যে আমীরকে সুলতান আমার সাথী হিসাবে সঙ্গে দিয়েছিলেন তার সঙ্গেই বুলগার থেকে ফিরে এলাম এবং ২৮শে রমজান বিশদাগে এসে মহল্লা দেখতে পেলাম। ঈদ পর্ব উদ্যাপনের পর সুলতানের সঙ্গে মহল্প সহ আমরা হজতরখান (আম্রাখান) এসে পৌঁছলাম। চমৎকার শহর হজতরখান। পৃথিবীর অন্যতম বিখ্যাত নদী ইতিল (গা) এর পারে শহরটি অবস্থিত। শীতকালে নদীটি বরফে পরিণত হয়। তখন লোকেরা শ্লেজের সাহায্যে নদীর উপর দিয়া যাতায়াত করে। কোনো-কোনো সময় কাফেলা শীতের শেষে এ নদী পার হতে এসে ডুবে মরে। এ শহরে এসে খাতুন বায়ালুন তাঁর পিতার সঙ্গে দেখা করবার জন্য সুলতানের অনুমতি চাইলেন। তার ইচ্ছা ছিল পিতৃগৃহে সন্তান প্রসব করে তিনি পুনরায় সুলতানের কাছে ফিরে যাবেন। তিনি খাতুনকে অনুমতি দিলেন। তখন আমিও বিখ্যাত কনস্টান্টিনোপলস শহর দেখবার আশায় খাতুনের সঙ্গে যাবার অনুমতি চাইলাম। তিনি আমার নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে অনুমতি দিতে সম্মত হলেন না। আমি তখন বললাম, আমি আপনার পৃষ্ঠপোষকতা ও রক্ষণাধীনে গেলে আমার ভয়ের কিছুই নেই। তারপরে তিনি আমাকে অনুমতি দিলেন এবং আমরা পরস্পর বিদায় নিলাম। তিনি আমাকে দেড় হাজার দিনার, একটি পোষাক, বেশ কিছু ঘোড়া উপহার দিলেন। প্রত্যেক খাতুন দিলেন রৌপ্যের তাল। সুলতানের কন্যা দিলেন তাঁদের চেয়েও বেশী। সেই সঙ্গে দিলেন এক প্রস্থ পোষাক পরিচ্ছদ ও বহু বেজী জাতীয় জীবের চামড়ার মালিক হলাম।
খাতুন বায়ালুনের সঙ্গে ১০ই শওয়াল আমরা রওয়ানা হয়ে গেলাম। সুলতান, বেগম ও মসনদের উত্তরাধিকারী শাহ্জাদা এক মঞ্জিল অবধি খাতুন বায়ানের সঙ্গে গিয়ে ফিরে এলেন। অন্যান্য খাতুনরা গেলেন দ্বিতীয় মঞ্জিল অবধি। তারপর তারাও ফিরে এলেন। আমীর বায়দারা পাঁচ হাজার সৈন্য নিয়ে তার সহগামী হলেন। খাতুনের নিজেরও ছিল প্রায় পাঁচশ’ ঘোড়সওয়ার, তার মধ্যে দু’শ তার নিজস্ব ক্রীতদাস ও গ্রীক, বাকি সব তুর্কী এছাড়া তাঁর সঙ্গে পরিচারিকা ছিল দুশ। তাদের অধিকাংশই ছিল গ্রীক। দু’হাজার ভারবাহী ও আরোহণোপযোগী ঘোড়া ছিল তাঁর সঙ্গে। চারশ’ ছিল গাড়ী। এছাড়াও ছিল তিন শ’ বলদ ও দু’শ উট। এ সব ছাড়া ছিল দশজন গ্রীক যুবক ও সমসংখ্যক ভারতীয় যুবক। ভারতীয় যুবকদের যে প্রধান তাকে বলা হতো ভারতীয় ‘সানবুল। গ্রীক যুবকদের নেতার নাম ছিল মাইকেল। কিন্তু তুর্কীরা তার নাম রেখে ছিল লুলু (মুক্তা)। খাতুন তার অধিকাংশ পরিচারিকা ও মালপত্র সুলতানের শিবিরেই রেখে এসেছেন, কারণ তিনি মাত্র পিতার সঙ্গে দেখা করতে চলেছেন। আমরা উকাক২৭ রওয়ানা হলাম। উকাক মাঝারী আকারের একটি শহর হলেও এখানে সুন্দর-সুন্দর অট্টালিকা এবং প্রচুর প্রাকৃতিক উৎপন্নদ্ৰব্য আছে। শহরটি শীতপ্রধান। এ শহর থেকে, একদিন হেঁটে গেলে রুশদেশের পর্বত। রুশরা খৃষ্টান, তাদের মাথায় লাল চুল, চোখ নীলবর্ণ, মুখচ্ছবি কদাকার। লোকগুলি বিশ্বাসঘাতক। এদের দেশে রৌপ্য খনি আছে। সেখান থেকে রৌপ্যের তাল এনে তার সাহায্যে এখানে কেনা বেচা চলে। প্রতিটি রৌপ্য তালের ওজন পাঁচ আউন্স।
