নায়াসাবুর থেকে আমরা আসি বিস্তাম।১৪ বিস্তাম থেকে কান্দুস (gundus) ও বাগলান।১৫ দুটিই গ্রাম এবং শেখ ও ধার্মিক লোকদের বাসস্থান। কানদুসে একটি খালের পাশে আমরা তাবু ফেলেছিলাম। এখানে শের-ই-শিয়া (কালো সিংহ) নামক একজন মিশরীয় শেখের একটি অতিথিশালা আছে। এখানকার শাসনকর্তা মসুলের অধিবাসী। তিনি বিশেষ যত্নে আমাদের মেহমানদারী করেন। এখানকার একটি বাগানের ভিতরে তার বাসস্থান। আমাদের সঙ্গের ঘোড়া ও উটগুলোকে চরানোর সুবিধা পেয়ে সে গ্রামের বাইরে আমরা প্রায় চল্লিশ দিন কাটালাম। কারণ, এখানে অতি উত্তম গো-চারণ ভূমি রয়েছে। তা ছাড়া ইতিপূর্বে ঘোড় চুরির ব্যাপারে তুকী আইনের যে বিধানের কথা আগেই আমি বলেছি, এখানকার আমীরও সে আইন এখানে বলবৎ রেখেছেন বলে ঘোড়া চুরি যাবারও কোনো আশঙ্কা নেই। আমাদের ওখানে দশদিন অবস্থানের পরেই তিনটি ঘোড়া হারিয়ে যায়। তখন প্রায় পক্ষকালের মধ্যেই স্থানীয় তাতাররা, তাদের মধ্যে আমীর কর্তৃক ঐ আইন প্রয়োগ হবে আশঙ্কায় ঘোড় তিনটি উদ্ধার করে দিয়ে যায়।
এখানে দীর্ঘদিন অবস্থানের আরেকটি কারণ তুষারপাত। কারণ, পথে হিন্দুকুষ নামক একটি পর্বত আছে। হিন্দুকুষ নামের অর্থ হইল হিন্দু বা ভারতীয়দের হত্যাকারী। কারণ, ভারতবর্ষ থেকে ক্রীতদাস বালক-বালিকা আনবার সময় অত্যধিক শীত ও তুষারপাতের ফলে বহু সংখ্যক এখানেই মৃত্যুবরণ করে। সে-পথ পার হতে পূর্ণ একটি দিন লাগে।১৬ গ্রীষ্মকাল পুরোপুরি আরম্ভ না-হওয়া পর্যন্ত আমরা সেখানেই রয়ে গেলাম। তারপর একদিন প্রত্যূষে চলতে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ক্রমাগত চলে এ পর্বতটি অতিক্রম করে এলাম। উটগুলো তুষারের ভেতরে ডুবে যাবে ভয়ে আমরা পথে উটের পা ফেলার জন্য সামনে কম্বল বিছিয়ে দিতে লাগলাম। বাগোন থেকে যাত্রা করে আমরা। যেখানে এলাম সে জায়গাটির নাম আন্দার (Andarab)। এক সময়ে এখানে একটি শহর ছিল কিন্তু তার চিহ্নও আজ লোপ পেয়েছে। একটি বড় গ্রামের কাছে এসে আমরা আস্তানা ফেললাম। মোহাম্মদ আল-মাহ্রাবি নামে একজন সৎলোকের একটি সরাইখানা এখানে আছে। আমরা তাঁর সঙ্গেই ছিলাম এবং তিনি আমাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করেছেন। তিনি আমাদের এতটা সম্মান করেছেন যে, খাওয়ার পরে আমরা যখন হাত ধুয়ে ফেলতাম তিনি তখন সেই হাত ধোয়া পানি পান করতেন। পূর্বোক্ত হিন্দুকুষ পর্বতে আরোহণ করার আগে পর্যন্ত তিনি আমাদের অনুগমন করেন। এ পর্বতের উপর আমরা একটি উষ্ণ প্রস্রবণ দেখতে পাই। আমরা তাতে মুখ ধুয়েছিলাম। তার ফলে আমাদের মুখের ত্বক ঝলসে যায় এবং আমাদের কিছু কষ্ট ভোগ করতে হয়।
