সেই রাত্রেই আমরা কাবিয়া (Gheiva) পৌঁছে একটি ভ্রাতৃত্বের আশ্রয়ে থাকি। কিন্তু তিনি আরবী ভাষা বুঝতেন না, আমরা বুঝতাম না তুর্কী। কাজেই তিনি একজন ধর্মশাস্ত্রজ্ঞকে ডেকে নিয়ে এলেন। ইনি আমাদের সঙ্গে কথা বললেন ফারসীতে। আমাদের আরবী বুঝতে না পেরে তিনি ভ্রাতাকে বুঝাতে চেষ্টা করলেন, Ishan ‘arabi kuhna miguyand waman ‘arabi naw midanam, pate as প্রাচীন আরবী বলছেন এবং আমি জানি শুধু আধুনিক আরবী। তিনি নিজের লজ্জা ঢাকবার জন্যই একথা বলেছেন, কারণ সবাই জান্ত তিনি আরবী জানেন কিন্তু আসলে তিনি আরবী জানতেন না। কিন্তু তাতে বরং আমাদের যথেষ্ট উপকারই হয়েছিল। আমাদের সেই ভ্রাতা ঐ ব্যক্তিকে বিশ্বাস করে আমাদের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা দেখিয়ে বললেন, “এদের যথেষ্ট সম্মান করতে হবে কারণ এরা আরবীতে কথা বলেন। আমাদের। প্রিয় পয়গম্বর ও তাঁর সাহাবাগণের ভাষাও ছিল প্রাচীন আরবী।”
ধর্মশাস্ত্রবিদ সে লোকটি কি বলেছিলেন প্রথমে আমি বুঝতে পারিনি কিন্তু কথাগুলি আমি মনে করে রেখেছিলাম। পরে আমি যখন ফারসী ভাষা শিখলাম তথনই শুধু অর্থ বুঝতে পারলাম।
আমরা মুসাফেরখানায় সে রাত কাটালাম। ভ্রাতা আমাদের একজন চালক সঙ্গে দিয়ে ইয়ানিজা(Tarakli) নামক বড় একটি শহরে পাঠালেন। আমরা আখির মুসাফেরখানা খুজতে গিয়ে দেখা পেলাম একজন পাগলা দরবেশের। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, “এটাই কি আখির মুসাফেরখানা?”
তিনি বললেন “না-আম” (হাঁ)।
তার জবাব শুনে আমি এই ভেবে খুশী হলাম যে এতদিনে অন্ততঃ আরবী-জানা একজন লোকের দেখা পেলাম। কিন্তু তাকে বেশী করে পরখ করতে গিয়ে সব গুমর ফাঁক হয়ে গেল। তিনি আরবী বলতে শুধু ঐ “না-আম” শব্দটিই জানতেন। আমরা তাই মুসাফেরখানায় আশ্রয় গ্রহণ করলে একজন ছাত্র এসে আমাদের খাবার দিয়ে গেল। আমি নিজে তখন অনুপস্থিত ছিলাম কিন্তু এ ছাত্রটির সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্ব ভাব হয়ে উঠল। যদিও সে আরবী জাত না তবু আমাদের সঙ্গে খুবই সদয় ব্যবহার করত। সে আমাদের বিষয় শাসনকর্তার কাছে বলায় তিনি তার একজন ঘোড়সওয়ার পাঠিয়ে দেন। আমাদের কেনু (Kevnik) পৌঁছে দেবার জন্য। ওরধান বেকের এলাকার ভেতর কেনুক একটি ছোট শহর। মুসলমান শাসনাধীনে শহরে বাস করে বিধর্মী গ্রীকরা। এখানে মুসলমান বাড়ি শুধুই একটি এবং সেটির মালিক গ্রীকদের শাসনকর্তা। কাজেই আমাদের থাকতে হল একজন বৃদ্ধা বিধর্মীয় গৃহে। তখন ছিল তুষার ও বৃষ্টিপাতের সময়। বৃদ্ধা আমাদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করে১৪ এবং আমরা তার গৃহেই রাত কাটাই। এ শহরের কোন গাছগাছড়া বা আঙ্গুর বাগান নাই। এখানে একমাত্র জাফরানের চাষ হয়। আমাদের সওদাগর মনে করে বৃদ্ধা আমাদের কাছে বিক্রির জন্য। অনেকটা জাফরান এনে হাজির করেছিল।
