অবশেষে আমরা দেশের আরেকটি বড় শহর সিওয়াসে এসে পৌঁছলাম। ইরাকের সুলতানের নিয়োজিত একজন শাসনকর্তা সিওয়াসে বাস করেন। তার নাম আলাউদ্দিন আরতানা। শহরের কাছে যেতে প্রথমে আমাদের সঙ্গে দেখা হ’ল যুব ভ্রাতা আহমদ-এর অন্তর্ভুক্ত একটি দলের সঙ্গে, তারপরে দেখা হ’ল যুবভ্রাতা সেলেবী দলের সঙ্গে। তারা। আমাদের অনুরোধ জানাল তাদের আতিথ্য গ্রহণ করতে কিন্তু আমরা আগের দলকে কথা দিয়েছিলাম বলে সে অনুরোধ রক্ষা করতে পারলাম না। তাদের মুসাফেরখানায় হাজীর হলে আমাদের মেজবানরা অত্যন্ত খুশী হলেন এবং বিশেষ সমাদরের সঙ্গে আমাদের মেহমানদারী করলেন। আমরা আলাউদ্দিন আরতানার সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি বিশুদ্ধ আরবীতে আমার সঙ্গে কথার্বাতা বললেন, যে সব দেশ সফর করেছি, যে সব রাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে সে সব জানতে চাইলেন এবং আমাদের উপহার দিয়ে বিদায় দিলেন। বিদায়ের আগে চিঠি লিখে দিলেন অন্যান্য শহরস্থ তার সহকারীদের কাছে আমাদের সমাদর করবার জন্য এবং খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরবরাহের জন্য।
সেখান থেকে আমরা পৌঁছলাম আমাসিয়া। প্রশস্ত রাস্তাওয়ালা এ শহরটি যেমন সুন্দর তেমনি বড়। সেখান থেকে এলাম কুমিশ(মুশখানা)। কুমিশ একটি জনবহুল শহর। এখানে একটি রৌপ্য খনি আছে। ইরাক ও সিরিয়ার সওদাগরেরা এ শহরে অহরহ যাতায়াত করে। কুমিশ ছেড়ে পৌঁছলাম এসে আরজানজান। আরজানজানের অধিকাংশ বাসিন্দা আর্মেনিয়ান। আরজানজানের পর আমরা এলাম আরজাররাম। শহরটি বড় কিন্তু দু’দল তুর্কমেনদের ভেতর গৃহযুদ্ধের ফলে শহরটি আজ ধ্বংসের মুখে এসে পড়েছে। আমরা এখানে যুবভ্রাতা তুমানের মুসাফের খানায় আশ্রয় নিয়েছিলাম। শুনলাম তুমানের বয়স একশ ত্রিশ বছর। তিনি একখানা লাঠি ভর করে হেঁটে বেড়ান। তিনি এখনও কার্যক্ষম আছেন এবং নিয়মিত নির্দিষ্ট সময়ে নামাজ আদায় করেন।
অতঃপর আমরা পৌঁছলাম বিরগী১০। সেখানে এসে শুনলাম মহিউদ্দিন নামক একজন নামকরা অধ্যাপক সেখানে বাস করেন। মাদ্রাসায় পৌঁছে আমরা দেখলাম, তিনি একটি তেজী গাধায় আরোহণ করে সবেমাত্র আসছেন। তার পরিধানে রয়েছে সোনালী জরির কাজ করা প্রচুর কাপড় জামা। দু’পাশে আসছে গোলাম ও ভূত্যের দল, পিছনে ছাত্রেরা। তিনি আমাদের সদয় অভ্যর্থনা জানালেন এবং মাগরেবের নামাজের পর আমাকে দেখা করতে আমন্ত্রণ জানালেন।
