আমরা দুপুর বেলা অথবা দুপুরের একটু পরে কনস্টান্টিনোপলে প্রবেশ করলাম। শহরের লোকেরা আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে ঘন্টা বাজাতে আরম্ভ করে। রাজপ্রাসাদের প্রথম প্রবেশদ্বারে পৌঁছে দেখতে পেলাম প্রায় শতেক লোক সেখানে দাঁড়িয়ে। তাদের সঙ্গে মঞ্চে দাঁড়িয়ে একজন সর্দার। তাদের বলতে শুনলাম সারাকি সারাকিনু অর্থাৎ মুসলিম মুসলিম। তারা আমাদের ভিতরে প্রবেশ করতে দেবে না। খাতুনের সঙ্গীরা। তখন বুঝিয়ে দিল যে আমারও তাদের সঙ্গী। কিন্তু উত্তরে তারা বলল “বিনানুমতিতে এদের ঢুকতে দেওয়া নিষেধ। কাজেই আমরা সেখানে দাঁড়িয়ে রইলাম। খাতুনের একজন সঙ্গী গিয়ে খাতুনকে এ সংবাদ জানাল। ধাতুন তখনও পিতার কাছেই ছিলেন। তিনি পিতাকে আমাদের বিষয় জানাতেই আমরা ভিতরে প্রবেশের অনুমতি পেলাম এবং বাসস্থানের কাছে একটি বাসগৃহও পেলাম। এ ছাড়া তিনি হুকুম দিলেন, শহরের কোথাও যেতে আমাদের যেনো বাধা দেওয়া না হয়। তার এ হুকুম বাজারে ঘোষণা। করে দেওয়া হল। আমরা তিন দিন প্রাসাদের ভেতরেই রইলাম। খাতুন আমাদের জন্য ময়দা, রুটী, গোশত, মুরগী, মাখন, মাছ, ফল, টাকা-পয়সা, ও শয্যদ্রব্য পাঠিয়ে দিলেন। চতুর্থ দিনে আমরা সুলতানের দরবারে যাবার সুযোগ পেলাম।
কনস্টন্টিনোপলের ম্রাটের নাম তাকফুর। পিতার নাম সম্রাট জিরজিস (জর্জ)৩২। তাঁর পিতা ম্রাট জর্জ তখনও জীবিত কিন্তু তিনি ছেলের হাতে রাজত্ব দিয়ে নিজে গীর্জায় থেকে সন্ন্যাসীর জীবনযাপন করছেন ও ধর্মচর্চা করেছেন। তার কথা আমরা পরে বলব। আমাদের কনস্টান্টিনোপলে পৌঁছবার চতুর্থ দিনে খাতুন তার ভারতীয় ক্রীতদাস সানবুলকে আমাদের কাছে পাঠালেন। সে আমার হাত ধরে প্রাসাদের ভেতরে নিয়ে গেল। আমরা পর-পর চারটি দেউড়ী পার হয়ে গেলাম। প্রত্যেক দেউড়ীতে খিলানের নীচে সশস্ত্র পদাতিক সৈন্যরা রয়েছে। তাদের অধিনায়ক রয়েছে কার্পেট মোড়া মঞ্চের উপর। পঞ্চম দেউড়ীতে পৌঁছতেই সানবুল আমাকে সেখানে রেখে অন্যত্র চলে গেল এবং ফিরে এল চারজন গ্রীক যুবক সঙ্গে নিয়ে। আমার সঙ্গে কোন ছুরি আছে কিনা দেহ তল্লাসী করে তারা দেখে নিল। একজন কর্মচারী আমাকে বললেন, “এটা এদের রীতি। যিনি রাজার নিকট যাবেন তিনি আমীর ফকির বা দেশী বিদেশী যাই হন না কেন তার দেহ তল্লাসী করা হবেই হবে।” এ রকম রীতি ভারতেও প্রচলিত আছে। দেহ তল্লাসীর পরে দেউড়ীর ভারপ্রাপ্ত লোকটি উঠে আমাকে হাত ধরে নিয়ে দরজা খুললেন। তখন চারজন লোক আমাকে ঘিরে ধরল। তাদের দু’জন ধরল আমার জামার আস্তিন আর দু’জন দাঁড়াল পিছনে। তারপরে আমাকে নিয়ে এল প্রকাণ্ড একটি হলে। হলের দেওয়ালগুলি কারুকার্যখচিত। তাতে রয়েছে বিভিন্ন প্রাণী ও প্রাণহীন বর চিত্র। মধ্যস্থলে একটি নহর, নহরের দু’পাশে গাছ। ডানে