মরুভূমি পার হয়ে আমরা খারিজম শহরে এসে পৌঁছলাম।২ খারিজম তুর্কীদের সবচেয়ে সুন্দর বড় ও প্রসিদ্ধ শহর। এ-শহরের অধিবাসীদের সংখ্যা এতো বেশি যে তাদের চলাচল দেখে তরঙ্গসঙ্কুল সমুদ্রের কথা মনে পড়ে। একদিন ঘোড়ায় চড়ে বাজারের মধ্য দিয়ে যেতে আমি ভিড়ের মধ্যে আটকা পড়ে গেলাম। তখন আর সামনেও যেতে পারি না, পিছিয়েও আসতে পারি না। এ অবস্থায় কি করা উচিৎ বুঝতে না পেরে আমি অতি কষ্টে পিছিয়ে এলাম। শহরটি সুলতান উজবেগের রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত। এখানে সুলতানের প্রতিনিধিত্ব করেন কুতলুডামুর (Qutludumur) নামক একজন ক্ষমতাশালী আমীর। খারিজমিয়ানদের মতো তেমন বন্ধুভাবাপন্ন ও অতিথি পরায়ন উত্তম লোক আমি দুনিয়ার আর কোথাও দেখিনি। উপাসনা সম্বন্ধেও তাদের মধ্যে যে প্রশংসনীয় রীতির প্রচলন দেখেছি তা আর কোথাও দেখিনি। প্রত্যেক মোয়াজ্জিন তার মসজিদের আশেপাশের প্রতি গৃহে গিয়ে নামাজ সম্বন্ধে তাদের সজাগ করে দিয়ে আসেন। যদি কেউ সামাজিক অর্থাৎ জামাতের নামাজে অনুপস্থিত থাকে তবে কাজী তাকে প্রকাশ্যে প্রহার করেন। এজন্য প্রত্যেক মসজিদেই একটি চাবুক ঝোলানো আছে দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়াও দোষী ব্যক্তিকে পাঁচ দিনার জরিমানা করা যায়। জরিমানার টাকা ব্যয় করা হয় মসজিদের কাজে অথবা দান খয়রাতে। তাদের কাছে শোনা যায়, অতি প্রাচীনকাল থেকেই এ রীতি নাকি তাদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে। শহরের বাইরে দিয়ে জয়হুন (Oxus) নদী প্রবাহিত। স্বর্গের চারটি নদীর মধ্যে জয়হুন একটি। ইটিল (ভগা) নদীর মতো এ নদীটির পানিও শীতকালে পাঁচ মাস জমাট বেঁধে থাকে। গ্রীষ্মকালে নদী তিরমি (Termez) অবধি জাহাজ চলাচলের উপযোগী হয়। নদীর অনুকুল স্রোতে জাহাজে তিরমি যেতে দশ দিন লেগে যায়। খারিজম পৌঁছে আমি শহরের উপকণ্ঠে তাবু ফেললাম। খবর পেয়ে কাজী তার একদল অনুসারীসহ আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। এসে বললেন, “আমাদের এ-জনবহুল শহরে দিনের বেলা ঢুকতে হলে আপনাকে বিশেষ বেগ পেতে হবে। কাজেই শেষ রাত্রের দিকে আমার সহকারী এসে আপনাকে শহরে নিয়ে যাবে। তার পরামর্শই আমরা মেনে নিলাম। আমাদের নিয়ে থাকতে দেওয়া হলো নতুন একটি স্কুলে (Academy)। তখনও সেটি কাজে লাগানো হয়নি। শুক্রবার নামাজের পরে আমি কাজীর সঙ্গে তার গৃহে গেলাম। মসজিদের নিকটেই তার গৃহ। অতি জাঁকজমকশালী একটি কোঠায় নিয়ে আমাকে বসানো হলো। মূল্যবান কাপের্ট এবং দেওয়ালে কাপড় লাগিয়ে সাজানো এ কোঠাটি। কোঠার একাধিক তাকের উপর সজ্জিত রূপার, গিটি করাও ইরাকী কাঁচের তৈজসপত্র। এ-দেশের লোকেরা এ-রীতিটি সবাই মেনে চলে।
