শহরটি বেশ বড় এবং একটি প্রকাও নদীর দ্বারা দু’ভাগে বিভক্ত। এ নদীটিতে জোয়ার ভাটা হয়। আগে এ নদীর উপর পাথরের একটি সেতু ছিল। এখন তা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় নৌকার সাহায্যে পারাপার করা হয়। নদীর পূর্ব পারে শহরটির যে অংশ পড়েছে সে অংশের নাম ইস্তাম্বুল। বাদশাহ, আমীর ওমরাহ এবং অন্যান্য সবারই বাসস্থান এ অংশের অন্তর্ভুক্ত। এ শহরের বাজার ও রাস্তাঘাট বেশ প্রশস্ত এবং শান্ বাঁধানো। প্রতিটি বাজারেরই প্রবেশদ্বার আছে, রাত্রে তা বন্ধ করে রাখা হয়। বাজারের বিক্রেতা ও শ্রমশিল্পীদের বেশীর ভাগই নারী। একটি পাহাড়ের পাদদেশে এ শহর। অবস্থিত। পাহাড়টি সমুদ্রের দিকে প্রায় নয় মাইল বেড়ে গেছে। পাহাড়টির প্রস্থও তদনুরূপ তা ততোধিক হবে। পাহাড়ের চূড়ায় রয়েছে ছোট্ট একটি দূর্গ এবং শাহী প্রাসাদ। শহর-প্রাচীর তৈরি করা হয়েছে পাহাড়টি আবেষ্টন করে। এ প্রাচীরটি এতো সুদৃঢ় যে সমুদ্রের দিক থেকে আক্রমণ করবার আশঙ্কা নেই। এ আবেষ্টনীর মধ্যে রয়েছে তেরোটি গ্রাম। এখানকার প্রধান গীর্জাটি শহরের এ অংশের মধ্যস্থলে অবস্থিত। নদীর পশ্চিম তীরস্থ শহরের অপরাংশ গালাটা নামে পরিচিত এবং ফরাসী (Frankish)। খৃষ্টানদের বাসের জন্য নির্দিষ্ট। এ অংশে তারাই বসবাস করে। ফরাসী ছাড়াও এদের ভেতর রয়েছে জেনেভা, ভেনিস ও রোমের লোকজন। কনস্টান্টিনোপলের রাজার কর্তৃত্ব। তারা মেনে চলে এবং তাদের অনুমোদনক্রমে রাজা তাদের ভেতর থেকে একজনকে কর্তৃত্বের ভার দেন। এদের কাছে সে ব্যক্তি (Comes) কোসেম্ নামে পরিচিত। তারা প্রতি বছরই রাজাকে একটা কর দিতে বাধ্য। অনেক সময় তারা বিদ্রোহও করে এবং রাজা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। তখন পোপ এসে উভয় দলের ভেতর শান্তি স্থাপন করেন। তারা সবাই ব্যবসায়ী। পৃথিবীর অন্যতম প্রসিদ্ধ পোতাশ্রয়ের তারা অধিকারী। আমি সেখানে একসঙ্গে শতেক গালিও বড় জাহাজ দেখেছি। ছোট জাহাজ সেখানে এতো বেশী যে গুণে শেষ করা যায় না। শহরের এ অংশের বাজারগুলিও ভাল কিন্তু অত্যন্ত নোংরা। বাজারগুলির ভেতর দিয়ে ক্ষুদ্র একটি নদী বয়ে গেছে। সে নদীটিও অত্যন্ত নোংরা। এমন কি তাদের গীর্জাগুলিও নিম্নস্তরের এবং ময়লাযুক্ত।
