহাজ। নিজের লটবহর এবং লোকজন নিয়ে এই সব জাহাজের সাহায্যে তিনি নদী-পথে যাতায়াত করেন। জাহাগুলোর একখানার নাম ‘আহাওড়া-দেখতে ঠিক আমাদের দেশের এক মাস্তুল ও ছোট্ট পালওয়ালা জাহাজের মতো কিন্তু পাশে চওড়া, লম্বায় ঘোট। আহাওড়ার মধ্যখানে সিঁড়িওয়ালা কাঠের তৈরি একটি কেবিন। কেবিনটির উপরিভাগে স্বয়ং আলা-অল মুলকের বসবার আসন। তাঁর সামনে বসেন আমীর ওমরাগণ, দক্ষিণ ও বামে বসে। ক্রীতদাসের দল, নিচে দাঁড় টানে চল্লিশজন দাড়ী। আহাওড়ার সঙ্গে-সঙ্গে দু’পাশে চলতে থাকে অপর চারখানা জাহাজ। তার দু’খানায় থাকে পতাকা এবং দামামা শিক্ষা প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র আর গায়কের দল। প্রথমেই বেজে ওঠে দামামা আর শিক্ষা, তারপর আরম্ভ হয় গান। এমনি করে একটার পর একটা চলতে থাকে ভোর হতে শুরু করে মধ্যাহ্ন-আহারের সময় অবধি। আহারের সময় হলেই জাহাজগুলো একত্র সংলগ্ন করা হয়। গায়ক ও বাদকের দল আহাওড়ায় গিয়ে ওঠে। শাসনকর্তার আহার শেষ না হওয়া। অবধি সেখানে একটানা গান বাজানো চলতে থাকে। শাসনকর্তার আহার শেষ হলে অপর সবাই আহার করে। তারপর জাহাজ আবার চলতে থাকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। সন্ধ্যা হলে নদীর তীরে তাবু খাটানো হয়। শাসনকর্তা তীরে অবতরণ করলে পুনরায় নৈশ আহারের আয়োজন হয়। নৈশ-আহারে দলের প্রায় সকলেই তাঁর সঙ্গে যোগদান করে। রাত্রে এশার নামাজের পর তাবুতে পালা করে প্রহরীদল স্থাপন করা হয়। এক দলের কাজ শেষ হলেই দলের একজন চীৎকার করে সময় ঘোষণা করে। তারপর ভোর হবার সঙ্গে সঙ্গেই বেজে ওঠে দামামা আর শিঙ্গা। ফজরের নামাজ শেষ হলেই আহারের পর। আবার যাত্রা শুরু হয়।
