২২। এটা শোয়ার্জ কতৃর্ক গৃহীত হয়েছে (ইরান ঈম মিটেল-আলটার ৩,১৩৩) খাওয়ারিস্তান বলে। (অন্যভাবে সার্ভিস্তান বলা হয়)। স্থানটি সিরাজের পঞ্চাশ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে। যদি তাই-ই হয় তাহলে এখানে শহরটির স্থান নির্দেশ করা ইনে বতুতার ভ্রান্তিবশতঃ হয়েছে। এ ভূল ঘটেছে ভারত থেকে ১৩৪৭ সালে (১২পরিচ্ছেদের ৩ টীকা দ্রষ্টব্য) ফিরবার সময়ে যে পথ তিনি ধরেছিলেন সেটার ভ্রান্ত স্মৃতি থেকে। সে সময়ে তিনি নিশ্চয়ই। খাওয়ারিস্তানের ভিতর দিয়ে সিরাজ গমন করেছিলেন। এটা খুব অসম্ভব ব্যাপার যে একজন। আরব খাওয়ারিস্তানকে কাওরি স্তান নামে প্রদর্শন করবেন। অবশ্য স্থানীয় লোকেরা যদি এরূপ উচ্চারণ করে তবে আর কোনো কথা উঠে না।
২৩। বন্দর আব্বাশের ১২০ মাইল উত্তর-পশ্চিমে লার অবস্থিত।
২৪। “মেহমানদারী-উপহার”এর মধ্যে রয়েছে খাদ্য এবং অন্যান্য জিনিস-পত্র। বিশেষ অতিথিদের এ সব উপহার দেওয়া হয়। (উপরের ৭ টীকা দ্রষ্টব্য)।
২৫। খুনজুবাল সম্ভবতঃ দুই নাম। দ্বিতীয়টিকে ইয়াকুত উল্লেখ করেছেন ফাল্ বলে এবং বর্ণনা করেছেন একটি শহরের প্রান্তে অবস্থিত একটি বৃহৎ গ্রাম রূপে। সমুদ্র-উপকুলের নিকট ফারস্ প্রদেশের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত। তিনি আরো বলেন যে এর অবস্থিতি হরমুজ এবং হুজুর মাঝখানের পথে (কি দ্বীপের বিপরীত দিকে প্রধান ভূভাগের একটি দূর্গ, এখন কালাহ্ আল্ ওবাইদ)। এ নামের প্রথম অংশ আমাদের ম্যাপে হনুজ বা হুজু নামে পরিচিত, ২৭.০৪ উত্তরে, ৫৪.০২ পূর্বে। (শাওয়ার জ্ব, ইরান, ৩য় খণ্ড, ১৩২; ২য় খণ্ড, ৮০; Z.D.M.G.৬৮, ৫৩৩)।
২৬। ইব্নে বতুতা এখানে বেশ কিছুটা ভূল করেছেন। সিরাফের পুরাকালীন বন্দর, একদা পার্শিয়ান উপসাগরের একটি বাণিজ্যস্থান, বর্তমান তাহিরির নিকটে অবস্থিত ছিল। কে কিংবা কি হচ্ছে একটি দ্বীপ। এটা প্রায় সত্তর মাইল দূরে। বারো শতাব্দীতে এর স্থান দখল করেছিল। সিরাফ এবং তেরো শতাব্দীতে এর স্থান নিয়েছিল হরমুজ। আবার সতেরো শতাব্দীতে এর স্থানে বসেছিল বন্দর আব্বাস।
২৭। অধিকতর সঠিক চার্ডিন বলছেঃ “মুক্তা আহরণকারী ডুবুরিগণ অনেক সময় এক চতুর্থ ঘণ্টার অর্ধেক সময় কাল পানির তলায় থাকে।”
২৮। পূর্ব আরাবিয়ার ভূগর্ভস্থ পানির ধারা বাহারিণের সমুদ্রে পতিত হয়। তুর্কী অধিকারের সময় জাহাজীগণ সমুদ্রের তলায় ডুব দিয়ে চামড়ার ব্যাগে করে স্বচ্ছ পানি আনতে কাপ্তানের। ব্যবহারের জন্য-পর্তুগীজগণ এভাবেই পাম যোগে ব্যবহার্য পানি নিজেদের জন্য সরবরাহ করতো। একটি গল্প প্রচলিত আছে যে, একবার একটি উট আল-হাসাতে একটি উৎসের মধ্যে পরে যায় এবং সেটাকে পরে পাওয়া গিয়েছিল বাহারিণের নিকট সমুদ্রে।
২৯। আল্-হাসা বা হাজার মরুদ্যানের পূর্ণ বিবরণ (প্রথমটির মানে নুড়ি এবং দ্বিতীয়টির মানে পাথর) পাওয়া যাবে জিওগ্রাফিকেল জার্ণাল ৬৩(১৯২৪),১৮৯-২০৭ পৃষ্ঠায়। এর প্রধান। শ এখন হোফুফ নামে অভিহিত। এ প্রবন্ধ থেকে দেখা যায় সেখানে এখনো ছড়িয়ে রয়েছে। বেশ কিছু শিয়া সম্প্রদায়। এদের অধিকাংশ বাহরিণার বংশদ্ভূত (বাহারাই শিয়া)। এরা অনেক কাল আগে এই মরুদ্যানে বসবাস শুরু করেন।” ৩০। নাজুদের পূর্ববর্তী প্রধান শহর, বালুকাত্তরে চাপা এ শহরের ধ্বংসাবশেষ বর্তমান রাজধানী রিয়াদের ৫৮ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে পড়ে রয়েছে। এবং এটা ২৪.০৭ উত্তরে, ৪৭.২৫ পূর্বে (ফিবির হার অব আরাবিয়া ২য় খণ্ড, ৩১-৪০পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)।
