খারিজম আসতে আমি সঙ্গী পেয়েছিলাম আলী নামে কারবালার একজন সওদাগরকে। তিনি ছিলেন একজন শরীফ ব্যক্তি। আমি তাকে অনুরোধ করেছিলাম। আমাকে কিছু কাপড় জামা ও অন্যান্য জিনিষ কিনে দিতে। তিনি আমার একটি জামা দশ দিনারে খরিদ করে আমার থেকে নিলেন আট দিনার এবং বাকি দু’ দিনার দিলেন নিজের পকেট থেকে। প্রথমে আমি এর কিছুই জানতাম না। পরে ঘটনা পরম্পরায় কথাটা আমার কানে এলো। শুধু তাই নয়, তিনি আমাকে কিছু টাকাও ধার দিয়েছিলেন। আমীরের উপহারের টাকা পেয়ে আমি তার পাওনা পরিশোধ করবার পর তার দয়ার জন্য কিছু একটা উপহার দিতে চাইলাম কিন্তু তিনি কিছুতেই তা গ্রহণ করলেন না। এমনকি তার একটি বালক ভৃত্যকে সে উপহার দিতে চাইলেও তিনি রাজি হলেন না। তার মতো একজন মুক্তহস্ত ইরাকী আমি আর কোথাও দেখিনি। আমার সঙ্গে তিনিও ভারত সফরে আসবেন বলে স্থির করেছিলেন। এমন সময় তাদের শহরের একজন সওদাগর চীন যাবার পথে খারিজমে এসে পৌঁছলো। তখন তিনি ভয় করলেন, হয়তো সওদাগরেরা দেশে ফিরে বদনাম করবে যে আলী ভিক্ষে করতে ভারতে গেছে। সে-জন্য তিনি স্বদেশের সওদাগরদের সঙ্গে চীন যাত্রা করলেন।
পরে ভারতে থাকাকালে শুনেছি, চীন, ও তুর্কীস্তানের সীমান্তে আল মালীক নামক জায়গায় পৌঁছে আলী সেখানেই থেকে যান এবং বালক-ভৃত্যকে আগে-আগে পাঠিয়ে দেন মালপত্রসহ। কিন্তু বালকটির ফিরে আসতে অনেকদিন লেগে গেলো। ইত্যবসরে তাদের শহরের অপর একজন সওদাগর এসে একই সরাইখানায় আলীর সঙ্গেই বাস করতে লাগলেন। আলী বালক-ভৃত্যর ফিরে আসার সময় অবধি কিছু টাকা ধার চাইলেন সেই সওদাগরের কাছে। কিন্তু সওদাগর টাকা ধার দিতে অস্বীকার করলেন। পরে অবশ্যি আলীকে সাহায্য না করাটা অন্যায় হয়েছে বলে সওদাগর বুঝতে পারলেন। তাই তিনি আলীর সরাইখানায় থাকা-খাওয়া খরচ নিজেই জমা দিতে চেষ্টা করলেন। আলী এ-কথা শুনতে পেয়ে এতটা দুঃখিত হয়ে পড়েন যে, নিজের কামরায় ঢুকে তিনি নিজের গলা কেটে ফেলেন। পরে তার যখন খোঁজ হলো তখন আলীর মুমূর্ষ অবস্থা। একজন ক্রীতদাসকে তার হত্যার জন্যে সন্দেহ করা হয়। আলী তা জানতে পেরে বললেন, “এর প্রতি কোনো অন্যায় আচরণ করো না। আমি নিজেই নিজের গলায়। ছুরি দিয়েছি।” অতঃপর সেদিনই তিনি ইন্তেকাল করলেন। আল্লাহ্ তাকে ক্ষমা করুন।
খারিজম থেকে যাত্রা করার সময় আমি উট ভাড়া করলাম এবং উটের একটি শিবিকাও কিনে নিলাম। কিছু সংখ্যক ঘোড়ায় চড়ে ভৃত্যেরা এলো, শীতের জন্য বাকি ঘোড়াগুলোকে কম্বল গায়ে জড়িয়ে আনতে হলো। আমরা খারিজম ও বুখারার মধ্যবর্তী মরুভূমিতে প্রবেশ করলাম। খারিজম থেকে বুখারা অবধি আঠারো দিনের বালুকাময়। পথে একমাত্র ছোট শহর কাট ৫ ছাড়া আর কিছুই