বিখ্যাত সুলতান মুহাম্মদ উজবেক খ একটি বিশাল রাজ্যের শাসনকর্তা। তিনি আল্লাহর শত্ৰু কনস্টান্টিনোপলের অধিবাসীদের সঙ্গে যুদ্ধে বিশেষ দক্ষতা দেখিয়েছেন। আমাদের আমির-উ-মমামেনি (খোদা তার শক্তি বৃদ্ধি করুক এবং তাকে জয়যুক্ত করুক) মিশর ও সিরিয়ার সুলতান (মরক্কার সুলতান) ইরাকের সুলতান, তুর্কীস্তানের সুলতান, অসের পরে যে দেশ আছে সেখানকার সুলতান, ভারতের সুলতান ও চীনের সুলতান প্রভৃতি পৃথিবীর সাতটি রাজ্যের একটির মতই বৃহৎ সুলতান উজবেকের রাজ্য। আমার আগমনের পরের দিন বিকেলে এক আনুষ্ঠানিক দরবারে তার সঙ্গে আমি দেখা করলাম। সেখানে একটি বিরাট ভোজের আয়োজন হয়েছিল। আমরা সুলতানের উপস্থিতিতে এফতার করলাম। এখানকার তুর্কীরা মুসাফেরদের আহার ও বাসস্থান দেবার অথবা অর্থ সাহায্যে করবার রীতি পালন করে না কিন্তু তারা জবাই করার জন্য। তাদের ভেড়া ও ঘোড়া দেয় এবং কুমিজ খেতে দেয়। এসব তাদের দান বলে গণ্য। প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের পরে সুলতান সোনালী মণ্ডপ নামে অতি সুসজ্জিত একটি মণ্ডপে দরবারে বসেন। মণ্ডপের মধ্যস্থলে কাষ্ঠনির্মিত একটি সিংহাসন। সিংহাসনটি রূপালী পাতে মোড়া এবং পায়াগুলি রূপায় নির্মিত ও উপরিভাগ মণিমুক্তা খচিত। সুলতান মসনদে বসলে ডান পাশে বসেন খাতুন তায়তুঘলিন, তার ডানদিকে বসেন খাতুন কেবেক, সুলতানের বামে বসেন খাতুন বায়ালুন আর তার বামে খাতুন উদুর্জা। মনদের নিম্নে দাঁড়ান সুলতানের দুই পুত্র–বড়টি ডানে ছোটটি বামে। কন্যা বসেন। সুলতানের সামনে। প্রত্যেক খাতুন এলেই সুলতান উঠে হাত ধরে তাকে মসনদে উঠতে সাহায্যে করেন। দরবারের সামনেই এসব ঘটে, কোন পর্দার দরকার হয় না।
সুলতানদের সঙ্গে দেখা করার পরের দিনই আমি প্রধান খাতুন তায়তুঘলির সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। তিনিই বেগম এবং দুই সুলতান জাদার মাতা। তিনি দশজন বর্ষীয়সী মহিলার সঙ্গে বসেছিলেন। তারা সম্ভবতঃ বেগমের পরিচারিকা হবে। বেগমের সামনে বসেছিল প্রায় পঞ্চাশজন সখী। তাদের সামনের থালায় চেরীফল নিয়ে তারা পরিষ্কার করছিল। বেগম নিজেও একটি সোনালী ট্রেতে চেরীফল নিয়ে পরিষ্কার করছিলেন। তিনি কুমিজ আনতে হুকুম করলেন এবং নিজহাতে একটি পেয়লা ভর্তি করে আমার হাতে দিলেন। তাদের বিবেচনায় এভাবে নিজহাতে কুমিজ পরিবেশন খুব সম্মানজনক। আমি আগে কখনও কুমিজ পান করি নাই। তবু পেয়ালাটি হাতে না নেবার কোনো কারণ খুঁজে পেলাম না। কুমিজ খেয়ে দেখলাম এবং আদৌ সুস্বাদু মনে হল না বলে আমার এক সঙ্গীকে খেতে দিলাম। পরের দিন গেলাম দ্বিতীয় খাতুন কেবেকের সঙ্গে দেখা করতে। তিনি তখন কোরআন শরীফ পাঠ করছিলেন। তিনিও আমাকে কুমিজ পান করতে দিলেন। তৃতীয় ধাতুন বায়ালুন কনস্টান্টিনোপলের ম্রাটের কন্যা।২৪ তাকে দেখলাম মণিমুক্তাখচিত একটি মসনদে তিনি বসে আছেন। তার সামনে গ্রীক, তুর্কী ও লুবিয়ান জাতীয় প্রায় শতেক সখী বসে বা দাঁড়িয়ে আছে। তার পিছনে রয়েছে খোঁজারা এবং পার্শ্বে গ্রীক পরিচারক। তিনি আমাদের সফরের কথা, গৃহের কথা জিজ্ঞাসাবাদ করলেন এবং রুমালের সাহায্যে নিজের সজল চক্ষু মুছলেন। পরে তার হুকুমে খাবার এলে আমরা তাঁর সামনে বসেই খেলাম। আমরা বিদায় হতে চাইলে তিনি বললেন, আমাদের সম্পর্ক যেন এখানেই শেষ না হয়। সর্বদা আসবেন এবং কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে আমাকে জানাবেন। তিনি আমাদের প্রতি