এরপর আমরা মাসলামা ইব্নে আবদুল মালেকের দূর্গে পৌঁছলাম। একটি পর্বতের পাদদেশে ইসতাফিলি নামক বেগবতী নদীর পাড়ে এ দূর্গটি অবস্থিত। এ দুর্গের। ধ্বংসাবশেষ ছাড়া আর কিছুই নেই। দূর্গের বাইরে একটি প্রকাণ্ড গ্রাম। আমরা যখন গেলাম তখন খালে জোয়ার এসেছে প্রায় দু’মাইল চওড়া ও খালটি হেঁটে পার হতে হবে। বলে আমরা ভাটার জন্য অপেক্ষা করে রইলাম। অতঃপর বালুকাময় পথে চার মাইল হেঁটে আমরা পেলাম দ্বিতীয় খাল। চার মাইল চওড়া এ খালটিও আমরা হেঁটে পার হলাম। তারপর প্রস্তর ও বালুকাময় পথে দু’মাইল হেঁটে তৃতীয় খালের কাছে এলাম। তখন খালে সবেমাত্র জোয়ার আসতে শুরু হয়েছে। কাজেই এক মাইল চওড়া এ খালটি হেঁটে পার হতে আমাদের বেশ খানিকটা বেগ পেতে হল। সুতরাং সমস্ত খালের প্রস্থ অর্থাৎ খাল ও শুকনা জায়গা সহ প্রায় বার মাইল। বর্ষার সময়ে এ স্থানের সবটাই ডুবে যায় বলে নৌকা ছাড়া পার হবার উপায় থাকে না। তৃতীয় খালটির পারে ফানিকা নামে ছোট একটি সুন্দর শহর আছে। এখানকার গীর্জাও ঘরবাড়ীগুলি বেশ সুন্দর। শহরের চারদিকে খাল ও ফলের বাগান আছে। এসব বাগানে সারা বছরই আঙুর, আপেল নাশপাতি, খুবানী প্রভৃতি ফল থাকে। এ শহরে আমাদের তিন রাত্রি কাটাতে হল। খাতুন ছিলেন তাঁর পিতার একটি ছোট দূর্গে।
‘অতঃপর কিফালী কারাস নামে খাতুনের এক ভাই সেখানে এলেন অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাঁচ হাজার ঘোড়সওয়ার নিয়ে। খাতুনের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য সাদা পোষাক পরিহিত তার ভাই ছাই রংয়ের একটি ঘোড়ায় আরোহন করলেন। তার মাথার উপরে মণিমুক্তা খচিত ছত্র। তার ডাইনে ছয় জন যুবরাজ বামেও সমসংখ্যক, সবারই পোষাক সাদা, মাথায় সোনালী জরির কাজ করা ছত্র। তার সামনে একশত জন পদাতিক সৈন্য ও একশত জন ঘোড়সওয়ার। তাদের গায়ে লম্বা কোট ও ঘোড়ার পীঠও বক্সে আচ্ছাদিত। তাদের প্রত্যেকের সামনেই জীন লাগানো এক সুসজ্জিত ঘোড়া। ঘোড়ার পিঠে একজন ঘোড়সওয়ারের উপযোগী মণিমুক্তা খচিত শিরস্ত্রাণ, কর্ম, ধনুক এবং একটি তরবারী, প্রত্যেকের হাতেই একটি-একটি বর্শা, বর্শার মাথায় ক্ষুদ্র নিশান। অধিকাংশ বর্শাই হর্ণ বা রৌপ্যের পাতে মোড়া। এগুলি সুলতানের পুত্রের আরোহণের ঘোড়া। তাঁর ঘোড়াসওয়ার সৈন্যরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত। এক একটি দলে দুশ ঘোড়সওয়ার। তাদের, উপরে আছে একজন করে অধিনায়ক। তার সামনে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত দশজন ঘোড়সওয়ার। তারাও একটি করে ঘোড় চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অধিনায়কের পিছনেও দশজন ঘোড়সওয়ার রঙীন পতাকা বহন করে চলেছে। আরও দশজনে কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে চলেছে দশটি জয়ঢাক। তাদের সঙ্গে রয়েছে রণভেরী, শিঙ্গা ও বাঁশী বাজাবার জন্য ছয় জন। খাতুন একটি ঘোড়ায় চড়ে বের হলেন রক্ষী, পরিচারিকা, ক্রীতদাস বালক এবং ভৃত্য সহ প্রায় পাঁচ শত লোকলস্কর নিয়ে। তাদের প্রত্যেকের পরিধানে সোনালী জরি ও জড়োয়ার কাজ করা মূল্যবান রেশমী পোষাক। তিনি নিজে পরেছেন। সোনালী বুটিদার মণিমুক্তাভূষিত রেশমী পোষাক, মাথায় মূল্যবান জড়োয়ার কাজ করা মুকুট। তার ঘোড়াটির আচ্ছাদনও তৈরী হয়েছে সোনালী কাজ করা রেশমী কাপড়ে। ঘোড়র পায়ে সোনার তৈরী ব্রেসলেট, গলায় পাথর বসানো হার। ঘোড়ার পায়ে সোনার তৈরী ব্রেসলেট, গলায় পাথর বসানো হয়। ঘোড়র জীনের ফ্রেমটি স্বর্ণমণ্ডিত ও মণিমাণিক্যখচিত। শহরের থেকে প্রায় এক মাইল দূরে একখন্ড সমতলভূমিতে ভাই। বোনে দেখা হল। তার ভাই বয়সে ছোট বলে প্রথমে ঘোড়া থেকে নেমে বোনের ঘোড়ার রেকাবে চুম্বন দিলেন, বোন চুম্বন দিলেন ভাইয়ের মাথায়। সেনানায়ক এবং যুবরাজরাও সবাই ঘোড়া থেকে নেমে খাতুনের ঘোড়ার রেকাবে চুম্বন দিলেন। তারপর ভাইকে নিয়ে তিনি রওয়ানা হলেন।
পরদিন আমরা সমুদ্রোপকূলে একটি বড় শহরে হাজির হলাম। নদীনালা ও বৃক্ষ শোভিত এ শহরটির নাম আমার স্মরণ নেই। শহরের উপকণ্ঠে আমাদের তাবু ফেলা হল। খাতুনের যে ভাইটি সিংহাসনের উত্তরাধিকারী তিনি দেখা করতে এলেন অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত দশ হাজার ঘোড়সওয়ার সিপাহীর এক মিছিল নিয়ে। তার মাথায় একটি মুকুট, ডান দিকে বিশ জন এবং বাঁ দিকে বিশ জন যুবরাজ (Prince)। তাঁর ঘোড়াগুলোকেও সাজানো হয়েছে তার ভাইয়ের ঘোড়ার মতই, কিন্তু জাকজমক এবার অনেক বেশী এবং ঘোড়ার সংখ্যাও বেশী। ভগ্নি আগের বারে যে পোষাক পরেছিলেন। এবারেও সে পোষাকেই এসেছেন। সামনাসামনি হলে দু’জনই এক সঙ্গে ঘোড় থেকে নামলেন। কাছেই একটি রেশমী তাবু খাটানো ছিল। দুজনেই তারা সে তাবুতে প্রবেশ করলেন। কাজেই কি ভাবে তারা পরস্পরকে অভ্যর্থনা করলেন তা জানা সম্ভব হল না। আমাদের তাবু ছিল কষ্টান্টিনোপলস থেকে দশ মাইল দূরে। পরের দিন মূল্যবান পোষাকে সজ্জিত নারী পুরুষ ও শিশু নির্বিশেষে শহরের অধিবাসীরা কেউ ঘোড়ায় চড়ে কেউ বা পায়ে হেঁটে সেখানে এসে হাজির হল। ভোরে ঢাক ঢোল ও ভেরী বাজানো। হ’ল। সম্রাট ও সম্রাজ্ঞী রাজপরিষদের কর্মচারীসহ খাতুনের সঙ্গে দেখা করতে এলেন। সম্রাটের মাথার ওপর একটি চন্দ্রাতপ ধরে আছে বেশ কিছু সংখ্যক ঘোড়সওয়ার ও পদাতিক মিলে। তাদের প্রত্যেকের হাতে কাঠের লম্বা লাঠি। লাঠির মাথায় একটি করে চামড়ার বলের মত বস্তু। তারই সাহায্যে তারা চন্দ্রাতপটি উঁচু করে রয়েছে। চন্দ্রাতপের। মধ্যস্থলে বেদীর মত একটি বস্তু রয়েছে। সেটির অবলম্বনও ঘোড়সওয়ারদের লাঠি। সম্রাট যখন সামনের দিকে অগ্রসর হলেন তখন সৈনিকদের ভেতর কেমন একটা। জড়াজড়ি রু হয়ে গেল। ফলে সেখানে ধূলি উড়তে লাগল। আমি তাদের মধ্যে প্রবেশ করতে না পেরে জীবনের ভয়ে খাতুনের মালপত্র ও লোকলস্করের সঙ্গে রয়ে গেলাম। শুনেছি, খাতুন তার পিতামাতার কাছে গিয়ে প্রথমে তাদের সম্মুখস্থ মাটী চুম্বন করেন ও পরে তাদের ঘোড়ার খুরে চুম্বন করেন। খাতুনের প্রধান প্রধান কর্মচারীরাও তাই করে।