অতঃপর আমরা যেখানে এসে থামলাম সে জায়গাটির নাম বাহির (Panjshir) যার অর্থ পাঁচ পর্বত। এক সময়ে সমুদ্রের মতো নীল পানি বিশিষ্ট এই নদীর বড় পাড়ে এখানে একটি জন বহুল সুন্দর শহর গড়ে উঠেছিল। তাতার সুলতান চেংগিজ-এ দেশটিও ধ্বংস করেন এবং তারপরে এ-শহরের আর আবাদ হয়নি। আমরা ‘পাশে নামীয় একটি পর্বতে এসে হাজির হলাম। এখানে আতা আউলিয়া অর্থাৎ আউলিয়াদের পিতা নামক একজন শেখের একটি দরগাহ আছে। তাকে সিসাদ সালাহ’ নামেও ডাকা হয়। কারণ, কথিত আছে, তার বয়স সাড়ে তিনশত বছর। তার সম্বন্ধে লোকে উচ্চ ধারণা পোষণ করে এবং শহর ও গ্রাম থেকে বহুলোক তার সঙ্গে দেখা করতে আসে। এমন কি সুলতান ও শাহজাদীরা পর্যন্ত আসেন। তিনি আমাদের সসম্মানেই তার মেহমানরূপে গ্রহণ করেন। আমরা তার দরগার কাছে নদীর কিনারে তাবু ফেলে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। আমি তাঁকে ছালাম করতেই তিনি আমাকে আলিঙ্গণ দান করলেন। তার গায়ের চামড়া কোমল ও মসৃণ। তাকে দেখলে যে কেউ পঞ্চাশ বছর বয়সী বলে মনে করবে। তিনি আমাকে বললেন, প্রতি একশ বছর পরে তাঁর চুল ও দাঁত নতুন করে গজায়। তার বিষয়ে আমার মনে কিছুটা সন্দেহের উদ্রেক হয়। একমাত্র খোদাই জানেন, তার কথায় কতটা সত্যতা আছে।
সেখান থেকে আমরা এলাম পারওয়ান। এখানে আমীর বুরুনতাইর (Buruntayh) সঙ্গে আমাদের দেখা হয়। তিনি আমার সঙ্গে ভদ্র ব্যবহার করেন এবং গজনাতে তার প্রতিনিধির কাছে আমাদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করতে উপদেশ দিয়ে পত্র লেখেন। আমরা চারক (চারিকর) গ্রাম অবধি পৌঁছলাম। তখন গ্রীষ্মকাল। সেখান থেকে আমরা গজনা পৌঁছলাম। খ্যাতনামা যোদ্ধা সুলতান মাহমুদ ইব্নে সবুক্তগীনের শহর এই গজনা। প্রবল পরাক্রমশালী বাদশাদের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন। তিনি বহুবার ভারত আক্রমন করেন এবং একাধিক নগর ও দূর্গ অধিকার১৭ করেন। এ শহরেই তার সমাধি রয়েছে। সমাধির উপরে একটি (Hospice) নির্মিত হয়ে আছে। শহরের বৃহত্তর অংশ ধ্বংস কবলিত হয়ে সামান্য মাত্র অবশিষ্ট আছে। কিন্তু এক সময়ে এটি বড় শহর ছিল। এখানে অত্যন্ত বেশি শীত অনুভূত হয়। সেজন্য শীতকালে এ-শহরের বাসিন্দারা কান্দাহার শহরে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে। গজনা থেকে কান্দাহার নামে এ বড় ও সমৃদ্ধিশালী শহর তিন রাত্রির পথ। কিন্তু আমার সেখানে যাবার সুযোগ হয়নি। আমরা কাবুলে এসে পৌঁছলাম। পূর্বে কাবুল একটি প্রকাণ্ড শহর ছিল। এখন তার স্থান দখল করেছে আফগান নামক ইরানীদের বসতিপূর্ণ একটি গ্রাম। এদের দখলে কয়েকটি পর্বত ও গিরিবর্ত আছে। আফগানরা বিশেষ শক্তিশালী এবং তাদের অধিকাংশই দস্যু প্রকৃতির লোক। তাদের প্রধান পর্বতটির নাম কুহুসোলেমান। কথিত আছে, পয়গম্বর। সোলেমান এ পর্বতে আরোহন করে ভারতের দিকে দৃষ্টিপাত করেন এবং ভারতে প্রবেশ না করে ফিরে আসেন। কারণ, ভারত তখন অন্ধকারাবৃত ছিল।