যথা সময়ে গিয়ে আমি তার দেখা পেলাম তার বাগানে একটি অভ্যর্থনা কক্ষে। বাগানে একটি নহর আছে। মারবেল পাথরের চৌবাচ্চার সঙ্গে সেটি যুক্ত। কারুকার্যময় বক্সে আবৃত একটি উচ্চ আসনে তিনি বসেছেন, ডাইনে ও বামে দাঁড়িয়ে আছে গোলাম, ভৃত্য ও ছাত্রের দল। আমি তাকে প্রথম দেখে কোন রাজা বলেই ভুল করেছিলাম। তিনি উঠে আমাকে অর্ভ্যথনা করে বেদীর উপর পাশে আমাকে বসালেন। খাওয়ার পরে আমরা মাদ্রাসায় ফিরে এলাম। বিরগীর সুলতান তখন নিকটেই পাহাড়ের উপর তার গ্রীষ্মবাসে বাস করছিলেন। অধ্যাপকের কাছে খবর পেয়ে তিনি আমাকে ডেকে পাঠান। অধ্যাপকের সঙ্গে আমি গিয়ে যখন হাজির হলাম, তিনি তখন তার দু’ পুত্রকে পাঠালেন আমাদের কুশল প্রশ্নাদি জিজ্ঞাসার জন্য। আমাকে তিনি একটি তাবুও পাঠালেন। এ শ্রেণীর তাবুকে এখানে খরগ বলে। কাঠের কতকগুলি বাতা গুম্বজাকারে একত্র করে এটি তৈরী করা হয়েছে। বাতার ফাঁকে পশমী কাপড়-উপরের দিক আলো-হাওয়া প্রবেশের জন্য খোলা। দরকার মত তা বন্ধও করা যায়। পরের দিন সুলতান আমাকে ডেকে পাঠালেন এবং আমি যে সব দেশে সফর করেছি সে সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। আহারের পরে আমি বিদায় নিয়ে এলাম। কয়েক দিন এভাবেই চলল। সুলতান প্রত্যেক দিনই তাঁর সঙ্গে আহারের জন্য আমাদের ডেকে পাঠান। তুর্কীরা ধর্মশাস্ত্রবিদদের প্রতি যে সম্মান প্রদর্শন করে তার নিদর্শন স্বরূপ তিনি নিজেই একদিন বিকেলে এসে আমাদের তাবুতে হাজির হলেন। অবশেষে অধ্যাপক ও আমি উভয়েই এ পাহাড়ে বাস করে অতিষ্ঠ হয়ে উঠলাম। কাজেই অধ্যাপক একদিন সুলতানকে বলে পাঠালেন যে। আমি পুনরায় আমার সফর শুরু করতে চাইছি। জবাবে সুলতান জানালেন, তিনি পরের দিন আমাদের সঙ্গে নিয়ে শহরে তার প্রাসাদে ফিরে যাবেন। পরের দিন আমাদের জন্য একটি চমৎকার ঘোড়া পাঠিয়ে তিনিও আমাদের সঙ্গে শহরে ফিরে এলেন। প্রাসাদে ফিরে এসে প্রকাণ্ড একটি সিঁড়ি বেয়ে দরবার কক্ষে এসে পৌঁছলাম। কক্ষের মধ্যস্থলে পানির একটি চৌবাচ্চা। চৌবাচ্চার প্রত্যেক কোণে একটি করে ব্রঞ্জনির্মিত সিংহ। সিংহের মুখ থেকে চৌবাচ্চায় অনবরত পানি পড়ছে। কক্ষের চারদিকে বেষ্টন করে। কার্পেট মোড়া বেদী–এক জায়গায় বেদীর উপরে সুলতানের জন্য গদি আঁটা আসন। আমরা এখানে পৌঁছলে সুলতান গদি সরিয়ে আমাদের সঙ্গে কার্পেটের উপর আসন গ্রহণ করলেন। কোর-আন পাঠকগণ সর্বদাই দরবারে হাজির থাকেন। তারা বসেন বেদীর নীচে। কিছু শরবৎ ও বিস্কুট খাওয়ার পরে আমি সুলতানকে ধন্যবাদ জানালাম ও অধ্যাপকের প্রশংসা করলাম। তাতে সুলতান অত্যন্ত খুশী হলেন।
আমরা সে অবস্থায় বসা থাকতেই সুলতান হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, “আসমান থেকে পড়েছে এমন কোন পাথর আপনি কখনও দেখেছেন কি?”
