৩০। প্রেসের ভিতর দিয়ে কনস্টান্টিনেপলের যে পথের বিবরণ ইব্নে বতুতা দিয়েছেন সেটা তার বর্ণনায় একেবারেই বুঝা যায় না।
এখানে, যেমন চীনের ব্যাপারে নামগুলির অপরিচিতি আশ্চর্য রকম বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে বিশেষ করে কুড়ি বছর কালের পরে যখন স্মৃতি থেকে তাদেরকে বের করা হয়েছে। ১৩৩১-৩২ খ্রীষ্টাব্দে সাম্রাজ্যের সীমান্ত শহর (এ নামটি ইব্নে বতুতার ইতিহাস অপেক্ষা তার এই ভ্রমণই প্রযুক্ত হওয়া উচিত) ছিল দিয়ামপোলিস, অন্যথায় ক্যাভুলি (এখন জ্যাবুলি)। এর স্থানে হয়তো “মাতুলি” বসতে পারে। “খোলটি” মনে হচ্ছে নদী কিম্বা মোহনা। লোকে স্বভাবতঃই মনে করতে পারে এটা দানিউব-যদিও এটাকে ভুলভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
ফ্যানিকা হচ্ছে সম্ভবতঃ আগাথনিকা যেখানে দিয়ামপোলিস্ থেকে প্রধান রাস্তা তুজা (তজস) নদী অতিক্রম করেছে কিজিল আগাচরে বা এর নিকটে। মাসলামা ইব্নে আবদুল মানিকের দূর্গ ৭১৬-৭ খ্রীষ্টাব্দে কনষ্টান্টিনেপলের বিরুদ্ধে আরব অভিযানের ইতিহাসের গল্পীয় পরিবৃদ্ধির অন্তর্গত। এ অভিযানের প্রধান অধিনায়ক ছিলেন মালামা।
৩১। কিফালি হচ্ছে গ্রীক কিফে শব্দের অক্ষরান্তরিত শব্দ। এর অর্থ, উপরওয়ালা প্রধান।
৩২। এ সময়ে সম্রাট ছিলেন এড্রোনিকাস, তৃতীয়; দ্বিতীয় এড্রোনিকাসের পৌত্র। তাফুর পদবী (আর্মেনিয়ান তাগাডর=রাজ) মুসলিম লেখকগণ ম্রাটের প্রতি এবং এশিয়ামাইনরের অন্য খ্রীষ্টান রাজাদের প্রতি প্রয়োগ করতেন, সম্ভবতঃ চীন সম্রাটের প্রতি প্রদত্ত পদবীর কাব্যময় সুর ফাগফুর (বাঘপুরের স্থানে, চীনে পদবীর পার্শিয়ান অনুবাদ “স্বর্গের পুত্র”) পদবী রূপে। এ কথার ব্যাখ্যা করা খুব কঠিন যে ইব্নে বতুতা কেমন করে ম্রাট দ্বিতীয় এন্তোনিকাসকে (ইনি ১৩২৮ খ্রীষ্টাব্দে সিংহাসন ত্যাগ করেন, সন্নাসী হন,এবং তার মৃত্যু হয় ১৩ই ফেব্রুয়ারি ১৩৩২ খ্রীষ্টাব্দে)জর্জ নামে অভিহিত করেছেন।
৩৩। এখানে যে অনুষ্ঠানে কথা বিবৃত করা হয়েছে সেটার মিল রয়েছে বাইজেন্টাইন দরবারের আনুষ্ঠানিক আচারের সঙ্গে। কনষ্টান্টিনেপল দখলের পরে অটোম্যান সুলতাগণ এটা গ্রহণ করেছিলেন।
৩৪। মুসলিমগণের বিশ্বাস যে যিশুকে শূলে হত্যা করা হয়নি। তাকে স্বর্গলোকে তুলে নেওয়া হয় এবং তার পরিবর্তে তারি অনুরূপ এক ব্যক্তিকে শূলে বিদ্ধ করা হয়।
৩৫। কনষ্টান্টিনেপলের সন্ন্যাসী এবং গীর্জার সংখ্যা মনে হয় এ সময়ে অধিকাংশ পর্যটকের বিষয় উৎপাদন করেছিল। বারট্রা দা লা ব্লোকুইয়ার সেখানে ১৪৩২-৩ সালের শীওক কাটিয়েছিলেন। তার হিসেবে সেখানে গির্জার সংখ্যা ছিল ৩,০০০ এবং তিনি বলেছেন, অধিকাংশ অধিবাসী আশ্রমে বাস করতেন। ক্লাভিজো, ৮৮ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।
