এদেশে ঘোড়র সংখ্যা অত্যন্ত বেশী এবং মূল্য খুবই কম। একটি ভাল ঘোড়ার মূল্য আমাদের চলতি এক দিনারের বেশী নয়। এখানকার লোকের জীবিকা ঘোড়ার উপর নির্ভর করে। আমাদের দেশে যেমন ঘোড়ার সংখ্যা বেশী, তাদের দেশে তেমনি ঘোড়ার সংখ্যা অথবা ভেড়ার সংখ্যার চেয়েও তাদের ঘোড়ার সংখ্যা বেশী। একজন মাত্র তুকা হাজার হাজার ঘোড়ার মালিক। এক সঙ্গে ছয় হাজার বা সে রকম সংখ্যক। ঘোড় ভারতে চালান হয়ে যায়। তার মধ্যে প্রত্যেক সওদাগরই হয়তো ১শত বা ২শত করে ঘোড়া একবারে পাঠায়। প্রত্যেক পঞ্চাশটি ঘোড়ার জন্য তারা একজন করে রক্ষক বা সহিস ভাড়া করে। তারাই ঘোড়াগুলিকে খাওয়াবার ব্যবস্থা করে। লম্বা একটি লাঠির মাথায় দড়ি বাঁধা থাকে। সহিস সেই লাঠি হাতে একটি ঘোড়ায় চড়ে এবং যখনই আরেকটি ঘোড়াকে ধরতে চায় তখন নিজের ঘোড়া নিয়ে এগিয়ে যায় দ্বিতীয় ঘোড়াটির কাছে। এগিয়ে গিয়ে লাঠির সাহায্যে দড়িটি ঘোড়ার ঘাড়ের উপর ছুঁড়ে দিয়ে তাকে টেনে আনে। তারপর তার পিঠে চড়ে প্রথমটি চারণভূমিতে ছেড়ে দেয়। সিন্ধুদেশে পৌঁছবার পরে ঘোড়াগুলিকে ঘাস খাওয়ানো হয়। সিন্ধুদেশের ঘাসপাতা বালির সমকক্ষ নয় বলে অধিকাংশ ঘোড়া মরে যায় অথবা চুরি হয়ে যায়। সিন্ধু পৌঁছে ঘোড়ার মালিককে সাত রৌপ্য দিনার শুল্ক দিতে হয় এবং মুলতান গিয়ে আরও একবার শুল্ক আদায় দিতে হয়। পূর্বে মালিককে তার আমদানীকৃত ঘোড়ার দামের এক চতুর্থাংশ শুল্ক বাবদ দিতে হয়েছে কিন্তু সুলতান মোহাম্মদ তা রদ করে দেন এবং আয়ের দশমাংশ শুল্ক ধার্য করেন। তা সত্বেও ঘোড়র মালীক যথেষ্ট লাভ করে। প্রতি ঘোড়া কমপক্ষে একশত দিনার (মরক্কো মুদ্রায় পঁচিশ দিনার) বিক্রি হয়। অনেক সময় তার দ্বিগুণ বা তিনগুণ মুল্যেও ঘোড় বিক্রি হয়। একটি ভাল ঘোড় পাঁচশ দিনার বা তার চেয়েও বেশী মূল্যে বিক্রি হয়। ভারতীয়েরা ঘোড়দৌড়ের জন্য এসব ঘোড়া কিনে না। তারা যুদ্ধে ঘোড়া ব্যবহার করে এবং যুদ্ধের সময় নিজেরা বর্ম পরে এবং ঘোড়াকেও বর্ম পরিয়ে দেয়। ইয়মেন, ওমান ও ফারস থেকে তারা ঘোড়দৌড়ের ঘোড়া খরিদ করে। সেখানকার ঘোড়ার দাম এক হাজার থেকে চার হাজার দিনার অবধি।
আমীর তালাকতুমুরের সঙ্গে আমি আজাক থেকে মাজার অবধি যাই। তুরুস্কে যে সব সুন্দর শহর আছে তার মধ্যে এটি একটি। এ শহরটি একটি সুন্দর নদীর পারে অবস্থিত।২২ শহরের বাজারে একজন য়িহুদী আমাকে আরবীয় ভাষায় শুভেচ্ছা জানালো। সে থেকে এখানে এসেছে। য়িহুদীটি বলল, সে স্থলপথে কনস্টান্টিনোপল, আনাতোলিয়া এবং সিরকাসিয়ানদের দেশ(Transcaucasla) হয়ে এখানে এসেছে। তাতে চার মাস সময় লেগেছে। সফররত সওদাগরেরাও এপথ চিনে। তারাও তার কথা। সবাই সমর্থন করল।
