কাবুল থেকে অশ্বারোহণে আমরা কারমাশ পৌঁছলাম। আফগানদের অধিকারে কারমাশ দুটি পাহাড়ের মধ্যস্থলে অবস্থিত একটি দূর্গ। এখানে পৌঁছলে পথিকদের তারা বাধা দেয়। সে-পথে আসবার সময় আমাদের সঙ্গেও তাদের একবার সংঘর্ষ বেধেছিল। পর্বতের নিম্নে ঢালু জায়গায় ছিল তাদের অবস্থান। আমরা তীর ছুঁড়তেই তারা পালিয়ে যায়। আমরা হালকা জিনিষপত্র সহ পথ চলছিলাম এবং আমাদের সঙ্গে ঘোড়া ছিল প্রায়। চার হাজার। আমার ছিল উট। তার ফলে আমাকে কাফেলা থেকে পৃথক হয়ে পড়তে হলো। আমি যে দলে তখন যুক্ত হলাম সে দলে কয়েকজন আফগানও ছিল। মোট বহরের ভার কমানোর উদ্দেশ্যে আমরা পথের পাশে কিছু খাদ্যবস্তু ফেলে গেলাম। উটগুলো ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল বলে তাদের বোঝাও কমিয়ে দিলাম। পরের দিন আমাদের ঘোড়াগুলো ফিরে এসে সে-সব জিনিস নিয়ে যায়। আমরা সন্ধ্যার পরে কাফেলার সঙ্গে মিলিত হলাম এবং শাশ নগরে রাত কাটালাম। তুর্কীদের দেশের সীমান্তে এটি জনঅধ্যুষিত শেষ শহর। এখান থেকে রওয়ানা হয়েই আমরা বিশাল মরুভূমিতে প্রবেশ করলাম। এ মরুভূমি পনরো দিনের পথ অবধি বিস্তৃত। এ মরুভূমি বছরে শুধু একবারই অতিক্রম করা যায় যখন ভারতে ও সিন্ধুদেশে বৃষ্টিপাত হয় অর্থাৎ জুলাই মাসের১৮ প্রারম্ভে। এ মরুভূমিতেই মারাত্মক সাইমুম বায়ু প্রবাহিত হয়। আমাদের অগ্রবর্তী একটি কাফেলা এখানে এলে অনেক উট ও ঘোড় প্রাণ হারায়। খোদাকে অশেষ ধন্যবাদ। আমরা নিরাপদেই পাঞ্জাব অর্থাৎ পঞ্চনদী (সিন্ধুনদী) নামক সিন্ধুদেশের নদীর কাছে এসে পৌঁছলাম। এ নদীগুলো প্রবাহিত হয়ে বড় একটি নদীতে পড়ে এবং দেশে জল সেচনের কাজ করে। আমরা যখন এ নদীর কাছে এসে পৌঁছি তখন ৭৩৪ হিজরীর মহরম মাসের নতুন চাঁদ (১২ই সেপ্টেম্বর ১৩৩৩) আমাদের মাথার উপরে উঠেছে। এখানে পৌঁছবার পর গোয়েন্দা কর্মচারীগণ আমাদের সম্বন্ধে সকল বিবরণ ভারত সম্রাটের কাছে লিখে পাঠালেন।
এ সফরের কাহিনী এখানেই সমাপ্ত। সমস্ত প্রশংসা সর্বশক্তিমান ও দয়ালু খোদার।
টিকা
পরিচ্ছেদ ৫
১। সারাচুক বা সারাইজিকের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে উরাল নদীর মুখে গুরিয়েভের নিকট কাসৃপিয়ান সমুদ্রের কিছু দূরে।
২। খাওয়ারিজম নামটি ব্যবহৃত হতো সমস্ত মধ্যযুগ ব্যাপী কিছু সময়ের জন্য খোরেজমিয়ার প্রধান শহরের ব্যাপারে। এ জেলাটি এখন খিভা নামে পরিচিত। এ সময়ে সেটা ছিল কুলিয়া উরগেঞ্চের শহর।
৩। কাঁচের পাত্র এবং কাঠের চামচ তারাই ব্যবহার করতেন, যাদের ধর্মীয় স্পর্শকাতরতা নিরত করতে সোনার পাত্রাদি ব্যবহারে। এটা নিষ্ঠাবান মুসলিম কর্তৃক নিষিদ্ধ।
