রাস্তার বিপদের ভয়ে আমরা লাধিকে কিছুদিন কাটাই। পরে একটি কাফেলার সংবাদ পেয়ে আমরা একদিন এবং পরবর্তী রাত্রের কিছু অংশ তাদের সঙ্গে গিয়ে তাবাস (Davas) দূর্গে পৌঁছি। দূর্গের বাইরেই আমাদের সে রাত্রি কাটাতে হয়। পরের দিন ভোরে দেওয়ালের উপর দিয়ে আমাদের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করে খোঁজ খবর দেওয়া হয়। অতঃপর তাদের সেনাপতি তার সৈন্যদল নিয়ে বেরিয়ে আসেন এবং কোথাও দরা আছে কিনা চারদিকে ঘুরে তা দেখেন। দেখার পরে পশুগুলি ছেড়ে দেওয়া হয় বিচরণের জন্য। এই সেখানকার নিত্য প্রচলিত রীতি। সেখান থেকে আমরা এলাম। মুঘলা এবং মুলা থেকে মিলাস। মিলাস দেশের অন্যতম সুন্দর ও প্রসিদ্ধ শহর। আমরা এখানেও একটি যুব ভ্রাতৃত্বের মুসাফেরখানায় বাস করি। এখানে তারা আমাদের নানাভাবে যে রকম সমাদর করেন সে সমাদর আগের চেয়েও বেশী। শাসনকর্তা হিসাবে এখানকার সুলতান একজন খ্যাতনামা ব্যক্তি। তিনি সর্বদা ধর্মশাস্ত্রবিদৃদের সঙ্গে দিন কাটান। তিনি আমাদের খাদ্য ও অর্থ উপহার দিয়েছিলেন। সুলতানের উপহার গ্রহণ করে আমরা কুনিয়া (Konia) শহরের উদ্দেশ্য যাত্রা করি। কুনিয়া সুন্দর অট্টালিকাবিশিষ্ট একটি বড় শহর। এ শহরে অনেক নদীনালা ও ফলের বাগান আছে। শহরের রাস্তাগুলি যথেষ্ট প্রশস্ত এবং প্রত্যেক পণ্যের জন্য এখানে পৃথক বাজার আছে। কথিত আছে এ শহর স্থাপিত হয় বাদশাহ সেকান্দারের দ্বারা। বর্তমানে এ শহরটি সুলতান বদরউদ্দিন ইব্নে কারামানের রাজত্বের অন্তর্গত। একটু পরেই আমরা তাঁর বিষয়ে উল্লেখ করব। শহরটি কিছুদিনের জন্য ইরাকের রাজা দখল করেছিলেন কারণ এ শহর তার রাজ্যের অতি নিকটে। আমরা মেহমান হয়েছিলাম কাজীর মুসাফেরখানায়। কাজীর নাম ইব্নে কালাম শাহ। তিনি ফতুয়ার একজন সভ্য। তার মুসাফেরখানাটি বড় এবং শিষ্য সংখ্যাও যথেষ্ট। খলিফা হজরত আলীর সময় থেকে তাদের এ ফতুয়া চলে এসেছে বলে তারা দাবী করে। সূফী মতাবলম্বীরা যেমন তালি দেওয়া বস্ত্র পরিধান করে তাদেরও তেমনি বিশেষ পরিধেয় ছিল পায়জামা। এই কাজী অন্যান্য ফতুয়ার চেয়ে অনেক বেশী সমাদর আমাদের করেছেন এবং নিজের পরিবর্তে ছেলেকে আমাদের সঙ্গে গোসল খানায় পাঠিয়েছেন।
এ শহরেই বিখ্যাত ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি জালালউদ্দিন রুমীর মাজার শরীফ অবস্থিত। রুমী এখানে মাওলানা (আমাদের প্রভু) নামে পরিচিত। তিনি অশেষ শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। আনাতোলিয়ায় এক ভ্রাতৃত্ব আছে তারা মাওলানা রুমীর সঙ্গে আধ্যাত্মিক সংযোগ দাবী করে। তাঁর নামানুসারে এ ভ্রাতৃত্বকে বলা হয় জালালিয়া। কাহিনী প্রচলিত