এদেশে এসে একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় লক্ষ্য করলাম, নারীর প্রতি তুর্কী জাতির সম্মান। এখানে পুরুষদের চেয়ে সমাজে নারীর মর্যাদা বেশী। কিরাম থেকে রওয়ানা হয়ে আসবার পরে আমীরের বেগমকে আমার দেখবার সুযোগ হয়। তিনিই প্রথম শাহজাদী, যাকে আমি এখানে দেখলাম। তাঁর সম্পূর্ণ গাড়ীটি ছিল নীল রঙের দামী পশমী কাপড়ে ঢাকা। তাবুর দরজা জানালা খোলা। শাহজাদীর সঙ্গে রয়েছে পরমা সুন্দরী ও মূল্যবান বস্ত্রালঙ্কারে সজ্জিতা চারজন পরিচারিকা। তার পিছনে আরও কতকগুলি গাড়ী। তাতেও রয়েছে তার মহলের পরিচারিকারা। আমীরের তাবুর কাছে এসে তিনি যখন গাড়ী থেকে নামলেন তখন ত্রিশ জন পরিচারিকা এলো তার বাঞ্চল বহন করতে। আমি সওদাগর এবং সাধারণ পরিবারের মহিলাদেরও দেখেছি। তাঁরা। প্রত্যেকে একটি গাড়ীতে যাতায়াত করে। সে গাড়ী ঘোড়ায় টানে। তার বাঞ্চল বহন করবার জন্য তিন চারজন পরিচারিকা থাকে। মহিলারা মুক্তার কাজ করা সরু মাথাওয়ালা টুপি ব্যবহার করে। টুপির চূড়ায় ময়ুরের পালক লাগানো থাকে। তাবুর জানালা খোলা রাখা হয় বলে জানালা দিয়ে তাদের মুখ দেখা যায়। কারণ তুর্কী রমণীরা মুখে নেকাব ব্যবহার করে না।
অনেক সময় স্বামীর সঙ্গেও তারা বাইরে বের হন। তখন অনেকে তাদের পরিচারক মনে করে, কারণ মেষের লোমে তৈরী পোশাক আর উঁচু টুপি ছাড়া আর কিছুই তারা পরিধান করে না।
অতঃপর আমরা সুলতানের শিবিরে যাত্রার আয়োজন করলাম। সুলতানের শিবির। ছিল তখন বিশদাগ নামক স্থানে। বিশদাগ অর্থ পাঁচ পাহাড়’২৩। মাজার থেকে বিশদাগ চারদিনের পথ। এ পাহাড়গুলির মধ্যে একটি উষ্ণপ্রস্রবন আছে। তুর্কীরা এখানে এসে গোসল করে এবং তাতে রোগ প্রতিরোধ হয় বলে এরা দাবী করে। রমজান মাসে পয়লা তারিখে আমরা শিবিরে এসে পৌঁছলাম। এসে শুনলাম, আমরা যেখান থেকে এইমাত্র এসেছি তারই ধারে কাছে কোথাও শিবির উঠে যাচ্ছে। কাজেই আমাদের আবার ফিরে আসতে হল। সেখানে একটি পাহাড়ের উপরে আমার তাবু খাটালাম। তাবুর সামনে একটি নিশান পুতে ঘোড়া ও গাড়ীগুলিকে তাবুর পেছনে রাখলাম। তখন মহল্পা অগ্রসর হয়ে এল। মহল্লার নাম রেখেছে তারা ‘অরদু’। আমরা দেখলাম একটা। প্রকাণ্ড শহর যেনো এগিয়ে আসছে তার বাসিন্দা, মসজিদ, বাজার প্রভৃতি সব কিছু নিয়ে। চলমান রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া উঠছে কারণ সফরের সময়েও তারা পথে রান্না করে আহার করে। ঘোড়ায় টানা গাড়ীতে এসব আছে। তাবুর জায়গায় পৌঁছে তারা গাড়ী থেকে নামিয়ে তাবুগুলি সেখানে খাটাল। সে সব তাবু ওজনে খুব হালকা। মসজিদ এবং দোকানপাটও এনে সেখানে স্থাপন করা হল। সুলতানের খাতুনরাও নিজ নিজ দলবল সহ আমাদের পাশ দিয়ে গেলেন। চতুর্থ খাতুন যেতে-যেতে নিশানওয়ালা আমাদের। তবুটি পাহাড়ের উপর দেখতে পেলেন। আমরা যে সদ্য এখানে এসেছি নিশানটি তারই চিহ্ন। তাবুটি দেখতে পেয়ে তিনি আমাদের অর্ভ্যথনা করতে পাঠালেন তার সখীদের এবং বালক ভৃত্যদের। আমার একজন সঙ্গীও তালাকতুমুরের একজন পরিষদের সাহায্যে আমি তাকে কিছু উপহার পাঠালাম। তিনি তা সাদরে গ্রহণ করলেন এবং আমাদের তার হেফাজতে রাখবার হুকুম দিয়ে চলে গেলেন। পরে সুলতান এলেন এবং নিজের ‘মহল্লা’ নিয়ে পৃথকভাবে শবির স্থাপন করলেন।