নেই। চারদিন পর আমরা এসে কাট পৌঁছলাম এবং শহরের বাইরে তাবু ফেললাম। পাশেই একটি হ্রদের পানি ঠাণ্ডায় জমে গেছে এবং বালকেরা তার উপর খেলা করছে। কাজী আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে এলেন। তার ঘন্টাখানেক পরে এলেন সেখানকার শাসনকর্তা এবং তার পরিষদবর্গ। তারা আমাদের থাকতে অনুরোধ জানালেন এবং আমাদের সম্মানার্থে এক ভোজের আয়োজন করলেন। এ মরুভূমিতে পানি ছাড়া ছয় রাত্রি চলার পরে আমরা ওয়াকান (Wafkend) শহর পৌঁছলাম। সেখানে থেকে পুরো একদিন ফলের বাগান, নদী, গাছপালা ও বাড়ি ঘরের ভেতর দিয়ে পথ চলে এসে পৌঁছলাম বুখারা শহরে। পূর্বে এ শহর অাস নদীর অপর পারের দেশসমূহের রাজধানী ছিল। অভিশপ্ত তাতার টিঙ্কিজ (চেঙ্গিজ) এ শহর ধ্বংস করেন। তিনি ইরাকের রাজাদের পূর্বপুরুষ। মসজিদ স্কুল ও বাজারের সামান্য কয়েকটি ধ্বংসাবশেষ এখন এখানে দেখা যায়। এখানকার অধিবাসীদের অত্যন্ত হীন চক্ষে দেখা হয় এবং খারিভমে তাদের কোনো সাক্ষ্য আইনে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয় না। কারণ ধর্মান্ধতা, মিথ্যা ভাষণ প্রভৃতির জন্য এদের যথেষ্ট কুখ্যাতি আছে। অধিবাসীদের ভেতর এমন একটি লোকও আজ নেই যার ধর্মতত্ত্ব সম্বন্ধে ভালো জ্ঞান আছে বা জ্ঞান লাভ ৬ করতে ইচ্ছুক। বুখারার উপকণ্ঠে ফাতেহাবাদ নামক একটি সরাই আমরা আশ্রয় গ্রহণ করলাম। সেখানকার শেখ আমাকে নিজের গৃহে নিয়ে প্রধান অধিবাসীদের নিমন্ত্রণ করলেন। বিশেষ আনন্দে একটি রাত সেখানে কাটানো হলো। সুললিত স্বরে সেখানে কোরআন পাঠ হলো। একজন ইমাম বক্তৃতা দিলেন, পরে তুর্কী ও পার্শী ভাষায় গান করা হলো।
বুখারা থেকে আমরা রওয়ানা হলাম ধর্মপ্রাণ সুলতান তারমা শিরিনের তাবুর উদ্দেশ্যে। বাগান ও খাল দ্বারা পরিবেষ্টিত নাখশাব (garshi) নামক শহরের পাশ দিয়ে ছিল আমাদের পথ। পরদিন অপরাহে আমরা সুলতানের তাবুতে পৌঁছলাম। একজন সওদাগর আমাদের একটি তাবু ধার দিলেন রাত কাটানোর জন্যে। সুলতান শিকারের উদ্দেশ্য বাইরে গেছেন বলে আমি তার প্রতিনিধি আমীর তাবুঘার সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি তার সমজিদের নিকটে আমার বাসস্থান নির্দেশ করে দিলেন এবং পূর্ববর্ণিত তুর্কী তাবুর মতো একটি তাবুও আমাকে দিলেন। সেই রাত্রেই আমার এক ক্রীতদাসী বালিকা একটি সন্তান প্রসব করলো। প্রথমে শুনেছিলাম সে একটি পুত্রসন্তান প্রসব করেছে কিন্তু পরে দেখলাম পুত্র নয় কন্যা। কন্যা হলেও তার জন্ম হয়েছিলো শুভ মুহূর্তে কারণ তার জন্মের পর আমার যা কিছু ঘটেছে সবই আনন্দের ও সন্তুষ্টির। ভারতে পৌঁছবার দু’মাস পরে তার মৃত্যু হয়। যথাস্থানে তার বর্ণনা দেওয়া আছে।