কাজীকে সঙ্গে নিয়েই আমি আমীর কুতডামুরের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। গিয়ে দেখলাম পা বাঁধা অবস্থায় একখানা রেশমী কার্পেটের উপর তিনি শুয়ে আছেন। কারণ, তিনি তখন বাতরোগে ভুগছেন। তুর্কীদের মধ্যে বাত রোগটি খুব বেশি দেখা যায়। তিনি নিজের রাজ্য, খাতুন বায়ালুন, তাঁর পিতা এবং কনষ্টান্টিনোপল সম্বন্ধে নানা কিছু। জিজ্ঞেস করলেন। তারপর আমাদের.আহারের ব্যবস্থা করা হলো। মুরগীর রোষ্ট, সারস পাখী ও বাচ্চা কবুতরের মাংস, ঘৃতে ভাজা রুটি, বিস্কুট ও মিষ্টি এসে হাজির হলো। তারপরে এলো ফলমুল, ডালিম প্রভৃতি। কোনো-কোনো খাদ্য পরিবেশন করা হলো স্বর্ণ বা রৌপ্য পাত্রে সোনালী চামচের সাহায্যে। বাকি খাদ্য কাঁচপাত্রে কাঠনির্মিত৩ চামচ দিয়ে। পরে খাওয়ালো চমৎকার তরমুজ। স্কুলে ফিরে এসে আমীর আমাদের জন্য চাউল, ময়দা, ভেড়া, মাখন, মসলাপাতি ও জ্বালানী কাঠ পাঠিয়ে দিলেন। এ-সব দেশে কাঠ-কয়লার ব্যবহার প্রচলিত নেই। ভারতে এবং পারস্যেও তাই। চীন দেশে জ্বালায় এক রকম পাথর। কাঠ-কয়লার মতোই তা জ্বলে। একবার সেগুলো জ্বালানোর পরে। ছাইগুলো পানি দিয়ে মাখানো হয়। তারপর রৌদ্রে শুকিয়ে পুনরায় জ্বালানো হয়। আমীরের একটি অভ্যাসের কথা এখানে বলছি। প্রতিদিন কাজী তার আইন সম্বন্ধে। পরামর্শ দাতা ও লেখকদের নিয়ে আমীরের দরবারে হাজির হন এবং প্রধান আমীরদের কোনো একজনের সম্মুখে তার জন্য নির্দিষ্ট আসন গ্রহণ করেন। প্রধান আমীরের সঙ্গে থাকে আরও আটজন তুর্কী আমীর ও শেখ। তখন জনসাধারণ আসে তাদের মামলার বিচারের জন্য। যে সব মামলা পবিত্র আইনের আওতায় আসে সেগুলির বিচার করেন স্বয়ং কাজী বাকিগুলি বিচারের ভার উপস্থিত আমীরদের উপর। তারা পক্ষপাতিত্ব করেন না বা উৎকোচ গ্রহণ করে না বলে সূক্ষ্ম ও ন্যায় বিচার করে থাকেন। একদিন জুমার নামাজের পরে কাজী আমাকে বললেন, “আমীর আদেশ করেছিলেন আমাকে পাঁচশ দিরহাম উপহার দিতে এবং আরও পাঁচ শ দিরহাম ব্যয় করে একটি ভোজের আয়োজন। করে শেখ, চিকিৎসক এবং প্রধান-প্রধান ব্যক্তিদের নিমন্ত্রণ করতে। তখন আমি তাঁকে বললাম, আপনি যে ভোজের আয়োজন করতে চাইছেন তাতে অতিথিরা দু’এক গ্রাস খেতে পারেন কিন্তু সম্পূর্ণ টাকা মেহমানকে দিলে তিনি বেশি উপকৃত হবেন। তিনি তাতেই রাজী হয়ে আপনাকে এক হাজার দিরহামই দিতে বলেছেন। একটি বালক ভৃত্য এক হাজার দিরহামের (মরক্কোর তিনশ দিনারের সমতুল্য) একটি তোড়া এনে আমার হাতে দিল সেই দিনই পঁয়ত্রিশ রৌপ্য দিনার মূল্যে কালো রংয়ের একটি ঘোড়া কিনে সেই ঘোড়ায় চড়ে আমি মসজিদে গেলাম। ঘোড়াটির দাম পরিশোধ করলাম সেই হাজার দিরহাম থেকে। তারপরে আমার নিজস্ব ঘোড়ার সংখ্যা এতো বেড়ে গেলো যে তার সংখ্যা উল্লেখ করলে কোনো-কোনো সংশয়াকুল লোকের পক্ষে আমাকে মিথ্যাবাদী বলা অসম্ভব নয়। অতঃপর ভারতে পৌঁছা অবধি আমার দিনগুলো বেশ ভালোভাবেই কাটতে লাগলো। আমার অনেকগুলো ঘোড়া ছিল কিন্তু এ কালো ঘোড়াটিকেই আমি বেশি পছন্দ করতাম। আর সব ঘোড়ার সামনে একটি ঘেরাও করা জায়গায় এ ঘোড়াটি রাখা হতো। তিন বছরকাল এটি আমার সঙ্গে ছিলো। ঘোড়াটির মৃত্যুর পর আমার ভাগ্য পরিবর্তন হল খারাপের দিকে।