প্রসিদ্ধ গীর্জাটির বাইরের বর্ণনাই আমি দিতে সক্ষম। কারণ, এ গীর্জার অভ্যন্তর দেখবার সুযোগ আমার হয়নি। তারা এ গীর্জার নাম দিয়েছে আয়া সোফিয়া (St. Sophia)। কিংবদন্তী প্রচলিত আছে, গীর্জাটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বেরেচিয়ার পুত্র আসা। বেরেচিয়া সলোমনের Cousin (জ্ঞাতি ভাই)। গ্রীসদের প্রসিদ্ধ গীর্জাগুলির মধ্যে এটি অন্যতম। গীর্জাটি দেওয়াল দ্বারা এভাবে বেষ্টিত যে দেখে একটি শহর বলেই মনে হয়। এর তেরটি প্রবেশপথ আছে এবং ঘেরাও করা একটি পবিত্র স্থান আছে। স্থানটি এক মাইল লম্বা এবং একটি মাত্র প্রবেশদ্বার। কারও এ আবেষ্টনীর ভেতর প্রবেশ করতে বাধা নিষেধ নেই। বস্তুতঃ আমি প্রবেশ করেছিলাম রাজার পিতার সঙ্গে। মার্বেল পাথরে মোড়া এ স্থানটি একটি দরবার গৃহের মত। গীর্জা থেকে বেরিয়ে একটি নহর এখান দিয়ে বয়ে চলেছে। এ চত্বরের প্রবেশদ্বারের বাইরে রয়েছে বেদী ও দোকানপাট। অধিকাংশই কাঠের তৈরী। এখানে তাদের বিচারকগণ এবং দপ্তর-রক্ষকগণ বসেন। গীর্জার দরজার বাইরে বারান্দার নীচে থাকে গীর্জার তত্বাবধানকারীরা। তারা রাস্তায় ঝাট দেয়, গীর্জার আলো জ্বালে ও দরজা বন্ধ করে। সেখানে যে প্রকাণ্ড একটি কুশ রক্ষিত আছে, তার সামনে প্রণত না হলে তারা কাউকে গীর্জায় ঢুকতে দেয় না। তারা দাবী করে, কাঠের এ স্মরণ চিহ্নটির উপরে কৃত্রিম যীশুকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল৩৪। দশ হাত উপরে গীর্জার প্রবেশদ্বারের মাথায় একটি সোনলী বাক্সের মধ্যে এটি রাখা হয়েছে। একটি ক্রুশ তৈরি করার উদ্দেশ্যে আরেকটি সোনালী বাক্স রাখা হয়েছে। আড়াআড়ি ভাবে। প্রবেশদ্বারটি সোনা ও রূপার পাতে মোড়া; রিং দুটি খাঁটি সোনার তৈরী। শুনেছি এ গীর্জার পাদ্রী ও সন্যাসীদের সংখ্যা হাজার হাজার। তাদের অনেকে নাকি যীশুখৃষ্টের দ্বাদশ শিষ্যের বংশধর। এ গীর্জার ভেতরে আরও একটি গীর্জা রয়েছে শুধু স্ত্রীলোকদের জন্য। তাদের ভেতর প্রায় এক হাজার হবে কুমারী। বয়স্থা নারীর সংখ্যা আরও বেশী। ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদির জন্য তারা নিজেদের উৎসর্গ করেছে। রীতি অনুসারে প্রতিদিন ভোরে রাজা, তাঁর অমাত্যগণ ও অন্যান্য লোকজন এ গীর্জায় আগমন করেন। পোপ ও গীর্জায় আসেন বছরে একবার। তিনি চার দিনের রাস্তা দূরে থাকতেই রাজা তাকে অভ্যর্থনা করতে যান। তার সামনে হাজির হয়ে ঘোড়া থেকে নেমে দাঁড়ান। গোপ যখন এসে নগরে প্রবেশ করেন তখন রাজা তার আগে নগ্নপদে যেতে থাকেন। যতদিন পোপ কনস্টান্টিনোপলে অবস্থান করেন, প্রতিদিন সকালে বিকালে রাজা এসে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
