আমি বললাম, “না, তেমন কোন পাথরের কথা আজ অবধি শুনি নি।”
“হ্যাঁ, এ শহরের বাইরে একবার একটি পাথর পড়েছিল।” এই বলে তিনি সেই পাথরটি আনতে হুকুম করলেন। প্রকাও একটা কাল পাথর আনা হল আমাদের সামনে। পাথরটি শক্ত এবং চঞ্চকে। মনে হল তার ওজন এক হন্দরের কম হবে না। অতঃপর সুলতান ডেকে পাঠালেন পাথর-ভাঙ্গা মজুরদের। চারজন মজুর এক সঙ্গে লোহার হাতুড়ী দিয়ে পাথরের উপর ঘা মারল কিন্তু পাথরের গায়ে কোন দাগও পড়ল না। আমি বিস্ময়ে অবাক হয়ে গেলাম। সুলতান তখন পাথরের টুকরাটি যথাস্থানে নিয়ে রাখতে হুকুম দিলেন। আমরা চৌদ্দদিন অবধি এ সুলতানের সঙ্গে একত্রে বাস করেছি। প্রতি রাত্রেই তিনি আমাদের জন্য ফল, মিষ্টি ও অন্যান্য খাদ্য পাঠাতেন, আর পাঠাতেন মোমবাতি। তা ছাড়াও তিনি আমাকে এক শ’ স্বর্ণমুদ্রা, এক হাজার দেরহাম, এক প্রস্থ পরিচ্ছদ এবং মাইকেল নামে একজন গোলাম উপহার দেন। আমার সঙ্গীদের প্রত্যেককে দেন একটি করে পোষাক ও কিছু অর্থ। এসব কিছুর জন্যই আমরা অধ্যাপক মহিউদ্দিনের কাছে ঋণী। খোদা তার মঙ্গল করুন।
আমরা সেখান থেকে পুনরায় যাত্রা শুরু করে সুলতানের এলাকার মধ্যেই তিরা শহরে এলাম। সেখান থেকে এলাম গ্রীকদের শহর আয়ামূলক (Ephesus)। গ্রীকরা এ প্রাচীন বড় শহরটিকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখে। পাথরের দ্বারা সুন্দরভাবে নির্মিত প্রকাও একটি গীর্জা এখানে আছে। প্রত্যেকটি পাথর খণ্ড দশ হাত বা তার চেয়েও বেশী লম্বা। এখানকার বড় মসজিদটি অত্যন্ত সুদৃশ্য। এক সময়ে এটি গ্রীকদের একটি গীর্জা ছিল। আমি চল্লিশ দিনারে এখানে একটি গ্রীক বাদী ক্রয় করেছিলাম।
সেখান থেকে আমরা এলাম ইয়াজমীর (স্বার্থা)। সমুদ্রোপকূলে ধ্বংসপ্রায় একটি বড় শহর। আয়দীনের সুলতানের পুত্র ওমর এখানে শাসনকর্তা। আমার কথা শুনে তিনি সরাইখানায় দেখা করতে এসেছিলেন এবং আমাকে উপহার পাঠিয়েছিলেন। পরে তিনি আমাকে নিকোলাস নামক একজন গ্রীক ক্রীতদাসও দেন। তিনি একজন দয়ালু ও ধর্মপ্রাণ শাহজাদা এবং সর্বদা খৃষ্টানদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত থাকেন। তার কতকগুলি নৌকা ছিল। সেগুলির সাহায্যে তিনি বিখ্যাত কস্টান্টিনোপলের আশে-পাশে আক্রমণ করে’ লোকদের বন্দী করে আনতেন ও লুটের মাল আনতেন। সে সব দান খয়রাত ও উপহারে ব্যয় করে আবার গিয়ে আক্রমণ চালাতেন। অবশেষে এ আক্রমণে অতিষ্ঠ হয়ে। গ্রীকরা আবেদন জানান পোপের কাছে। পোপ জেনোয়া ও ফ্রান্সের খৃষ্টানদের আদেশ করলেন প্রতি-আক্রমণ চালাতে। তারা তাই করল। পোপও রোম থেকে একদল সৈন্য। পাঠালেন। পোপের সৈন্যরা রাত্রে আক্রমণ চালিয়ে বন্দর ও শহর দখল করে ফেলল। আমীর ওমর দূর্গ থেকে বেরিয়ে তাদের প্রতিরোধ করতে গিয়ে কিছু সংখ্যক সৈন্যসহ শহীদ হলেন। খৃস্টানরা শহরে আধিপত্য বিস্তার করলেও দূর্গটি সুরক্ষিত ও শক্তিশালী থাকায় তা দখল করতে পারল না।
সেখান থেকে আমরা মাগনিসিয়া (এখন Manisa) এসে হজের নামাজ পড়লাম। আমাদের জামাতে ছিলেন সুলতান সারুখান। এখানে আমার গোলামটি ঘোড়াকে পানি খাওয়াবার জন্য গিয়ে আমার সঙ্গীর আরেকটি গোলামের সঙ্গে পালাবার চেষ্টা করে। সুলতান পলাতকদের খুঁজে বের করতে পাঠালেন কিন্তু সবাই তখন ঈদের উৎসবে ব্যস্ত বলে তাদের খুঁজে বের করা সম্ভব হল না। তারা ফুজা নামে উপকুলবর্তী একটি শহরের দিকে পলায়ন করে। এ শহরটি বিধর্মীদের অধিকারে।১২ বিধর্মীরা প্রতি বছর সুলতানকে কিছু উপহার পাঠায়। ফলে সুলতান তাদের উপর সন্তুষ্ট থাকেন। পরের দিন। দুপুর বেলা কয়েকজন তুর্কী ঘোড়াসহ গোলামদের এনে আমাদের কাছে হাজির করে। আগের দিন বিকালে পলাতকরা তুর্কীদের কাছ দিয়ে চলে যাচ্ছিল। তাদের দেখে সন্দেহের উদ্রেক হওয়ায় অনেক জিজ্ঞাসাবাদের পরে পলাতকরা পলায়নের ব্যাপার। স্বীকার করতে বাধ্য হয়।
