১০। শারাব পানের জন্য ইসলামী আইন অনুসারে চল্লিশটি বেত্রাঘাতের বিধান রয়েছে।
১১। মেশহেডের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত শহরটি শেখ জাম্ নামে পরিচিত। ইব্নে বতুতা যখন খোরাশান প্রদেশে প্রবেশ করেন তখন সেটা পারশ্য এবং ইরাকের মোঙ্গল সুলতান কর্তৃক শাসিত হচ্ছিল, অন্ততঃ নামে।
১২। মাশহাদ নামের অর্থ হচ্ছে আর-রিদের সমাধি মন্দির। আর-রিদ পদবীতে শিয়া ইমামগণ পরিচিত। এটা যে ইমামের সমাধি তিনি ছিলেন অষ্টম ইমাম আলী ইব্নে মুসা। ৮১৮ খ্রীষ্টাব্দে এঁর মৃত্যু হয়। খলিফা হারুণ অর-রশিদ ৮০৯ খ্রীষ্টাব্দে তুষে মৃত্যু বরণ করেন, যখন খোরাশানের সীমান্তে একটি অভিযান চালনা করছিলেন।
১৩। এখন তুরাবাত-ই হায়দরী, মেশহেদের দক্ষিণে অবস্থিত। যে ভাবে এ শহর দুটির উল্লেখ করা হয়েছে তাতে ব্যাপারটা সম্পূর্ণ জটিল বলে মনে হয় এবং বিশেষ করে সারাখুসের অবস্থান জাম্ এবং তুষের মাঝখানে হওয়া চাই–কিম্বা বিস্তাম থেকে ফিরবার পথে এটা হওয়া চাই।
১৪। ক্যাপিয়ান সাগরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে আস্তানাবাদের দক্ষিণ-পূর্বে বিস্তাম অবস্থিত।
১৫। এখানে পুনরায় বর্ণনার মধ্যে একটি ফাঁক দেখা যায়। ক্যাপিয়ান থেকে ইনে বতুতা আঙ্গানিস্তানের উপর দিয়ে যাচ্ছেন, সেখানে একই নামের নদীর তীরে কুন্দুজ অবস্থিত এবং কিছু দূরে দক্ষিণে একই নদীর তীরে অবস্থিত বাঘলান। আফগানিস্থানের পূর্ব অঞ্চলের অর্ধেক গজনী পর্যন্ত এ সময়ে জামাতে খানের অধীনে ছিল।
১৬। ইব্নে বতুতা খাওয়া গিরিপথের রাস্তা অনুসরণ করেছিলেন (১৩,০০০ ফিট উঁচু)। এটা কাবুলের উত্তর-পূর্বে।
১৭। গজনীর মাহমুদ, যিনি ৯৯৮ থেকে ১০৩০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেছেন তিনি উত্তর ভারতে মুসলিম রাজ্য স্থাপনের পথ রচনা করেন সিন্ধু পাঞ্জাব, এবং নিকটবর্তী প্রদেশসমূহে নির্মম আক্ৰমণ দ্বারা।
১৮। বিবরণের ভিত্তিতে একথা স্থির করা কঠিন যে ইব্নে বতুতা প্রকৃতভাবে কোন্ পথে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন। আফগান রাহাজান দস্যুদের সম্বন্ধে গল্পটি একটা নিয়মিত পথের নির্দেশ দিচ্ছে–এবং শাশনগর হস্তিনা নগর বলে স্থির করা হয়েছে। এটা পেশোয়ারের নিকটে। এ সব উক্তি একত্রে নির্দেশ করছে খাইবার গিরিপথ। অন্যদিকে পনের দিনের পথে বিস্তৃত একটি মরুভূমির উল্লেখ এবং সে সঙ্গে ইব্নে বতুতার গজনী পরিদর্শন (ভুলভাবে কাবুলের পূর্বে স্থাপন করা হয়েছে) নিদের্শ করছে সুলেমান পর্বতমালার ভিতর দিয়ে কোনো প্রচ্ছন্ন পথের সেটা সিন্ধু নদীর নিম্নভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
০৬. সিন্ধু নদীর তীরে
ছয়