ভোরে আমরা ঘোড়ায় চড়ে রওয়ানা হলে আমাদের ঘোড়সওয়ার চালক আরেকজন চালক এনে হাজির করল আমাদের মুতুরনি অবধি পৌঁছে দিতে। আগের দিন রাত্রে এত অধিক তুষার পাত হয়েছে যে রাস্তার চিহ্ন লুপ্ত হয়ে গেছে। কাজেই আমাদের চালক আগে-আগে যেতে লাগল, আমরা তার পদচিহ্ন অনুসরণ করে চললাম। প্রায় দুপুরের সময় আমরা তুর্কমেনদের একটি গ্রামে এসে পৌঁছলাম। তারা আমাদের আহারের বন্দোবস্ত করলো। আমাদের ঘোড়সওয়ারের অনুরোধে তাদের একজন এসে আমাদের। সঙ্গী হল। বন্ধুর পাবর্ত্য পথের ভেতর দিয়ে সে আমাদের নিয়ে চলল। একটি খালে আমাদের ত্রিশবারের বেশী পার হতে হল। সে সব ছাড়িয়ে গেলে চালক আমাদের কাছে কিছু অর্থ চাইল। আমরা বললাম, “আমরা শহরে পৌঁছে তোমাকে যথেষ্ট অর্থ দেব।”
আমাদের কথায় সে সন্তুষ্ট হল না অথবা বুঝতেই পারল না। সে আমাদের এক সঙ্গীর একটি ধনুক চেয়ে নিয়ে একদিকে কিছু দূর গিয়ে আবার ফিরে এল। আমি সে। সময় তাকে কিছু অর্থ দিলাম। সে তখন আমাদের ফেলেই চলে গেল। কোন্ দিকে যেতে হবে কিছুই আমরা জানি না, আমাদের সামনে কোন রাস্তাও নেই। সূর্য ডুবে যাচ্ছে প্রায় এমন সময় আমরা একটা পাহাড়ে এসে পৌঁছলাম। সেখানে আমরা পথ চিনতে পারলাম কতকগুলি পাথর পথে ছড়ানো দেখে। আরও বেশী তুষারপাত হতে পারে এবং জায়গাটা জনমানবহীন আশঙ্কা করে আমার ভয় হ’ল হয়ত সঙ্গীদেরসহ এখানেই আমাদের শেষ। ঘোড়া থেকে নামলে আমাদের ধ্বংস অনিবার্য এবং পথ চলব তাও জানা। নেই। আমার ঘোড়াটা ছিল ভাল। তখন মনে মনে ভাবলাম, আমি যদি নিরাপদে কোথাও পৌঁছতে পারি তবে সঙ্গীদের রক্ষার চেষ্টা করতে পারি। এই ভেবে আমি তাদের। খোদার উপর সোপর্দ করে রওয়ানা হয়ে গেলাম। সন্ধ্যার অনেক পরে এক জায়গায় কতকগুলি বাড়ীঘর দেখে বলে উঠলাম, আল্লাহু বাড়িগুলিতে যেনো লোকজনের দেখা পাই। লোকজনের দেখা সত্যিই পেলাম। খোদা মেহেরবানী করে আমাকে কয়েকজন দরবেশের এক বাসস্থানে এনে হাজির করেছেন। দরজায় আমাকে কথা বলতে শুনে তাদের একজন বেরিয়ে এলেন। আমি লোকটিকে আগে থেকেই চিনতাম। দরবেশদের সঙ্গে নিয়ে আমি তাকে আমার সঙ্গীদের রক্ষার জন্য যেতে অনুরোধ করলাম। আমাকে। সঙ্গে নিয়েই তারা সেখানে গেলেন এবং পরম দয়ালু খোদাকে অশেষ ধন্যবাদ যে আমরা সবাই নিরাপদে ফিরে এলাম। দরবেশদের সবাই সাধ্যমত খাদ্যবস্ত্র দিয়ে আমাদের বিপদ দূর করলেন।
