অস্সাস্ নদী পার হয়ে আমরা খোরাসানে প্রবেশ করি। সেখান থেকে রওয়ানা হয়ে বালুকাময় অনুর্বর জনমানবহীন পথে দেড় দিন চলার পরে বলখে উপস্থিত হই। সম্পূর্ণভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত ও শহরটি জনমানবহীন হয়ে গেছে। কিন্তু এ-শহর খুব মজবুত করে তৈরী বলে এখনও জনহীন বলে মনে হয় না। অভিশপ্ত চেঙ্গিজ এ-শহর ধ্বংস করেন এবং শহরের মসজিদটির এক-তৃতীয়াংশ ভেঙ্গে ফেলেন। তিনি শুনেছিলেন মসজিদের একটি স্তম্ভের নিচে ধনরত্ন লুক্কায়িত আছে। সেজন্য স্তগুলোর প্রায় এক তৃতীয়াংশ তিনি ভেঙে ফেলেন। অবশেষে কিছুই না পেয়ে সেগুলো ভগ্নাবস্থায় পরিত্যাগ করে যান। বলখ থেকে রওয়ানা হয়ে আমরা কুহিস্তানের পাবর্ত্যপথে সাতদিন চলি। পথে অনেক গ্রাম, স্রোতস্বিনী ও ডুমুর জাতীয় গাছ আছে। অনেকগুলো সরাইখানায় ধর্মনিষ্ট লোকেরা বাস করেন। তারপর আমরা উপস্থিত হই খোরাসানের বৃহত্তম শহর হিরাতে। এ-প্রদেশে বৃহৎ শহর চারটি। তার ভেতর হিরাত ও নায়াসাবুর (নিশাপুর) বসতিপূর্ণ এবং বলখ ও মারুভ (Merv) ধ্বংস কবলিত।
হিরাতের সুলতান প্রসিদ্ধ হোসায়েন সুলতান গিয়াসউদ্দিন আলঘোরীর পুত্র। সুলতান গিয়াসউদ্দিন তার দুঃসাহসের জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। খোদার অনুগ্রহে (by the Divine favour) তিনি দুটি যুদ্ধে জয়লাভ করেন। নিজামউদ্দিন মাওলানা নামে একজন প্রসিদ্ধ আওলিয়া যৌবন হিরাতে বাস করতেন। তার খোতবা ও ধর্মোপদেশ শুনবার জন্য বহুলোক তার কাছে সমবেত হতো। তারা সবাই তাকে ভালবাসত ও শ্রদ্ধা। করতো। দুর্নীতি দমনের জন্য তাকে নিয়ে তারা একটি সঙ্ গঠন করেছিল। সুলতানের জ্ঞাতিভ্রাতা ইমাম মালিক ওয়ারানা সঙ্ঘের সভ্য ছিলেন। যেখানেই তারা কোন দুঙ্কার্যের খবর পেতো, এমন কি দুষ্কার্যকারী স্বয়ং সুলতান হলেও সেখানেই তারা গিয়ে দুস্কার্য বন্ধের চেষ্টা করতো। শোনা যায়, একবার তারা খবর পেলো, সুলতানের। প্রাসাদেই একটি অন্যায় কার্য অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কাজেই তারা সে কাজ বন্ধ করার উদ্দেশ্যে সেখানে গিয়ে হাজির হলো। তখন সুলতান তাদের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য প্রাসাদের মধ্যে আত্মগোপন করলেন। কিন্তু দেখতে-দেখতে প্রাসাদের প্রবেশ পথে প্রায় ছয় হাজার লোক এসে সমবেত হলো। তাদের ভয়ে ভীত হয়ে সুলতান নিজামউদ্দিনকে এ-শহরের অপরাপর প্রধান ব্যক্তিদের ডেকে পাঠালেন। সুলতান মদ্যপান করছিলেন। জনতা প্রাসাদের ভেতরেই তাকে ইসলামের শরিয়ত অনুসারে শাস্তি ১০ দিয়ে শান্ত হলো। পরে একজন তুর্কী আমীরের দ্বারা নিজামউদ্দিন নিহত হন। কোনো ব্যাপারে আমীর তার উপর অসন্তুষ্ট ছিলেন। সুলতানের জ্ঞাতিভ্রাতা মালিক ওয়ারমা নিজামউদ্দিন সংস্কারমূলক কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এ-ঘটনার পর সুলতান মালিক ওয়ারনাকে রাজদূত হিসাবে সিজিস্তানের রাজদরবারে প্রেরণ করেন। অতঃপর তিনি সিজিস্তানে গিয়ে পৌঁছলে সুলতান তাকে ফিরে আসতে বারণ করেন। অবশেষে মালিক ওয়ারনা ভারতে চলে যান। সিন্ধু ত্যাগ করে আসার সময় আমার সঙ্গে দেখা হয়। তিনি একজন অমায়িক লোক