কাফায় এসে আমরা মসজিদে বাস করি। এখানে এসে পৌঁছার এক ঘন্টা পরেই। শুনতে পেলাম চারদিকে ঘন্টা বাজছে। এর আগে কোথাও এ রকম ঘন্টা বাজতে শুনি নাই১৯ বলে ভয় পেয়ে আমি সঙ্গীদের মিনারে উঠে কোরআন পাঠ করতে ও আজান দিতে বললাম। তারা তাই করতেই হঠাৎ অস্ত্র ও বর্মধারী লোক এসে আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন। তিনি সেখানকার মুসলমানদের কাজী বলে নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, আপনাদের কোরআন পড়া আর আজান শুনে ভয় হলো আপনাদের কোনো বিপদ ঘটেছে কি না, তাই ছুটে এলাম। তারপর তিনি বলে গেলেন এবং আমাদেরও কোনো বিপদ ঘটল না। পরেরদিন শাসনকর্তা এসে আমাদের এক ভোজে আপ্যায়িত করলেন। পরে আমরা ঘুরে দেখলাম শহরে অনেক বাজার রয়েছে। সমস্ত বাসিন্দাই বিধর্মী। বন্দরে গিয়ে দেখলাম, যুদ্ধ জাহাজ, সওদাগরী জাহাজ মিলিয়ে ছোট-বড় প্রায় দু’শ জাহাজ রয়েছে পোতাশ্রয়ে। এ পোতাশ্রয়টি পৃথিবীর অন্যতম বিখ্যাত পোতাশ্রয়।
একটি চার চাকার গাড়ী ভাড়া করে আমরা কিরাম শহরে এলাম। কিরাম সুলতান উজবেগ খানের রাজ্যের অন্তর্গত। এখানকার শাসনকর্তার নাম তালাকতুমুর। আমাদের কথা শুনে তিনি একটি ঘোড়াসহ ইমামকে আমাদের কাছে পাঠান, কারণ তিনি নিজে তখন অসুস্থ ছিলেন। পরে আমরা তার সঙ্গে দেখা করলে তিনি আমাদের যথেষ্ট সম্মান করেন ও উপহার দেন। শাসনকর্তা খানের রাজধানী সারা যাত্রার আয়োজন করছিলেন। কাজেই আমরাও তার সঙ্গে যাবার জন্য গাড়ি ভাড়া করে নিলাম। এসব গাড়ির চারটি বড় চাকা থাকে এবং ভারের তারতম্য হিসেবে দুটি বা তার বেশী সংখ্যক ঘোড়া, বলদ বা উটে টানে। ঘোড়াগুলির একটিতে চড়ে চালক হাতে চাবুক বা কাঠের লাঠি নিয়ে বসে। কাঠের বাতার সঙ্গে বনাত বা কম্বলের কাপড় চামড়ার ফালি দিয়ে বেঁধে তৈরী এক ধরনের হাল্কা তাবু গাড়ীর উপর দেওয়া হয়। তবু ঝা দেওয়া জানালার সাহায্যে বাইরের সবকিছুই দেখা যায় কিন্তু বাইরে থেকে ভিতরের কিছু দেখা যায় না। চলন্ত গাড়ীর এসব তাবুর ভিতরে বসে খাওয়া, ঘুমানো, লেখাপড়া প্রভৃতি সবই করা চলে। যে গাড়ীতে মালপত্র এবং রসদ রাখা হয় সে গাড়ীতে এক রকম একটি তাবু থাকে এবং তা তালা দিয়ে রাখা হয়।
আমীর তালাকতুমুর তার ভাই ও দুটি ছেলে সহ আমরা একত্র যাত্রা করলাম। যেসব জায়গায় আমরা বিশ্রামের জন্য থেমেছি তার সব জায়গায়ই তুকরা তাদের ঘোড়াগুলিকে রাত্রে বা দিনে যথেচ্ছভাবে চড়ে বেড়াবার জন্য ছেড়ে দেয়, সঙ্গে কোন সহিস বা রক্ষক থাকে না। চুরির ব্যাপারে তাদের আইনের কড়াকড়ির জন্যই এ রকম করা সম্ভব হয়েছে। কোনো চুরি যাওয়া ঘোড়াসহ কাউকে পেলে তাকে সেটি ফেরৎ দিতে বাধ্য করা হয় আরও নয়টি ঘোড়া সঙ্গে দিয়ে। যদি সে তা দিতে অক্ষম হয় তবে ঘোড়ার পরিবর্তে তার ছেলেদের নেওয়া হয়। যদি তার ছেলেও না থাকে তবে তাকেই। জবাই