৩৬। বারবার হচ্ছে হাইপারপাইরণের প্রতিবেশী। প্যালোনসের দিনারের খাদমিশ্রণ।
৩৭। তারপর দেশের সুরে অঞ্চলে দুটি শহর ছিল। এ দুটিই পর্যায়ক্রমে গোল্ডেন হোর্ডের খানদের রাজধানী ছিল। পুরানো সারাই অবস্থিত ছিল আধুনিক সেলিট্রেগ্রামের নিকটে, আখানে ৭৪ মাইল উপরে–আর নতুন সারাই যা আধুনিক পাবে, শহরে মিলিত সেটা ছিল আখানের ২২৫মাইল উপরে। সুলতান মুহম্মদ উজবে পুরানো সারাই থেকে এ সময় রাজধানী স্থানান্তরিত করেন নতুন সারাইয়ে-সম্ভবতঃ কিছু বছর পূর্বে। ইব্নে বতুতার বিবরণ নতুন সারাইয়ের সঙ্গে বেশ মিলে যায়। এর ধ্বংসাবশেষ চল্লিশ মাইলের উপর স্থান ব্যাপী। ছড়িয়ে আছে। এবং কুড়ি স্কোয়ার মাইল স্থানে ইহা ব্যাপ্ত। (এ, বেলোডিজের, ইন্ ল্যাটভিজাস্ ইউনিভারসিটেটিস্ রাস্তি আক টা ইউনিভারসিটেটিস ল্যাভিয়েনসিজ,১৩খণ্ড (রিগা, ১৯২৬, ৩-৮২পৃঃ)
০৫. খারিজম রওয়ানা
পাঁচ
সারা থেকে আমরা খারিজম রওয়ানা হলাম। রাজধানী সারা থেকে খারিজম যাবার পথ। মরুভূমির ভেতর দিয়ে। চল্লিশ দিন লাগে সেখানে যেতে। পথে ঘোড়ার খাদ্যের উপযোগী ঘাস পাতা পাওয়া যায় না বলে ঘোড় নিয়ে এ-পথে অগ্রসর হওয়া যায় না। গাড়ী টানার জন্য এ-পথে উট ব্যবহার করা হয়। সারা ত্যাগের দশদিন পরে আমরা সারাচাকে পৌঁছি। সারাচাকের অর্থ ছোট সারা। শহরটি উসুল(উরাল) নামক একটি বেগবতী নদীর তীরে অবস্থিত। বাগদাদ শহরের সেতুর মতো এ-নদীটির পারাপার ব্যবস্থাও নৌকোর তৈরী সেতুর সাহায্যে। এখানে লটবহর সহ আমরা পৌঁছেছিলাম ঘোড়ার সাহায্যে। এবার ঘোড়ার স্থান দখল করবার জন্য উট ভাড়া করতে হলো। ঘোড়াগুলো অত্যন্ত পথক্লান্ত ও দুর্বল হয়ে পড়েছিলো। ঘোড়ার দামও এখানে অত্যন্ত সস্তা। এজন্য মাত্র চার রৌপ্য দিনার বা তারও কমে প্রতিটি ঘোড় বিক্রী করতে হলো। এখান থেকে শুরু করে চল্লিশ দিন অবধি আমাদের চলতে হলো খুবই দ্রুতগতিতে। এ সময়ে শুধু দ্বিপ্রহরের পূর্বে ও সূর্যাস্তের পরে দু’ঘন্টার জন্য রান্না ও জোয়ারের (millet) তৈরী সুরুয়া খাওয়ার জন্য আমরা থেমেছি। প্রত্যেকের সঙ্গেই শুষ্ক মাংস থাকে। সুরুয়ার উপরে মাংস দিয়ে সবটার উপরে দৈ ঢেলে দেওয়া হয়। গাড়ী চলতে থাকা অবস্থায় প্রত্যেকেই নিজের-নিজের গাড়ীতে বসে খায় ও ঘুমায়। পথে গবাদি পশুর খাদ্যেপযোগী ঘাস-পাতার অভাব বলে এ-পথে পথিককে চলতে হয় অত্যন্ত দ্রুতগতিতে। এ কঠিন পথ অতিক্রম করবার পরে অধিকাংশ উটই মরে যায়। মরে যেগুলো অবশিষ্ট থাকে সেগুলোকেও এক বছরের আগে অর্থাৎ মোটা-তাজা না হলে কাজে লাগানো সম্ভব হয় না। দু’তিন দিনের পথ অতিক্রম করবার পর-পর বৃষ্টির দরুণ সঞ্চিত বা অগভীর কূপে পানির ব্যবস্থা আছে।