আছে যে, জালালউদ্দিন প্রথম জীবনে একজন ধর্মশাস্ত্রজ্ঞ ও অধ্যাপক ছিলেন। একদিন এক মিঠাই বিক্রেতা কলেজের মসজিদে এল এক খাঞ্চা মিঠাই মাথায় নিয়ে। তাঁকে এক টুকরা মিঠাই দিয়ে সে বেরিয়ে গেল। শেখ তখন তার অধ্যাপনার কাজ ফেলে মিঠাইওয়ালার পেছনে চলে গেলেন এবং কয়েক বছর অবধি নিরুদ্দিষ্ট রইলেন। তারপরে তিনি ফিরে এলেন সত্য কিন্তু ফিরে এলেন মানসিক সুস্থতা হারিয়ে। তখন। তিনি ফারসী কবিতা আবৃত্তি করা ছাড়া আর কোন কথাই বলতেন না। তাঁর ফারসী কবিতার অর্থও তখন কেউ বুঝতে পারত না। তিনি তখন যা রচনা করেছেন তার শিষ্যরা সে সব লিখে রেখেছেন। পুস্তকাকারে সে সব রচনার সমষ্টিই বিখ্যাত গ্রন্থ মসনবি। এ গ্রন্থকে এ দেশের লোকেরা বিশেষ শ্রদ্ধার চোখে দেখে। এ গ্রন্থের বিষয় নিয়ে তারা গভীরভাবে চিন্তা করে, শিক্ষা দেয় এবং প্রতি বৃহস্পতিবার রাত্রে তাদের ধর্মশালায় এ গ্রন্থ পাঠ করে।
কুনিয়া থেকে আমরা এলাম লারান্দা (কারামান)। লারান্দা কারামানের সুলতানের রাজধানী। সুলতানের সঙ্গে আমার দেখা হল শহরের বাইরে। তিনি তখন শিকার করে ফিরছিলেন। আমি ঘোড়া থেকে নেমে তাকে অভ্যর্থনা করায় তিনিও ঘোড়া থেকে নেমে পড়লেন। এ দেশের সুলতানদের যদি কোন বিদেশী সফরকারী ঘোড় থেকে নেমে সম্মান প্রদর্শন করে তবে তারাও তাঁর চেয়ে বেশী সম্মান তাদের করেন। পক্ষান্তরে যদি কেউ ঘোড়া থেকে না নামেন তবে তারা অসন্তুষ্ট হন। ফলে তিনি তাদের সদেস্থা থেকে বঞ্চিত হন। একবার এ ধরণের কোন এক রাজার আমরা অনুরূপ একটি ব্যাপার ঘটেছিল। সুলতানকে এভাবে সম্মান করার পরে তিনি আমাকে সঙ্গে নিয়ে শহরে এলেন। এবং বিশেষ আতিথেয়তা দেখালেন।
আমরা অবশেষে ইরাক রাজ্যের অন্তর্গত আকসারা (আকসেরাই) এসে পৌঁছলাম। এখানে ভেড়ার লোমের কার্পেট তৈরী হয় এবং সে সব কার্পেট সুদূর ভারত, চীন ও তুর্কী দেশগুলিতে চালান হয়ে যায়। আকসারা থেকে নাকদা এবং সেখান থেকে এলাম কায়সারিয়া। কায়সারিয়া দেশের অন্যতম বড় শহর। এ শহরে একজন শাসনকর্তার বেগম (Khatun) বাস করেন। তিনি সুলতানের আত্মীয়, এবং সুলতানের সকল আত্মীয়ের মতই তিনি আগা পদবী ব্যবহার করেন। আগার অর্থ বিখ্যাত। আমরা তাঁর। সঙ্গে দেখা করলে তিনি অত্যন্ত বিনীত ব্যবহার করলেন এবং আমাদের আহারের ব্যবস্থা করলেন। বিদায়ের সময় তিনি জাজিম ও লাগাম সহ একটি ঘোড়া এবং কিছু অর্থ উপহার দিলেন। এ শহরগুলির সর্বত্রই আমরা যুব ভ্রাতৃত্বের মুসাফেরখানায় বাস করেছি। সুলতান যে শহরে বসবাস না করেন, এখানকার প্রচলিত রীতি অনুসারে সে। শহরের শাসন ভার থাকে একজন যুব ভাইয়ের উপর। তিনি সুলতানের সমমর্যাদায় সবকিছু কার্য পরিচালনা করেন।