এখান থেকে দশ রাত্রি সফরের পরে আমরা কিপচাপ মরুভূমির সমুদ্রোপকুলস্থ সারদা শহরে এসে পৌঁছলাম। এখানে এমন একটি পোতায় আছে যা সবচেয়ে বড় ও সুন্দর পোতাশ্রয়গুলির অন্যতম। শহরের বাইরে অনেক ফলের বাগান, ঝরণা আছে। এ অঞ্চলে তুর্কী এবং তাদের অধীনে কিছুসংখ্যক গ্রীকের বাস। এসব গ্রীকের অধিকাংশই শিল্পজীবি। তাদের বাসগৃহগুলি কাঠের তৈরি। এক সময়ে এ শহরটি বেশ বড়ই ছিল। কিন্তু গ্রীক ও তুর্কীদের ভেতর ঝগড়ার ফলে শহরের অধিকাংশই আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। প্রথমে গ্রীকরাই জয়ী হয়ে প্রভাব বিস্তার করেছিল কিন্তু তুর্কীরা প্রতিবেশীদেশের সাহায্যে পেয়ে গ্রীকদের হত্যা করে ও দেশ থেকে বিতাড়িত করে। গ্রীকদের অনেকে তুর্কীদের প্রজা হিসেবে এখনও সেখানে বসবাস করছে। এ দেশের প্রত্যেক মঞ্জিলে এসেই খাতুন ঘোড়া, ভেড়া, গরুমহিষ, যব, কুমিজ, গরু ও মেষের দুধ উপহার পেয়েছেন। এখানে দ্বিপ্রহরের পূর্বে ও বিকেলে পথ চলা হয়। প্রত্যেক শাসনকর্তাই তার এলাকার সীমান্ত অবধি খাতুনকে এগিয়ে দিতে আসেন। তার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্যই এরূপ করা হয়, খাতুনের নিরাপত্তার জন্য নয়, কারণ এদেশগুলি সম্পূর্ণ নিরাপদ। অতঃপর আমরা যে শহরে পৌঁছলাম সে শহরটি ‘বাবা। সালতাফ’২৯-এর নামে পরিচিত। বাবা সালতাফ ছিলেন একজন ecstatic mystic, কিন্তু তাঁর সম্বন্ধে যে সব গল্প প্রচলিত ছিল তাতে মনে হয় তিনি শরিয়ত বিরোধী কাজ করতেন। তুর্কীদের রাজ্যের শেষ সীমায় অবস্থিত এ শহরটি। এখান থেকে গ্রীকদের রাজ্য পর্যন্ত জনহীন মরুভূমির ভেতর দিয়ে আঠার দিনের পথ। এ পথের আট দিন পর্যন্ত পানি দুষ্প্রাপ্য। কাজেই ছোট মশকে গাড়ী বোঝাই করে পানি নিয়ে এ পথে যাত্রা করতে হয়। আমরা যাত্রা করেছিলাম শীতকালে। কাজেই আমরা পানির অভাব বোধ করিনি। খোদাকে অশেষ ধন্যবাদ যে আমাদের যাত্রাপথ নিরাপদই ছিল।
এ যাত্রাপথের শেষে আমরা গিয়ে পৌঁছলাম গ্রীক রাজ্যের৩০ সীমান্তে মাহটুলী দূর্গে। খাতুনের আগমনের সংবাদ গ্রীকরা পূর্বেই অবগত ছিল। কাজেই গ্রীকদের প্রধান ব্যক্তি নিকোলাস একদল সৈন্য ও অনেক উপহার দ্রব্যসহ রাজকুমারীদের এবং শুশ্রূষাকারিণীদের সঙ্গে নিয়ে এখানে দেখা করতে আসেন কনস্টান্টিনোপল থেকে। মহাটুলী থেকে কনস্টান্টিনোপল বাইশ দিনের পথ। মাহটুলী থেকে খাল অবধি যেতে লাগে মোল দিন, পরে সেখান থেকে কনস্টান্টিনোপল ছয় দিন। এ দূর্গ থেকে যাত্রা করতে ঘোড়া বা খচ্চরের সাহায্য নিতে হয়। পথ বন্ধুর ও পর্বতসঙ্কুল বলে গাড়ী। এখানেই রেখে যেতে হয়। গ্রীক-প্রধান অনেক খচ্চর সঙ্গে এনেছিলেন। তার ভেতর থেকে ছয়টি খচ্চর খাতুন আমার জন্য পাঠান। আমার গাড়ী ও মালপত্রের। রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে সব সঙ্গী ও ক্রীতদাসদের রেখে এসেছিলাম খাতুন তাদের দেখাশুনার ভার দেন দূর্গরক্ষকের উপর। তিনি তাদের বাসোপযোগী একটি ঘরের। ব্যবস্থা করে দেন। কমাণ্ডার বায়দারা তার সৈন্যদল নিয়ে এখান থেকেই ফিরে যান এবং আজান দেওয়ার রীতিও রহিত হয়। তার উপহার সামগ্রীর সঙ্গে কিছু মদ্যও ছিল। তিনি তা পান করেন। শুকরের মাংস ছিল। তার জনৈক কর্মচারীর কাছে শুনেছি খাতুন তা। আহার করেন। একজন তুর্কী ছাড়া নামাজী কেউ তার সঙ্গে রইল না। এ তুকীটি আমাদের সঙ্গে এসে নামাজ আদায় করত। আমাদের সম্বন্ধে যে মনোভাব এতদিন লুক্কায়িত ছিল, আমরা বিধর্মীদের দেশে প্রবেশ করবার সঙ্গে-সঙ্গে তা আবার সজাগ হয়ে উঠল। কিন্তু খাতুন গ্রীক-প্রধানকে আমাদের সঙ্গে সম্মানজনক ব্যবহার করতে বলে দিলেন। তার ফলে একজন পাহারাদারকে তিনি প্রহার করেন। কারণ, এ পাহারাদার আমাদের নামাজের প্রতি উপহাস করেছিল।
