খাতুনের সঙ্গী তুর্কীরা বুঝতে পারলো, খাতুন তার পিতার ধর্মে বিশ্বাসী এবং পিতার সঙ্গেই তিনি থাকতে চান। তখন তারা স্বদেশে ফিরে যাবার অনুমতি চাইলো। তিনি তাদের মূল্যবান উপহার সামগ্রী দিয়ে বিদায় দিলেন। তাছাড়া পাঁচশ ঘোড়াসওয়ারসহ সারুজা নামক একজন আমীরকে সঙ্গে দিলেন তাদের দেশে পৌঁছে দিতে। তিনি আমাকেও ডেকে পাঠালেন। আমাকে দিলেন বারবারা নামক তাদের দেশে। প্রচলিত তিন’শ স্বর্ণমুদ্রা। মুদ্রা হিসাবে বারবার ৩৬ ভাল নয়। আর দিলেন এক হাজার ভেনিসের রৌপ্যমুদ্রা, সে সঙ্গে বস্ত্র ও পোষাক পরিচ্ছদ এবং তার পিতার দেওয়া দুটি ঘোড়া। তার পর আমাকে সারুজার হাওলা করে দিলেন। তাদের শহরে একমাস ছ’ দিন কাটিয়ে বিদায় নিয়ে এলাম। সীমান্ত পৌঁছে আমাদের সঙ্গীদের এবং মালপত্রসহ গাড়ী নিয়ে মরুভূমির পথে ফিরে এলাম। বাবা সালটাক অবধি সাজা আমাদের সঙ্গে এলেন। তারপর তিনদিন সেখানে মেহমান থেকে দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন।
তখন ছিল শীতকাল। আমি পশম-দেওয়া তিনটি কোট গায়ে ব্যবহার করি। সে সঙ্গে দুটি পাজামা, তার একটিতে আস্তর লাগানো। পায়ে প্রথমে উলের মোজা তার উপর আস্তর লাগানো সূতী মোজা, তার উপর ভল্লুকের পশম-লাগানো ঘোড়র চামড়ার জুতা। আগুনের কাছে বসে গরম পানি দিয়ে আমি ওজু করি। কিন্তু প্রত্যেক ফোঁটা পানি সঙ্গে-সঙ্গে জমে বরফ হয়ে যায়। যখন মুখ ধুই তখন দাড়ী বেয়ে পানি পড়েই জমে যায়। বরফ হয়ে। সে শুলো ঝেড়ে ফেলে তুষারের মতো ছড়িয়ে পড়ে। নাক বেয়ে পানি পড়ে গোঁফের উপর এসেই জমে যায়। গায়ে যে-সব কাপড়-চোপড়ের বহর চাপিয়ে ছিলাম তা নিয়ে ঘোড়ার পিঠে উঠতে আমার অসুবিধা হচ্ছিলো। সঙ্গীরা তখন ধরে আমাকে জিনের উপর চাপিয়ে দিলো।
আমরা সুলতান উজবেগকে হতারখানে (আস্ত্রাখান) রেখে এসেছিলাম। ফিরে গিয়ে দেখলাম তিনি তার রাজধানীতে চলে গেছেন। আমরা ইটিল (ভগা) নদী ও আশেপাশের জলাশয়ে ভ্রমণ করলাম। সে-সবই জমে তখন বরফ হয়ে গেছে। রান্না খাওয়ার জন্যে পানির দরকার হলেই আমরা বরফ ভেঙ্গে একটি পাতে টুকরা রেখে দিতাম। তাই গলে পানি হতো। এমনি করে চলে চতুর্থ দিনে আমরা সুলতানের রাজধানী৩৭ সারা গিয়ে পৌঁছলাম। তাঁর সঙ্গে দেখা করে আমাদের সফরের কথা, গ্রীকদের রাজার কথা এবং তাদের শহরের কথা সুলতানকে বললাম। সব শুনে সুলতান আমাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হুকুম দিলেন। চমৎকার বাজার ও প্রশস্ত রাস্তাঘাটযুক্ত সারা একটি সুন্দর ও বড় শহর। একদিন আমরা স্থানীয় একজন প্রসিদ্ধ লোকের সঙ্গে ঘোড়ায় চড়ে শহরটি কতো বড় তাই জরিপ করতে বের হলাম। শহরের একপাশে আমরা বাস করতাম। একদিন