পরেরদিন ভোরে যাত্রা করে আমরা মুতুরলি (Mudurlu) পৌঁছলাম। সেখানে আরবী জানে এমন একজন হজযাত্রীর দেখা পেলাম। তাকে আমরা অনুরোধ করলাম আমাদের সঙ্গী হয়ে কাস্তামুনিয়া অবধি যেতে। সেখান থেকে কাস্তামুনিয়া দশ দিনের পথ। আমার একটি মিশরীয় জামা, সাময়িক খরচের জন্য কিছু অর্থ, একটি ঘোড়া তাকে দিলাম এবং বিশেষ পারিতোষিকের প্রতিশ্রুতি দিলাম। জামা ও অর্থ সে। পরিবারের লোকদের দিয়ে গেলো। দেখা গেল, সে একজন ধনবান ব্যক্তি কিন্তু চরিত্র তার নীচ প্রকৃতির। আমরা আমাদের খরচ পত্রের জন্য তার হাতে টাকা পয়সা দিতাম। আমাদের উচ্ছিষ্ট রুটি সে নিয়ে যেত এবং তাই দিয়ে আমাদের জন্য মসলা শাকও লবণ কিনে আনতো অথচ সে দরুণ আমাদের পয়সা কেটে নিত। আমি এ কথা ও শুনেছি যে আমরা আমাদের খরচের জন্য তাকে যা দিতাম তারও কিছুটা অংশ সে চুরি করত। আমরা তুর্কী ভাষা জানতাম না বলেই তাকে আমাদের সঙ্গে রাখতে হয়েছিল। তারপর ব্যাপার এতদূর গড়াল যে, সন্ধ্যায় আমরা তাকে বলতাম “কেমন হাজী, আজকে কত চুরি করলে?”
সে তার জবাবে কত নিয়েছে তা প্রকাশ করত, আমরা হাসতাম ও তাই নিয়ে আমোদ করতাম।
সেখান থেকে আমরা বুলি শহরে এসে এক যুব ভ্রাতৃত্বের মুসাফেরখানায় আশ্রয় নিলাম। কী যে চমৎকার লোক এখানে মুসাফেরখানায় তা তারা যেমন উচ্চমনা আর নিঃস্বার্থ, তেমনি মুসাফেরদের প্রতি সদয়, স্নেহশীল। কী আন্তরিকতাপূর্ণ তাদের অভ্যর্থনা! কোন মুসাফের এলে তাদের ব্যবহারে তাকে ভাবতে হবে যে সে তাদেরই একজন অতি প্রিয় আপনজন।
পরেরদিন ভোরে রওয়ানা হয়ে আমরা গারাদি বুলি শহরে পৌঁছলাম। সমতল ভূমিতে অবস্থিত এ শহরটি সুন্দর ও বড় কিন্তু মনে হয় এটি পৃথিবীর অন্যতম শীতপ্রধান শহর। গারাদি বুলি শহর কয়েকটি মহল্লায় বিভক্ত এবং এক-এক মহল্লায় এক-এক সম্প্রদায়ের লোক বাস করে। এক মহল্লার লোক অপর মহল্লার লোকদের সঙ্গে কখনও মেলামেশা করে না। এখানকার সুলতান দেশের একজন খ্যাতি সম্পন্ন শাসক। তিনি সুদর্শন ও সৎ, কিন্তু অনুদার। তিনি মুসাফেরখানায় এসে আমাদের সঙ্গে দেখা করেন এবং এক ঘন্টাকাল আমাদের সঙ্গে আলাপ করেন। পরে আমাকে জিন্ লাগানো একটি ঘোড়া ও একটি পোক উপহার দেন।
আমরা বারলু ১৫ নামক একটি ছোট শহর ছাড়িয়ে কাস্তামুনিয়া এসে পৌঁছলাম। কাস্তামুনিয়া একটি সুন্দর বড় শহর। এখানে জিনিসপত্র পাওয়া যায় প্রচুর এবং দামও এত সস্তা যে আমি কোথাও তেমন দেখিনি। আমরা এখানে অন্ধ কালা একজন শেখের সরাইখানায় ছিলাম। তার একটি আশ্চর্য গুণ দেখলাম। তার ছাত্রদের ভেতর একজন। নিজের আঙুল দিয়া মাটিতে বা শূন্যে যা লিখে দিত তিনি অনায়াসে তা বুঝতেন ও জবাব দিতেন। কখনো কখনো এভাবে বড় বড় গল্প পর্যন্ত তাকে বলা হয়। আমরা প্রায় চল্লিশদিন এখানে কাটাই। বিখ্যাত সুলায়মান বাদশাহ কাস্তামুনিয়ার সুলতান। দীর্ঘ শ্মশোভিত রাজোচিত সৌম্যকান্তি বিশিষ্ট সত্তর বছরের বৃদ্ধ তিনি। আমি তাঁর অভ্যর্থনা কক্ষে দেখা করতে গেলে তিনি আমাকে পাশে বসিয়ে আমার সফর সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। পরে তিনি আমাকে তার কাছেই থাকতে হুকুম করে। সেই দিনই আমার ব্যয় নির্বাহের ও ঘোড়ার খাদ্যের জন্য টাকা পয়সা ছাড়াও একটি সাদা ঘোড়া ও একটি পোষাক দিলেন। এরপর অর্ধদিনের পথ দূরের এক গ্রাম থেকে তিনি আমাকে কিছু গম ও বার্লি দেন। কিন্তু খাদ্যশস্য সেখানে খুবই সস্তা বলে তা বিক্রি করা সম্ভব হল না। কাজেই সেগুলি আমার সঙ্গী হজযাত্রীদের দিয়ে দিলাম। প্রতিদিন অপরাহ্নে দরবারে বসা এখানকার সুলতানদের একটি রীতি। তখন সেখানে খাদ্য পরিবেশন করা হয় এবং দরজা খুলে রাখা হয়। শহরের বাসিন্দা, যাযাবর বিদেশী মুসাফের বা সফরকারী–কারও জন্যই সে খাদ্য গ্রহণে বাধা নেই।