মুসলমানদের যেমন Religious house বা Conventখৃষ্টানদের তেমনি Monastery. কনস্টান্টিনোপলে এ ধরনের অনেক monastery রয়েছে। তার ভেতর রাজ জর্জ যেটি তৈরী করিয়েছেন সেটি ইস্তাম্বুলের বাইরে গাটালার উল্টা দিকে। আরও দু’টি monastery আছে প্রধান গীর্জার বাইরে, গীর্জার প্রবেশ পথের দক্ষিণে। এ monastery দু’টি তৈরী হয়েছে একটি বাগানের মধ্যে। বাগনটিকে দু’ভাগ করেছে একটি নহর। monastery–র একটি পুরুষদের জন্য অপরটি নারীদের। প্রত্যেক monastery–র ভেতরেই একটি করে গীর্জা। গীর্জার চার পাশ ঘিরে রয়েছে ছোট ছোট কুঠরী বা কামরা। ধর্মের নামে উৎসর্গ কৃত নারী পুরুষরা। সেখানে বাস করে ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালন করে। প্রত্যেক monastery-র বাসিন্দাদের খোরপোষের ব্যয় নির্বাহ হয় ধর্ম প্রাণ লোকদের দানে। যে রাজা monastery তৈরী করেছেন তার। সন্ন্যাসজীবন যাপনের জন্য প্রত্যেক monastery-র ভেতরেই একটি করে ছোট Convent রয়েছে। কারণ, রাজাদের মধ্যে অনেকেই ষাট সত্তর বৎসর বয়স হলে একটি nonastery তৈরী করে ছেলেদের উপর রাজ্য চালনার ভার ন্যস্ত করে বাকী জীবন Convent–এ এসে ধর্মচর্চায় কাটান। কারুকার্যখচিত মর্মর প্রস্তর দ্বারা এসব জাঁকজমকশালী monastery তৈরী করা হয়। রাজার দেওয়া একজন গ্রীক পরিচালকের সঙ্গে আমি একটি monastery-তে প্রবেশের সুযোগ পেলাম। তার ভেতরে একটি গীর্জায় দেখলাম পশমী কাপড় পরিহিত প্রায় পাঁচশ কুমারী। তাদের সবারই মুণ্ডিত মস্তক পশমী টুপীতে ঢাকা। কুমারীদের সবাই অন্ততঃ সুন্দরী কিন্তু কৃসাধনের সুস্পষ্ট ছাপ তাদের মধ্যে রয়েছে। তাদের সামনে বেদীর উপর বসে এক যুবক অতি সুললিত সুরে তাদের বাইবেল (Gospel) পড়ে শুনাচ্ছিলো। তেমন সুললিত স্বর আমি কমই শুনছি। তাকে ঘিরে আরও আটজন যুবক তাদের পুরোহিতের সংগে নিজ-নিজ বেদীর উপর বসে আছে। প্রথম যুবকের পড়া শেষ হতেই আরেকজন পড়তে আরম্ভ করে। পরিচালক গ্রীক আমাকে বললো, “এসব কুমারীরা রাজার কন্যা। গীর্জার কাজের জন্য এরা জীবন উৎসর্গ করেছে। তেমনি যুবকরাও রাজার ছেলে।” যে সব গীর্জায় মন্ত্রী, শাসনকর্তা এবং প্রসিদ্ধ অপরাপর ব্যক্তিদের কন্যারা রয়েছে আমি সে সব গীর্জায়ও তার সংগে প্রবেশ করেছি। এছাড়া সেখানে বয়স্থা নারীরা এবং সন্ন্যাসীরাও রয়েছে। প্রত্যেক গীর্জায় প্রায় শতেক লোক বাস করে। শহরের অধিকাংশ বাসিন্দাই সন্ন্যাসী, কাঠোর সংযমী তাপস অথবা পুরোহিত।৩৫ সৈনিক থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক অবধি এ শহরের ছোট বড় সবাই শীত ও গ্রীষ্মে মাথায় প্রকাণ্ড ছাতা ব্যবহার করে। মেয়েরা ব্যবহার করে প্রকাণ্ড পাগড়ী। একদিন আমার গ্রীক পরিচালকের সঙ্গে বাইরে বেড়াতে বের হয়ে ভূতপূর্ব রাজা জর্জের দেখা পেলাম পথে। তিনিও এখন সন্ন্যাভ্রত পালন করেছেন। পশমী বস্ত্র পরিহিত মাথায় পশমী টুপি দিয়ে পায়ে হেঁটে তিনি যাচ্ছিলেন। লম্বা সাদা দাড়ি র