বিশেষ অনুকম্পা প্রদর্শন করেন। আমরা চলে আসবার পরে তিনি আমাদের খাদ্য, প্রচুর রুটী, মাখন, ভেড়া, অর্থ ও দামী পোষাক এবং তেরোটি ঘোড়া দান করেছিলেন। তার তিনটি ঘোড়া বেশ ভাল ছিল এবং দশটি ছিল সাধারণ ঘোড়া। এই খাতুনের সঙ্গে আমি কনস্টান্টিনোপল অবধি যাই। সে বর্ণনা পরে দেওয়া হবে। চতুর্থ খাতুন রাণীদের মধ্যে সর্বোত্তম। তিনি যেমন অমায়িক তেমনি সহানুভূতিশীলা। আমরা দেখা করলে তিনি আমাদের প্রতি যে দয়া প্রদর্শন করেন তার তুলনা হয় না। সুলতানের কন্যাও আমাদের প্রতি যে দয়াদাক্ষিণ্য প্রদর্শন করেন তেমন আর কোনো খাতুনই করতে পারেন নাই। তিনি বহুভাবে আমাদের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করেছেন। খোদা যেনো তাকে পুরস্কৃত করেন।
আমি বুলগার ২৫ শহরের কথা শুনেছিলাম। সেখানে সবচেয়ে স্বল্পস্থায়ী রাত এবং পাল্টা মৌসুমে সবচেয়ে স্বল্পস্থায়ী দিন হয়। আমার ইচ্ছে হয়েছিল স্বচক্ষে তা দেখতে হবে। সুলতানের শিবির থেকে দশ রাতের পথ বুলগার শহর। আমি সুলতানকে অনুরোধ করেছিলাম আমার সঙ্গে একজন চালক দিতে এবং তিনি সে অনুরোধ রক্ষা করেছিলেন। রমজান মাসে আমরা সেখানে গিয়ে পৌঁছলাম। সন্ধ্যায় এফতারের পরে মগরেবের নামাজ পড়ে ভোর হবার আগে শুধু রাত্রের নামাজ পড়বার মতো সময় হাতে। পেলাম। সেখানে তিন দিন কাটালাম।
বুলগার থেকে চল্লিশ দিন লাগে অন্ধকারের দেশে যেতে। সেখানেও যাবার ইচ্ছা আমার ছিল কিন্তু পথকষ্টের কথা ভেবে এবং বিশেষ লাভবান হতে পারব না মনে করে সে ইচ্ছা ত্যাগ করলাম। সেখানে যাবার একমাত্র বাহন কুকুরে-টানা শ্লেজ। সেখানকার মরুভূমি বরফে আজ্ঞ বলে মানুষ বা পশু পা পিছলে পড়ে যাওয়া ছাড়া হেঁটে যেতে পারে না। কিন্তু কুকুর তার পায়ের নখ দিয়ে বরফ আটকে ধরতে পারে। ধনী সওদাগরেরা নিজেদের শত শত শ্রেজে খাদ্য, পানী, জ্বালানী বোঝাই করে এসব রাস্তায় চলতে পারেন কারণ মরুভূমির এ রাস্তায় গাছপালা বা মানুষের বস্তি নাই। এ-সব পথের একমাত্র চালক এমন সব কুকুর যারা একাধিক বার এ পথে যাতায়াত করেছে। এমন একটি কুকুরের মূল্যও প্রায় হাজার দিনার অবধি ওঠে। এমনি একটি কুকুরের ঘাড়ে জে বেঁধে দিয়ে সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় আরও তিনটি কুকুর। এই কুকুরটি চালক এবং অন্যান্য কুকুর স্লেজ নিয়ে তাকেই অনুসরণ করে। যখন চালক কোথাও থামে তখন এরাও থামে। চালক কুকুরের মালিক কথননা তার কুকুরকে মারে না বা গালাগালি দেয় না। খাবার তৈরি হলে মানুষের আগে খেতে দেওয়া হয় কুকুরকে। নতুবা কুকুর রাগান্বিত হয়ে সবাইকে ধ্বংসের মুখে ফেলে পালিয়ে যায়। সফরকারীরা চল্লিশ মঞ্জিল পার হয়ে এসে অন্ধকার দেশে পৌঁছে। তখন যে যা পণ্যদ্রব্য এনেছে সবই সেখানে রেখে ফিরে আসে নিজের নিজের তাবুতে। পরের দিন গিয়ে দেখতে পায় সে সব জিনিষের পাশে-পাশে রাখা আছে মেরুদেশের বেজী জাতীয় জীবের চামড়া। সওদাগর যদি তার পণ্যের বিনিময়ে সে সব পেয়ে সন্তুষ্ট হয় তবে তা’গ্রহণ করে নতুবা সেখানেই রেখে পুনরায় চলে আসে। তখন স্থানীয় লোকেরা আরও কিছু বেশী চামড়া রেখে যায় অথবা বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই সওদাগরের পণ্য ফেলে নিজেদের দেওয়া চামড়া ফেরত নিয়ে যায়। এ নিয়মেই সেখানে তেজারতী চলে। সেখানে যারা সওদাগরী করতে যায় তারা জিনের সঙ্গে না মানুষের সঙ্গে কারবার করছে তার কিছুই জানতে পারে না, কারণ তারা কেউ কাউকে দেখে না।