কাস্তামুনিয়া থেকে আমরা সানুব (Sinope) এসে পৌঁছলাম। শক্তি ও সৌন্দর্যের সমাবেশ হয়েছে এ জনবহুল শহরটিতে। একমাত্র পূর্ব দিক ব্যতীত শহরটি সমুদ্রদ্বারা বেষ্টিত। পূর্ব দিকের একটি মাত্র প্রবেশপথ দিয়ে শাসনকর্তা ইব্রাহিম বেকের অনুমতি ছাড়া কেউ শহরে প্রবেশ করতে পারে না। ইব্রাহিম বেক্ সুলতান সুলায়মান বাদশাহর ছেলে। শহরের বাইরে এগারটি গ্রাম গ্রীক বিধর্মীদের বাস। সানুবের প্রধান মসজিদটি অত্যন্ত সুন্দর। সুলতান পারওয়ানাহ্ এ মসজিদটি নির্মাণ করেন। তার পরে সুলতান হন তার ছেলে গাজী চেলেবি। গাজী চেলেবির মৃত্যুর পর শহরটি দখল করেন সুলতান সুলায়মান। গাজী চেলেবি সাহসী কিন্তু দাম্ভিক ছিলেন। তাঁর অদ্ভূত দক্ষতা ছিল পানির নীচে সঁতরাবার। তিনি তার যুদ্ধ জাহাজ নিয়ে গ্রীকদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে যেতেন। যখন দুই দলে যুদ্ধ আরম্ভ হতো এবং সবাই ব্যস্ত থাকত যুদ্ধে তখন তিনি লোহার একটি যন্ত্র। দিয়ে পানিতে ডুব দিতেন এবং যন্ত্রের সাহায্যে শত্রুর জাহাজ ফুটো করে দিয়ে। আসতেন। জাহাজ ডুবে যাবার আগে শত্রুরা কিছুই বুঝতে পারত না।
আমরা জাহাজে কিরাম১৬ যাব বলে অনুকুল আবহাওয়ার অপেক্ষায় চল্লিশ দিন কাটালাম কাস্তামুনিয়া। তারপর গ্রীকদের একটি জাহাজ ভাড়া করেও আমাদের এগার। দিন অপেক্ষা করতে হল অনুকুল বাতাসের অপেক্ষায়। অবশেষে আমাদের জাহাজ পাল তুলে দিল কিন্তু তিন রাত্রি চলবার পরই আমরা মধ্য সমুদ্রে আটকা পড়ে গেলাম উয়াবহ। ঝড়ে। দেখতে দেখতে তুমুল ঝড় আরম্ভ হল এবং বায়ুর পরিবর্তিত গতি আমাদের পুনরায় সানুবের কাছে নিয়ে হাজির করল। তারপরে আকাশ পরিষ্কার হলে আমরা আবার যাত্রা শুরু করলাম এবং অনুরূপ আরও একটি ঝড়ের পরে সমুদ্রের পারে পাহাড় দেখতে পেলাম। তখন কার্শ(Kerch) নামক একটি পোতাশ্রয়ের দিকে আমরা অগ্রসর হলাম। যেই পোতাশ্রয়ে ঢুকতে যাচ্ছি এমন সময় দেখতে পেলাম পাহাড়ের উপর থেকে কয়েকজন লোক সঙ্কেতে আমাদের সেখানে ঢুকতে বারণ করছে। বন্দরে কোন শত্রুর জাহাজ আছে মনে করে আমরা ফিরে এসে উপকুল ঘেঁষে চলতে লাগলাম। জাহাজ যখন পারের দিকে যাচ্ছিল তখন আমি কাপ্তেনকে বললাম, আমি এখানে নামতে ইচ্ছা করি। তিনি আমাকে নামিয়ে দিলেন। কিপচ মরুভূমির ভেতর এ স্থানটি সবুজ তৃণাছন্ন কিন্তু বৃক্ষহীন। এখানে জ্বালানী কাঠ দুষ্প্রাপ্য বলে সবাই খুঁটে ব্যবহার করে। কাজেই, সেখানে উচ্চ স্তরের লোকদেরও জামার আঁচলে করে খুঁটে কুড়াতে দেখা যায়। এ মরুভূমিতে যাতায়াতের একমাত্র বাহন চার চাকার গাড়ী। মরুভূমির একদিক থেকে অপরদিক অবধি যেতে ছ’মাস লাগে। ছ’মাসের তিন মাস যেতে হয় সুলতান মোহাম্মদ উজবেগের১৭ রাজ্যের মধ্যে দিয়ে। আমরা এখানে পৌঁছবার পরের দিন আমাদের সঙ্গী একজন সওদাগর কিপচকের এক খৃষ্টান বাসিন্দার কাছ থেকে কয়েকটি গাড়ী ভাড়া করলেন এবং আমরা কাফা এসে পৌঁছলাম। খৃষ্টান অধ্যুষিত কাফা সমুদ্রের তীরে একটি বড় শহর। শহরের খৃষ্টান শাসনকর্তার নাম ডামড়ির (Dennetrio)১৮।