করা হয় ভেড়ার মত। তারা রুটী বা অপর কোনো শক্ত খাদ্য গ্রহণ করে না। মিলেট বা জোয়ারের সঙ্গে কুচি কুচি করে কাটা মাংসের সুরুয়া রান্না করে তারা তাই খায়। থালায় করে দইয়ের সঙ্গে সুরুয়া পরিবেশন করলে তারা তাই পান করে এবং পরে গাধার দুধে তৈরী কুমিজ নামক দই খায়। জোয়ার দিয়ে তারা একপ্রকার চোলাই। করা পানীয় তৈরী করে। এ পানীয় তাদের কাছে বুজা (Beer) নামে পরিচিত। তাদের। মতে বুজা অবৈধ পানীয় নয়। বুজা দেখতে শাদা। আমি একবার খেয়ে দেখেছিলাম জিনিসটা তেতো। কাজেই, আর কোনোদিন খাইনি। মিষ্টি খাওয়াকে এরা অপমানজনক মনে করে। একবার রমজানের সময় আমার এক সঙ্গীর হাতে তৈরী কিছু মিষ্টি সুলতান উজবেগকে দিয়েছিলাম। তিনি কোন রকমে আঙুল দিয়ে সেগুলি ধরেই মুখে পুরে দিলেন।
কিরাম থেকে যাত্রা করে আঠারটি স্টেশন পার হয়ে আমরা একটি জলাশয়ের কাছে পৌঁছলাম। সেটি হেঁটে২০ পার হতে একদিন লেগে গেলো। অনেক গরু, ঘোড়া ও গাড়ী পার হয়ে যাবার পরে জায়গাটি অত্যন্ত কর্দমাক্ত হয় এবং পার হওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে উঠে। সুতরাং আমীর আমার একটু আরাম হবে ভেবে তার একজন পরিষদ সঙ্গে দিয়ে আমাকে আগেই পাঠিয়ে দিলেন। আমার সঙ্গে ভাল ব্যবহার করবার আদেশ দিয়ে আজাকের শাসনকর্তাকে একটা চিঠিও লিখে দিলেন তিনি। তারপরে আমরা দ্বিতীয় এক জলাশয়ে এলাম। সেটি পার হতেও আধা দিন লেগে গেলে সেখান থেকে যাত্রা করার তৃতীয় দিন আমরা সমুদ্রের পারে আজাক (Azov) শহরে এসে পৌঁছলাম। এ সুগঠিত শহরটিতে Genoese এবং অন্যান্য সওদাগরেরা বরাবর যাতায়াত করে। আমীর তালাকতুমুরের পত্র পেয়েই শাসনকর্তার শহরের কাজী ও কয়েকজন ছাত্র সঙ্গে নিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন এবং খাদ্যও পাঠালেন। তাঁকে অভ্যর্থনা জানিয়ে আমরা আহারের পর শহরে গেলাম। কারণ, শহরের বাইরে আমরা তাবু ফেলেছিলাম। দুদিন পরে আমীর তালাকতুমুর এলে বিশেষ জাঁকজমকের সঙ্গে তাকে অভ্যর্থনা করা হলো। রঙীন রেশমী কাপড়ে তৈরী বিশেষ একটি তাবুতে তার জন্য ভোজের আয়োজন হল। তিনি ঘোড়া থেকে নামলে রেশমী কাপড়ের টুকরা বিছিয়ে দেওয়া হল তার উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার জন্য। তিনি দয়া পরবশ হয়ে আমাকে আগে আগে যেতে দিলেন, যাতে শাসনকর্তা বুঝতে পারেন যে তিনি আমাকে কতটা সম্মানের চোখে দেখেন। আমাকে নিয়ে প্রকাণ্ড একটি চেয়ারে বসিয়ে নিজে বসলেন পাশে একটি আসনে। তার ছেলেরা, ভাই ও ভাইপোরা দাঁড়িয়ে রইলেন বিনীতভাবে। প্রকাণ্ড এ চেয়ারখানা তার। নিজের জন্যই রক্ষিত ছিল। ভোজ শেষ হলে আমীরকে, তার পরিবারের প্রত্যেককে এবং আমাকে একটি করে জামা উপহার দেওয়া হল। তারপরে আমীরও তার ভাইকে দশটি করে ঘোড়া, দু’ ছেলেকে ছয়টি ঘোড়া এবং আমাকে একটি ঘোড়া উপহার দিলেন।