৪। আলমালিক বা আলমালিগ তেরো শতাব্দীর প্রারম্ভে হঠাৎ প্রসিদ্ধি লাভ করেন এবং তারমার্শিরিনদের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে গৃহ যুদ্ধের সময় জামাতেখানাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় (টীকা ৭ দ্রষ্টব্য)- এটা তার রাজধানী ছিল। এ স্থানটি অবস্থিত ছিল আইলী নদীর উপত্যাকায়–আধুনিক কুনজা শহরের কিছু দূর উত্তর-পশ্চিমে এটা অবস্থিত ছিল।
৫। কাত্ বা কাথ খোরেজমিয়ার পূর্বতন রাজধানী আধুনিক শেখ আব্বাস ওয়ালী শহরের নিকট অবস্থিত ছিল।
৬। এই অভিযোগ-পত্রের গুরুত্ব এখানে নিহিত যে মুসলিম জগতে বুখারা ছিল পূর্বের অন্যতম একটি ধর্মতন্ত্র অধ্যায়নের ক্ষেত্র।
৭। তুর্কিস্তান এবং অক্সাসের ওপারের দেশগুলির সুলতানকে পূর্ববর্তী লেখাতে পৃথিবীর সাতজন মহা নরপতির অন্যতম বলে ধরা হয়েছে-ইনি চারজন মোগল খানাতের একজন ছিলেন-এতে চেঙ্গিস খানের সাম্রাজ্য তার উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। এর শাসকগণ জামাতে-খাস নামে পরিচিত ছিলেন-জামাতের নামানুসারে। ইনি ছিলেন চেঙ্গিস খানের পুত্র। একে এ দেশটি দেওয়া হয়েছিল। তারমাশারিনের ভাগ্য সম্বন্ধে ইব্নে বতুতা একটি কৌতূহলপূর্ণ গল্প বলেন। ইসলামে তার ধর্মান্তরিত হওয়ায় সম্ভ্রান্ত প্রধানগণ তার উপর বিরূপ হয়ে উঠেন। চেঙ্গিস খানের নীতি ভঙ্গের জন্য তারা তাকে অভিযুক্ত করেন এবং ১৩৩৫ কি ৩৬ খ্রীষ্টাব্দে তারা বিদ্রোহ করেন। তারমাশিরিন অকপাসের ওপারে পালিয়ে যান–কিন্তু ধরা পড়েন এবং মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন বলে প্রচারিত হয়। অতঃপর একজন ব্যক্তি ভারতে এসে উপনিত হন এবং নিজকে তারমাশিরিন বলে পরিচয় দেন–যদিও তার দাবী সমর্থিত হয়, তথাপি রাজনৈতিক কারণে তিনি সুলতান কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হন এবং বিতারিত হন। ভাগ্যক্রমে তিনি শিরাজে আশ্রয় পান এবং ইব্নে বতুতা তার সঙ্গে ১৩৪৭ সালে তার পূর্ণ সিরাজ ভ্রমণের সময় সাক্ষাৎ করেন। তখন তিনি সেখানে সম্মানিত বন্দীর জীবন যাপন করেছিলেন।
৮। এখন শা-জিন্দা’নামে পরিচিত। এ সমাধি বন্দিরটি এখাননা সমরকন্দের একটি প্রধান হ্য।
৯। ১২৪৫ খ্রীষ্টাব্দ থেকে স্থানীয় কার্ট বংশীয় রাজাগণ হিরাতে রাজত্ব করতেন। এই নরপতি হোসেনের অধীনে (সাধারণভাবে মইজউদ্দিন নামে কথিত। রাজত্ব কাল ১৩৩১-৭০) খোরাশানের মধ্যে এ রাজত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হয়। ইব্নে বতুতার পরিদর্শন কালে তিনি বাল্যাবস্থায় ছিলেন–সুতরাং নিম্নোক্ত কাহিনীটি হচ্ছে তার নয় দশ বছর পরের। হোসেনের পুত্র গিয়াস উদ্দীন পীর শা ১৩৮১ খ্রীষ্টাব্দে তৈমুর লংয়ের অধীনস্থ হন–এবং ১৩৮৯ সালে তার মৃত্যুতে রাজবংশটি লুপ্ত হয়।