০৪. ইয়েমেন ও ভারত যাবার উদ্দেশ্যে
চার
ইয়েমেন ও ভারত যাবার উদ্দেশ্যে হজের পরেই আমি জেদ্দায় এলাম জাহাজ ধরবার জন্য কিন্তু কোন সঙ্গী পেলাম না বলে আমার সে উদ্দেশ্য ব্যর্থ হল। আমাকে চল্লিশ দিন কাটাতে হল জেদ্দায়। সেখানে তখন কসাইরগামী একখানা জাহাজ ছিল। জাহাজটির অবস্থা কি রকম দেখবার জন্য জাহাজে উঠে আমি সন্তুষ্ট হতে পারলাম না। খোদার ইচ্ছায় তা হয়েছিল, কারণ সে জাহাজটি যাত্রা করে গিয়ে সমুদ্রে ডুবে যায় এবং অতি অল্প লোকই প্রাণ রক্ষা করতে সমর্থ হয়। পরে আমি আয়বীব যাওয়ার জন্য জাহাজে উঠি কিন্তু জাহাজ গিয়ে পৌঁছে রাস দাওয়াইর নামক জাহাজ ভিড়াবার একটি জায়গায়। সেখান থেকে কয়েকজন বেজার সঙ্গে আমরা মরুভূমির পথে আয়বীব রওয়ানা হয়ে গেলাম। সেখান থেকে এডফু গিয়ে নীলনদের পথে কায়রো এলাম। কায়রোতে দিন কয়েক কাটিয়ে যাত্রা করলাম সিরিয়া। পথে যেতে দ্বিতীয় বারের জন্য গাঁজা, হেবরণ, জেরুজালেম, রামলা আকরে, ত্রিপলী এবং জাবালা হয়ে লাধিকিয়া দেখে এলাম।
লাধিকিয়ায় ছোট একটি জাহাজ পেলাম। জাহাজটি Genoeseদের, তার মালিকের নাম মারতালমিন। সে জাহাজে তুর্কীদের দেশ বলে পরিচিত বেলাদ-আর রোম (আনাতোলিয়া) রওয়ানা হলাম। আগে এ দেশটি তুর্কীদেরই ছিল। পরে এদেশ অধিকার করে মুসলমানেরা কিন্তু তবু এখনও তুর্কমেন মুসলমানদের শাসনাধীনে এখানে অনেক খ্রীষ্টান বসবাস করে। আমাদের দশ রাত্রি সমুদ্রে কাটাতে হয়েছে। সে সময়ে খ্রস্টানরা আমাদের সঙ্গে সদয় ব্যবহার করেছে এবং ভাড়া বাবদ কিছুই গ্রহণ করেনি। দশম দিনে আমরা আলায়া পৌঁছি। আলায়া থেকেই এ প্রদেশের শুরু। এ দেশটি পৃথিবীর অন্যতম উত্তম দেশ। অন্যান্য দেশের ভাল যা-কিছু খোদা এখানে এনে একত্র করে দিয়েছেন। এখানকার লোকেরা সবচেয়ে শান্ত প্রকৃতির। পোষাকে পরিচ্ছদেও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, খাদ্যের ব্যাপারে অত্যন্ত সূক্ষদর্শী। সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে এরা সব চেয়ে দয়াল। এদেশের যেখানেই আমরা গেছি, মুসাফেরখানায় বা গৃহস্থ বাড়ীতে, সেখানেই নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবাই এসে আমাদের কুশলাদি জিজ্ঞাসা করেছে। এখানকার নারীরা নেকাব ব্যবহার করে না। যখন আমরা চলে এলাম তখন ঠিক আত্মীয় পরিজনের মতই আমাদের বিদায় দিল, নারীদের চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠল। সপ্তাহে মাত্র একবার তারা রুটী তৈরি করে। যে দিন রুটী তৈরি হত লোকেরা সেদিন গরম রুটী আমাদের দিয়ে বলত, “বাড়ীর বিবিরা আপনাদের উপহার পাঠিয়েছেন এবং দোয়া করতে বলেছেন।” এখানকার সমস্ত বাসিন্দাই গোঁড়া সুন্নী মতাবলম্বী কিন্তু এরা ভাঙ খায় এবং তা অনিষ্টকর মনে করে না।