মুখে। দেখলেই কঠোর সংযমী বলে চেনা যায়। তার সামনে ও পেছনে রয়েছে একদল ন্ন্যাসী। তার হাতে একটি যষ্ঠী, গলায় তসবী। তাকে দেখেই ঘোড়া থেকে নেমে গ্রীক আমাকে বলল, “নেমে পড়ন, ইনি আমাদের রাজার পিতা। পরিচালক তাকে অভিবাদন করার পরে তিনি তাকে আমার পরিচয় জিজ্ঞেস করলেন। তারপর একটু থেমে আমাকে কাছে ডাকলেন। তিনি আমার হাত ধরে আরবী জানা সেই গ্রীক পরিচালককে বললেন, “এই মুসলিমকে বুঝিয়ে বলল, যে হাত জেরুজালেমে প্রবেশ করেছে এবং যে পদদ্বয় Dome of the Rock এবং Holy sepulchreও বেথেলহামের পবিত্র গীর্জায় প্রবেশ করেছে আমি তাই ধারণা করছি।” এই বলে তিনি আমার পা ছুঁয়ে হাত বুলালেন নিজের মুখে। বিধর্মী হয়েও এসব পুণ্যস্থান যারা দর্শন করেন তাঁদের প্রতি এদের অগাধ ভক্তি দেখে আমি বিস্মিত হলাম। তিনি আবার আমার হাত ধরে এক সঙ্গে চলতে লাগলেন। চলতে চলতে বহুক্ষণ অবধি অনেক কিছু জিজ্ঞেস করলেন- জেরুজালেম এবং সেখানকার খৃষ্টানদের সম্বন্ধে। গীর্জায় ঘেরাও করা যে পবিত্রস্থানের বর্ণনা আমি উপরে দিয়েছি সেখানেও আমি তার সঙ্গে প্রবেশ করেছি। তিনি যখন প্রধান প্রবেশদ্বারের দিকে যাচ্ছিলেন তখন একদল পুরোহিত ও সন্ন্যাসী এগিয়ে এলে তাকে অভিবাদন করতে, কারণ অন্যতম প্রধান ব্যক্তি। তাদের অগ্রসর হতে দেখে তিনি আমার হাত ছেড়ে দিলেন। আমি তখন তাকে বললাম, “আমারও ইচ্ছে হয় আপনার সঙ্গে গীর্জার ভেতরে ঢুকতে।” তখন তিনি দোভাষীর। দিকে ফিরে বললেন,”যে এ গীর্জায় ঢুকতে চাইবে তাকে প্রথম ঐ বিখ্যাত ক্রুশের সামনে সেজদা করতে হবে। এ রীতি আমাদের পূর্বপুরুষের সময় থেকে প্রচলিত রয়েছে। এবং তা রদ করবার উপায় নেই। কাজেই আমাকে ফিরে আসতে হলো। তিনি একাই গিয়ে গীর্জায় ঢুকলেন। এরপর তার আর দেখা পাইনি। রাজাকে ছেড়ে আমরা এসে বাজারে দালাল লোকদের কাছে এলাম। সেখানে Judge আমাকে দেখতে পেয়ে তার। একজন সহকারীকে পাঠালেন পরিচালকের কাছে আমার পরিচয় জানতে। আমি একজন মুসলিম পণ্ডিত শুনে তিনি আমাকে ডেকে পাঠালেন। তিনি সুদর্শন একজন বৃদ্ধি ব্যক্তি, তাঁর পরিধানে সন্ন্যাসীর কাল পোক। জন দশেক লোক তার সামনে বসে লিখছে। আমাকে দেখে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। সঙ্গে-সঙ্গে তাঁর সঙ্গীরাও উঠল। তিনি বললেন “আপনি আমাদের রাজার মেহমান, সিরিয়া ও মিশরের অনেক কথা জিজ্ঞেস করলেন। বহুক্ষণ অবধি আমরা কথাবার্তা বললাম। অনেক লোক এসে জড়ো হলো তার চারপাশে। তিনি বললেন, “একদিন আমার বাড়িতে নিশ্চয়ই আসবেন যাতে আপনার মেহমানদারী করবার সুযোগ পাই।” বিদায় নিয়ে আমি চলে এলাম। তারপরে আর তাঁর সঙ্গে দেখা হয়নি।
