তুর্কীস্তানের সুলতান তারমাশিরিন একজন শক্তিশালী বাদশাহ। তিনি শাসনকার্যে অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ এবং তার রাজ্য ও সৈন্যসংখ্যা বিশাল। তার রাজ্য চীন ভারত ইরাক ও সুলতান উজবেগের রাজ্যের মধ্যে অবস্থিত। এ-সব রাজ্যের অধিপতিরা সবাই তাকে উপঢৌকন পাঠাতেন ও সম্মান করতেন। তার পূর্ববর্তী দুটি ভাই-ই কাফের(Infidel) ছিলেন। একদিন মসজিদে আমরা রীতি অনুসারে ফজরের নামাজ শেষ করতেই শুনতে পেলাম সুলতান সেখানে উপস্থিত আছেন। তিনি জায়নামাজ থেকে উঠতেই আমি তাকে ছালাম করতে এগিয়ে গেলাম। তিনি আমাকে তুকী ভাষায় অভ্যর্থনা জানালেন। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে তিনি তার দরবার কক্ষে হাজির হতেই নারী-পুরুষ ও শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে জনসাধারণ এসে হাজির হলো নিজের নিজের নালিশ জানাতে। অতঃপর তিনি আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি দেখতে পেলাম তাবুর ভেতরে সোনালী কাজ করা রেশমী কাপড়ে আবৃত একখানা আসনে তিনি বসে আছেন। তাবুর ভিতরে সোনালী জরির কাজ করা রেশমী আস্তর লাগানো। মূল্যবান মণিমুক্তা খচিত একটি মুকুট ঝুলানো রয়েছে সুলতানের মাথার একহাত উপরে। প্রধান আমীররা আসন গ্রহণ করেছেন তার ডাইনে ও বামে। মাছি তাড়াবার ক্ষুদ্র পাখা হাতে সামনে বসেছেন শাহজাদারা। আমার সফর সম্বন্ধে নানা প্রশ্নাদি করলেন। দোভাষীর কাজ করলেন তার প্রধান বিচারক (chancellor)। আমরা তার সঙ্গে গিয়ে নামাজে যোগদান করতাম। (তখন ছিল অসহ্য শীতের সময়)। তিনি কখনও ফজর ও রাত্রের নামাজের জামাতে অনুপস্থিত থাকতেন না। একদিন আসরের নামাজের সময় আমি উপস্থিত ছিলাম। তখন সুলতানের একজন ভূত্য এসে নির্দিষ্ট জায়গায় সুলতানের জায়নামাজখানা বিছিয়ে ইমামকে বললো, “হুজুর আপনাকে একটু অপেক্ষা করতে বলেছেন। তিনি অজু করে এক্ষুণি আসছেন।” ইমাম তার উত্তরে পার্সীতে বললেন, “নামাজ খোদার জন্য না তারমাশিরিনের জন্য।” এই বলে তিনি মোয়াজ্জিনকে তকবির পড়তে বললেন। নামাজ অর্ধেক শেষ হবার পরে সুলতান এলেন। তিনি এসে বাকী দু’রাকাত নামাজ শেষ করলেন মসজিদের দরজার কাছে পাদুকা রাখবার জায়গায়। দাঁড়িয়ে। তারপরে প্রথম দু’রাকাত নামাজ পড়ে হাসতে-হাসতে তিনি ইমামের সঙ্গে মোসাফাহ্ করতে এগিয়ে এলেন। নিজের জায়গায় বসে পরে সুলতান আমার দিকে। ফিরে বললেন, “তুর্কীর সুলতানের সঙ্গে একজন পার্সী দরবেশ কি রকম ব্যবহার করলেন, দেশে ফিরে আপনার দেশবাসীকে তা বলবেন।” এ শেখ প্রতি শুক্রবার খোবা পড়তেন সুলতানকে সত্ত্বার্যে উৎসাহ দিয়ে