হিজরী সাত-শো চৌত্রিশ সাল। মহরম মাসের পয়লা রাত্রি মোতাবেক ইংরেজী ১৩৩৩ খ্রষ্টাব্দের ১২ই সেপ্টেম্বর। মাথার ওপর মহরমের নূতন চাঁদ। আমরা এসে পৌঁছলাম সিন্ধু ও ভারত সাম্রজ্যের সীমান্তে পাঞ্জাব (সিন্ধু) নদীর তীরে; প্রথমেই এসে আমাদের সঙ্গে দেখা করলেন সুলতানের গোয়েন্দা কর্মচারীরা। তারা আমাদের সম্বন্ধে জ্ঞাতব্য বিষয়ের লিখিত বিবরণী পাঠিয়ে দিলেন মুলতানের শাসনকর্তার কাছে। সিন্ধু থেকে রাজধানী দিল্লী পদব্রজে পঞ্চাশ দিনের পথ। কিন্তু সরকারী ডাক-ব্যবস্থায় গোয়েন্দা কর্মচারীদের পুত্র সুলতানের হাতে পৌঁছতে লাগে মোটেই পাঁচ দিন। ভারতে ডাক চলাচলের ব্যবস্থা দুই প্রকার। প্রথমত: ঘোড়সওয়ার দূতের সাহায্যে চালিত ডাক। প্রতি চার মাইল পথের এক তৃতীয়াংশ গেলেই পাওয়া যায় একটি করে লোকালয়। লোকালয়ের বাইরে তিনটি তাবু খাটানো। তাবুর মধ্যে তৈরী হয়ে বসে থাকে ডাক হরকরা। তাদের প্রত্যেকের হাতেই দেড় গজ লম্বা একটা লাঠি। লাঠির মাথায় পিতলের ঘন্টা বাধা। এক হাতে পত্র আর অপর হাতে ঘন্টা বাধা লাঠি নিয়ে প্রথম ডাক হরকরা। শহর থেকে বেরিয়েই প্রাণপণে দৌড়াতে আরম্ভ করে। এদিকে ঘন্টার আওয়াজ কানে। যেতেই তাবুর হরকরা তৈরী হয়ে দাঁড়ায় দৌড়বার জন্য। তারপর আগের লোকটা পৌঁছতেই পত্ৰখানা ছিনিয়ে নিয়ে ঘন্টা বাজাতে-বাজাতে সেও দৌড়াতে আরম্ভ করে। এমনি করে পত্রখানা গন্তব্য স্থানে গিয়ে পৌঁছে। ঘোড় সওয়ার ডাকের চেয়েও শেষোক্ত ডাক কিন্তু দ্রুতগামী। অনেক সময় এ-উপায়ে সুলতানের জন্য খোরাসান থেকে ভারতবর্ষে ফল আমদানী করা হয়। ভারতে খোরাসানী মেওয়ার কদর খুব বেশি। ঠিক একই উপায়ে আবার নামকরা অপরাধীদের (Criminals) এক স্থান হতে অন্য স্থানে। নেওয়া হয়। অপরাধীকে খাঁটিয়ার ওপর তুলে বাহকরা মাথায় করে বয়ে নিয়ে যায়। সুলতান যখন দৌলতাবাদে বাস করেন তখন কংক (গঙ্গা) নদী থেকে তার পানীয় জল-বাহকেরা এই উপায়েই বয়ে নিয়ে আসে। অথচ দৌলতাবাদ থেকে গঙ্গা চল্লিশ দিনের পথ।
গোয়েন্দা কর্মচারী কোনো নবাগতের বিষয় লিখে পাঠালে সুলতান তা অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন। কর্মচারিরাও এ-ব্যাপারে খুব যত্ন নিয়ে থাকেন। নবাগত বিদেশীর চেহারা ও পোষাক-পরিচ্ছদ কেমন, সঙ্গে কত লোকজন, ক’টি বাদী, চাকর, পশুই বা ক’টি সব কিছুর বিবরণ সুলতানকে লিখে পাঠানো হয়। তার আচার ব্যবহার থেকে আরম্ভ করে হাবভাবের খুঁটিনাটি কিছুই বাদ পড়ে না।
সিন্ধুর রাজধানী মুলতানে পৌঁছে নবাগত ব্যক্তিকে অপেক্ষা করে থাকতে হয়। সুলতানের অনুমতি-পত্রের জন্য। তাকে কতটুকু আতিথেয়তা দেখাতে হবে অনুমতি পত্রের সঙ্গে তারও নির্দেশ সুলতানের কাছ থেকেই আসে। এখানে বিদেশী লোকদের। মর্যাদা ঠিক করা হয় তার কাজকর্ম ও চলাফেরার হাবভাব দেখে। কারণ, তার বংশ পরিচয় থাকে সকলের অজ্ঞাত। সুলতান মাহমুদ বিদেশীদের সম্মান করেন নিজের অধীনে তাদের শাসনকর্তা বা অপর কোনো উচ্চপদে বহাল করে। তার সভাসদ, রাজকর্মচারী, উজির, হাকিম ও আত্মীয় স্বজনের অধিকাংশই বিদেশাগত। তাঁর হুকুম অনুসারেই এখানেই বিদেশীদের উপাধি হয়েছে ‘আজিজ’ বা মাননীয়।