ও বামে লোক দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু কারো মুখে কোন কথা নেই। হলে আরও তিনজন লোক দাঁড়িয়ে ছিল। আমাকে তাদের হাতে দিয়ে আগের চারজন চলে গেল। আগের লোকদের মত এরাও আমার জামা ধরল এবং অপর একজনের ইঙ্গিতে আমাকে সামনের দিকে নিয়ে চলল৩৩। তাদের ভেতর একজন ছিল ইহুদী। তিনি আমাকে আরবীতে বললেন, “ভয় পাবেন না। ভিতরে যারা যান তাদের সঙ্গে এ রকম ব্যবহারই এরা করে। আমি এখানকার দোভাষী। আমি সিরিয়ার অধিবাসী।” এ কথা শুনে সুলতানকে কিভাবে অভিবাদন করতে হবে আমি জিজ্ঞেস করলাম। তিনি আমাকে “আচ্ছালামু আলাইকুম” বলতে পরামর্শ দিলেন। আমরা প্রকাণ্ড একটি চন্দ্রাতপের নীচে এসে হাজির হলাম। সেখানে সম্রাট তাঁর সিংহাসনে বসে ছিলেন। সঙ্গে ছিলেন তার মাহিষী, খাতুনে মাতা। সিংহাসনের পাদদেশে বসেছেন খাতুন ও তার ভাইয়েরা। সিংহাসনের ডান দিকে ছ’জন, বাঁ দিকে চারজন এবং পছনে চারজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। সবাই তারা সশস্ত্র। আমি সম্রাটের কাছে গিয়ে তাকে অভিবাদন করবার আগেই তিনি আমাকে অভয় দেওয়ার জন্য একটু বসতে ইঙ্গিত করলেন। একটু বসে আমি তার কাছে এগিয়ে গিয়ে তাকে অভিবাদন জানাতে তিনি আমাকে বসতে বললেন, কিন্তু আমি দাঁড়িয়েই রইলাম। তিনি আমাকে জেরুজালেম, পবিত্র পাহাড়, পবিত্র সমাধির গীর্জা, ঈসার দোলনা এবং বেলেহেম সম্বন্ধে নানান কথা জিজ্ঞেস করলেন। তারপরে জিজ্ঞেস করলেন, হজরত ইব্রাহিমের (Hebron) শহর, দামাস্কাস, কায়রো, ইরাক ও আনাতোলিয়ার কথা। আমি তার সমস্ত প্রশ্নের জবাব দিলে সঙ্গে-সঙ্গে ইহুদী দোভাষী তা বুঝিয়ে দিলেন। তিনি আমার জবাবে সন্তুষ্ট হয়ে নিজের ছেলেদের বললেন, “এর সঙ্গে সম্মানজনক ব্যবহার করবে এবং কোনো রকম বিপদ-আপদে না পড়েন সে দিকে লক্ষ্য রাখবে।”
অতঃপর তিনি আমাকে সম্মানসূচক একটি পোষাক জীন ও লাগামসহ একটি ঘোড়া, সম্রাটের নিজের ব্যবহারের ছাতার মত একটি ছাতা উপহার দিলেন। ছাতাটি হল নিরাপত্তার চিহ্ন। আমার সঙ্গে থেকে প্রত্যহ শহরের নানা দ্রষ্টব্য জিনিষ দেখাবার জন্য একটি লোক আমার জন্য নিযুক্ত করে দিতে সম্রাটকে অনুরোধ জনালাম। তাহলে যা-কিছু সুন্দর ও অভিনব আমার চোখে পড়বে তার কথা দেশে গিয়ে বলতে পারব। আমার অনুরোধ রক্ষা করে একজন লোক নিযুক্ত করে দিলেন। তাদের দেশের রীতি হলো, কেউ যদি সম্রাটের সম্মানসূচক পোষাক ও ঘোড় উপহার পায় তবে জয়ঢাক, ঢোল, বাঁশী বাজিয়ে এমনভাবে তাকে শহর প্রদক্ষিণ করানো হয় যাতে সবাই তাকে দেখতে পায়। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে এ রীতি তারা পালন করে চলে তুর্কীদের বেলা, যাতে কেউ তাদের কোন রকম অত্যাচার না করে। এভাবে আমাকে নিয়েও শহর প্রদক্ষিণ করা হল।