এবং অসৎ ও অত্যাচারমূলক কার্যে কঠোর ভাষায় নিষেধ জানিয়ে সুলতান নীরবে তা শুনতেন ও অবর্ষণ করতেন। ইমাম সুলতানের দেওয়া কোনো উপহার কখনো গ্রহণ করতেন না, তার সঙ্গে একত্র বসে খেতেন না বা তার দেওয়া পোশাক-আশাকও পরতেন না। তিনি একজন খাঁটি ধর্মপ্রাণ খোদার বান্দা ছিলেন। সুলতানের সঙ্গে চুয়ান্ন দিন কাটিয়ে আমি আমার যাত্রা পুণরায় শুরু করতে মনস্থ করলাম। তখন তিনি আমাকে সাতশ রৌপ্য, দিনার নকুল জাতীয় জীবের লোমবিশিষ্ট একটি কোট দিলেন। শীতের জন্য একশ দিনার মূল্যের এ কোটটি আমি চেয়েছিলাম। তাছাড়া দুটি ঘোড়া ও দু’টি উটও তিনি আমাকে দিলেন। তার কাছে বিদায় নিয়ে সমরকন্দে এসে পৌঁছলাম। সমরকন্দ পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ও সুন্দর শহর। শহরটি একটি নদীর তীরে নির্মিত। আসরের নামাজের পরে অধিবাসীদের সবাই নদীর তীরে ভ্রমণের জন্য আসে। এক সময়ে নদীর পারে বড়-বড় প্রাসাদ ছিল। এখন তার অধিকাংশই ধ্বংসের কবলে। শহরেরও সেই একই অবস্থা। তার না আহে প্রবেশ দ্বারা না আছে কোনো প্রাচীর। শহরের বাইরে রয়েছে কুতাম ইব্নে আব্বাসের মাজার। সমরকন্দ বিজয়ের সময় তিনি শহীদ ৮ হন। আদিবাসীরা প্রতি রবিবার এবং বৃহস্পতিবার রাত্রে এ মাজার জেয়ারত করতে আসে। তাতারারও অনেক গরু, ভেড়া ও অর্থ মানস্বরূপ নিয়ে মাজার জেয়ারতে আসে। সে সব ব্যয় করা হয় মুসাফের ও সরাইখানার জন্য।
সমরকন্দ থেকে আমরা তিরমিধ (তিরমিজ) পৌঁছি। এ-বড় শহরটিতে সুন্দর-সুন্দর অট্টালিকা ও বাজার আছে। এবং মধ্য দিয়ে একটি খাল প্রবাহিত হয়ে গেছে। এখানে সুস্বাদু আঙ্গুর ও নাশপাতি পাওয়া যায় প্রচুর। তাছাড়া পাওয়া যায় মাংস ও দুধ। সোডা সাজিমাটির পরিবর্তে এখানকার লোকেরা দুধ দিয়ে মাথা ঘোয়। এখানকার স্নানাগারে একটি প্রকাণ্ড জালা ভরতি দুধ রয়েছে। আগন্তুকদের প্রত্যেকেই এক পেয়ালা করে দুধ নিয়ে নিজের মাথা ধোয়। তাতে চুল তাজা ও চকচকে হয়ে উঠে। ভারতের লোকেরা তিলতেল মাথায় দেয় এবং পরে সাজিমাটি দিয়ে মাথা ধুয়ে ফেলে। তাতে শরীর সিন্ধু থাকে, চুল চকচকে ও লম্বা হয়। সেজন্যই ভারতবাসীদের এবং সেখানে যারা বাস করে তাদের দাড়ি লম্বা হয়। তিরমিজের পুরাতন শহরটি নির্মিত হয়েছিল অকসা নদীর তীরে। অতঃপর চেঙ্গিজ যখন সে-শহর ধ্বংস করেন তখন পুনরায় এ-শহরটি নির্মিত। হয় নদীর তীর থেকে দু’মাইল দূরে। শহরে পৌঁছবার আগেই ঘটনাক্রমে আমার সঙ্গে এখানকার শাসনকর্তা আলা আল-মুক খোদাওজাদার সঙ্গে দেখা হয়। তিনি আমাদিগকে মেহমান হিসাবে গণ্য করবার হুকুম দেন এবং প্রত্যহ আমাদের জন্য খাদ্যবস্তু পাঠান।