ভোরে বেরিয়ে শহরের অপর পাশ অবধি পৌঁছতে অপরাহ্ন হয়ে গেলো। আরেক দিন হেঁটে বের হলাম শহর কতটা চওড়া তাই দেখতে। যাওয়া এবং আসায় আধা দিন লেগে গেলো তাও গেলাম দু’পাশে শুধু বাড়ি দেখে, সেখানে কোনো ভগ্নাবশেষ বা বাগান চোখে পড়লো না। এখানে তেরোটি গীর্জা এবং অনেকগুলো মসজিদ আছে। এখানকার অধিবাসীদের মধ্যে রয়েছে নানা জাতীয় লোক। তাদের মধ্যে মঙ্গলরাই দেশের শাসনকর্তা। তারা অংশতঃ মুসলিম। আর রয়েছে মুলিম আস্ (Ossetes) এবং কিপচা সারকাসিয়ানস (Circassians) রুশ ও গ্রীক। এদের সবাই খ্রীষ্টান। প্রত্যেক দলেরই পৃথক মহল্লা, পৃথক বাজার। ইরাক, মিশর ও সিরিয়ার সওদাগর ও বিদেশী লোকেরা নিজ নিজ ধনসম্পত্তি রক্ষার সুবিধার জন্যে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা একটি মহল্লায় বাস করে।
টিকা
পরিচ্ছেদ ৪
১। বিলাদ আর্-রুম প্রকৃতপক্ষে “গ্রীদের দেশ” যদিও সাধারণতঃ ব্যবহৃত হয় বাইজান্টাইন প্রদেশ সম্বন্ধে-স্বভাবতঃই এটাকে প্রয়োগ করা হয়েছিল বিশেষভাবে আনাতোলিয়ার সীমান্ত প্রদেশ সম্পর্কে। প্রথম শতাব্দগুলির দিকে কতকগুলি অস্থায়ী অধিকারের পরে এ দেশটি শেষবার অধ্যুষিত হয়েছিল ১০৭১ এবং ১০৮১-এর মাঝামাঝি সাজুক তুর্কিদের দ্বারা। তেরো শতাব্দীর শেষ দিকে খ্ৰীষ্টানদের (বাইজেটিয়ার, ত্রেবিজণ্ড এবং আর্মেনিয়া) অধিকৃত কিম্বা ইরানের শাসকদের অধিকৃত কতগুলি জায়গা ছাড়া সমস্ত পেনিনসোলাটি কোনিয়ার সাজুক সুলতানের পক্ষ নিয়েছিল। কিন্তু তেরো শতাব্দীর কিছু পূর্ব থেকে স্থানীয় প্রধানদের মধ্যে দেশটি ভাগ হয়ে গিয়েছিল। এদের প্রদেশগুলি ক্রমে অটোম্যান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত হয়ে পড়ছিল।
২। আলেয়া বন্দর নির্মাণ করেছিলেন রোমের শ্রেষ্ঠতম সালজুক সুলতান আলাউদ্দিন কায়কোবাদ ১ম (১২১৯-৩৭), এবং তার নামানুসারে স্থানটির নাম দেওয়া হয় পশ্চিমী সওদাগরদের নিকট আরোস থেকে)। মিশরে কাঠের অভাব হেতু সেখানে বৃহৎ পরিমাণ কাঠ। আমদানী করা হতো তার নৌ-বহর ইত্যাদি নির্মাণের কাজে।
৩। আদোলিয়া’ পশ্চিমী সওদাগরদের নিকট স্যাটালিয়া বলে পরিচিত। আনাতোলিয়ার দক্ষিণ সমুদ্র-উপকুলে এটা ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ঘাঁটি। এখানে মিশরীয় এবং সাইপ্রিয়ট বাণিজ্য বেশ প্রবল ছিল। লেবুকে মিশরে এখনো আদালিয়া বলা হয়।
৪। রাতের বেলা এবং শুক্রবারের নামাজের সময় নগরের গেটগুলি বন্ধ করে দেওয়ার এবং খ্রীষ্টানদের বাইরে রাখার নিয়ম আধুনিক কাল পর্যন্ত ও ভূমধ্যসাগরীয় বহু স্থানে প্রচলিত ছিল; যেমন সাফাক্সে। সম্ভবতঃ এরূপ করা হতো অকস্মাৎ আক্রমণের আশঙ্কায়।