ছিলেন। তাছাড়া তিনি ক্ষমতাপ্রিয় ছিলেন। এবং শিকার করতে ক্রীতদাস ও ভৃত্য রাখতে এবং জাঁকজমকশালী পোষাক পরিধান করতে ভালবাসতেন। কিন্তু এ-প্রকৃতির লোকের জন্য ভারত উপযোগী দেশ নয়। ভারতের বাদশাহ্ তাকে ছোট একটি শহরের শাসনকর্তা নিযুক্ত করলেন। কিন্তু সেখানেই হিরাতের একজন লোকের হস্তে তিনি নিহত হন। হিরাত থেকে এসে এ লোকটি তখন ভারতে বসবাস করছিলো না যায়। ভারতের বাদশাই সুলতান। হোসায়েনের অনুরোধে আততায়ীকে এ-ব্যাপারে প্ররোচনা দেন। সে-কারণে মালিক ওয়ারনার মৃত্যুর পরে সুলতান হোসায়েন ভারত সম্রাটের বশ্যতা স্বীকার করেন।
হিরাত ছেড়ে আমরা যাই জাম শহরে। উর্বর অঞ্চলে অবস্থিত জাম’ মাঝামাঝি আকারের একটি শহর।১১ এখানকার গাছপালার মধ্যে অধিকাংশই উঁত গাছ। কাজেই এখানে প্রচুর রেশম উৎপাদন হয়। প্রসিদ্ধ তাপস ও দরবেশ আহমদ-উল-জামের নামানুসারে এ-শহরের নামকরণ হয়েছে। তার বংশধরেরাই এখন এ-শহরের মালিক।
জাম শহর সুলতানের অধিকারভুক্ত নয়। দরবেশ জামের বংশধরগণ বিত্তশালী বলে। খ্যাত। অতঃপর আমরা খোরাসানের অন্যতম বৃহৎ শহর তুস্ নগরে হাজির হই। সেখান থেকে যাই মাশাদ-আর-রিদা (মেসেদ)। এটিও বহু ফলগাছ, নদীনালা ও কারখানা যুক্ত১২ একটি বড় শহর। এখানকার প্রসিদ্ধ সমাধিস্তম্ভের শীর্ষে একটি সুদৃশ্য। গুম্বুজ আছে। সমাধির দেওয়ালগুলি রঙীন টালিদ্বারা নির্মিত। ইমামের সমাধিস্তম্ভের উলটোদিকেই খলিফা হারু-অর-রশিদের সমাধি। সমাধির উপরস্থ মঞ্চে আলোকাধার রয়েছে। কোনো শিয়া মতাবলম্বী এখানে জিয়ারতের জন্য এলে হারুণ-আর-রশিদের সমাধির উপর পদাঘাত করে এবং আর-রিদার জন্য দোয়া করে।
সেখান থেকে আমরা সারাখের মধ্য দিয়ে যাওয়ার (Zawa) উপস্থিত হই। যাওয়া ধর্মপ্রাণ শেখ কুতুবউদ্দিন হায়দারের ১৩ শহর। তিনি নিজের নামানুসারে দরবেশদের। জামাতের নাম হায়দারী জামাত রেখেছেন। এ-সব দরবেশ হাতে, কানে ও শরীরের অন্যান্য অংশে লোহার আংটি ব্যবহার করেন। যাওয়া থেকে আমরা নায়াসাবুর গিয়ে। হাজির হই। খোরাসানের চারটি রাজধানীর ভেতর নায়াসাবুর অন্যতম। এ-শহরের। সৌন্দর্য ফলগাছ, ফলের বাগান, নদী-নালার জন্য একে ছোট দামেস্ক নাম দেওয়া। হয়েছে। এখানে রেশম ও মখমলের পোষাক তৈরী হয়ে ভারতে রপ্তানী হয়। আমি প্রসিদ্ধ জ্ঞানী শেখ কুতুবউদ্দিনের আস্তানায় কিছুকাল বাসের সুযোগ লাভ করেছিলাম। তিনি আমার প্রতি যথেষ্ট আতিথেয়তা প্রদর্শন করেন। আমি তার আশ্চর্যজনক কিছু কিছু অলৌকিক কার্যকলাপ স্বচক্ষে দেখেছি। এ-শহরে আমি একজন অল্পবয়সী তুকী ক্রীতদাস খরিদ করেছিলাম। তিনি সেই ক্রীতদাসকে আমার সঙ্গে দেখেই বলে উঠলেন, “এ ছেলেটি তোমার জন্য ভাল হবে না। একে বিক্রি করে ফেলে। তার উপদেশানুসারে আমি তাই করলাম, পরের দিনই এক সওদাগরের কাছে তাকে বিক্রি করে দিলাম। তারপর যথারীতি তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলাম। অতঃপর যখন আমি বিস্তামে এসে পৌঁছি তখন নায়াসাবুরের এক বন্ধু পত্র লিখে জানালেন যে, সেই ক্রীতদাস একটি তুর্কী বালককে হত্যা করেছে এবং সে জন্য তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। শেখের অলৌকিক কার্যের এটি চাক্ষুস্ প্রমাণ।