অতঃপর আমরা বারখামা পৌঁছলাম। বারখামা একটি ধ্বংস প্রায় শহর কিন্তু এখানে পাহাড়ের চূড়ায় একটি সুরক্ষিত দূর্গ রয়েছে। এখানে আমরা একজন গাইড নিযুক্ত করে পাহাড়ের পথে সফর করে বালিকাসরি এসে পৌঁছলাম। এখানকার দুমুর খাঁ নামক সুলতান একজন অপদার্থ ব্যক্তি। তার পিতা এ শহর নির্মাণ করেন এবং পুত্রের আমলে সে শহর একদল প্রতারকের বাসস্থানে পরিণত হয়। যেমন রাজা, তেমনি তার। প্রজা।” আমি তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তিনি আমাকে একটি জামা উপহার দেন। এ শহর থেকে আমি মার্গেরাইট নাম্নী একটি গ্রীক বালিকা বাদী রূপে খরিদ করি।
বারখামা থেকে আমরা এলাম বাবু (Brusa)। চমৎকার বাজার, প্রশস্ত রাস্তা চারিদিক ফলের বাগবাগিচা ও নদীনালা সহ বারসা একটি বড় শহর। এখানে শহরের বাইরে দু’টি চিকিৎসাগার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তার একটি পুরুষদের জন্য, অপরটি। নারীদের জন্য। দূর দূরাঞ্চল থেকে রোগীরা এখানে চিকিৎসার জন্য আসে। তারা এসে একজন তুর্কী সুলতানের দ্বারা নির্মিত একটি মুসাফেরখানায় তিনদিন বসবাস করতে পারে। এ শহরে এসে আমি শেখ আবদুল্লাহ্ নামক একজন মিশরী ভ্রমণকারীর দেখা পাই। তিনি চীন, সিংহল, পাশ্চাত্য, স্পেন, নিগ্রোল্যাণ্ড ছাড়া দুনিয়ার সব দেশ সফর করেছেন। কাজেই এসব দেশ সফর করে এ ব্যাপারে আমি তাকে ছাড়িয়ে গেছি। বারসার বর্তমান সুলতান ওখান বেক। তিনি ওসমান চাকের পুত্র। তিনি তুর্কমেন সুলতানদের সর্বপ্রধান। অর্থ, জমি, সৈন্যবল প্রভৃতিতে তিনি সবচেয়ে বেশী সম্পদশালী। তার প্রায় এক শ’টি দূর্গ তিনি নিজে ঘুরে ঘুরে দেখাশুনা করেন। তিনি বিধর্মীদের সঙ্গে যুদ্ধ করেন এবং তাদের দেশ অবরোধ করেন। তাঁর পিতাই বারসা। শহর গ্রীকদের থেকে দখল করেন। কথিত আছে তিনি প্রায় বিশ বৎসরকাল ইয়াজনিক (Nicea) অবরোধ করে রাখেন কিন্তু শহরটি দখলের পূর্বেই এন্তেকাল করেন। এ জায়গাটি দখল করবার আগে তাঁর পুত্র ওখান বেকও প্রায় বার বৎসর কাল এটি অবরোধ করে রাখেন। আমি বাসায় এসে এখানেই তার দেখা পাই।১৩ একটি হ্রদের মধ্যস্থলে অবস্থিত ইয়াজনিক শহরে ঢুকতে হয় সরু পুলের মত একটি রাস্তা পার হয়ে। এ রাস্তাটি এত সরু যে এক সঙ্গে একজন মাত্র ঘোড়সওয়ার অগ্রসর হতে পারে। শহরের চারদিক দেওয়াল দ্বারা বেষ্টিত। দুটি দেওয়ালের মধ্যে একটি করে পরিখা। পরিখা পার হতে হয় কাঠের টানা সকোর সাহায্যে। দেওয়ালের মধ্যে ফলের বাগান, ঘরবাড়ী, ও মাঠ আছে। পানি তুলতে হয় কুপ থেকে। আমার একটি ঘোড়া অসুস্থ হয়ে পড়ে বলে আমাদের এখানে চল্লিশ দিন থাকতে হয়। কিন্তু অনেক বিলম্ব হতে থাকায় অতিষ্ঠ হয়ে আমি তিনজন সঙ্গী একটি বালিকা বাদী ও দু’জন বালক গোলাম নিয়ে ঘোড়াটি ফেলেই রওয়ানা হয়ে এলাম। ভাল তুর্কী ভাষা জানে এবং দোভাষীর কাজ করতে পারে তখন এমন কেউ আমাদের সঙ্গে ছিল না। আমাদের দোভাষীকে আমরা ছেড়ে এসেছি ইয়াজনিকে। এ শহর ছেড়ে আমরা সাকারী (Sangarius) নামে প্রকাণ্ড একটি নদী খেয়ার সাহায্যে পার হয়ে এলাম। খেয়া বলতে চারটি কাঠের বিম দড়ি দিয়ে একত্রে বাধা। তার উপরে মালপত্র চাপিয়ে যাত্রীরা উঠলে তা অপর পারে নেওয়া হয় দড়ির সাহায্যে টেনে। ঘোড়াগুলি সাতরে যায় তার পেছনে।
