সমুদ্রোপকূলে আলেয়া একটি বড় শহর। এ শহরের অধিবাসীরা তুর্কমেন। কায়রো, আলেকজেন্দ্রিয়া, সিরয়া থেকে সওদাগরের এ শহরে যাতায়াত করে। এ জেলায় যথেষ্ট কাঠ পাওয়া যায়। এখান থেকে আলেকজান্দ্রিয়া ও ডামিয়েট্টায় কাঠ চালান হয়ে যায়। সেখান থেকে বহন করে নেওয়া হয় মিসরের অন্যান্য শহরে। এখানে সুলতান আলাউদ্দিনের দ্বারা নির্মিত ইট প্রসিদ্ধ দূর্গ আছে। শহরের কাজী ঘোড়ায় চড়ে আমাকে আলেয়ার সুলতান ইউসুফ বেকের সঙ্গে দেখা করতে নিয়ে গেলেন। সুলতানের। পিতার নাম ছিল কারামান। এখানকার লোকদের ভাষায় বেক অর্থ রাজা। তিনি শহর থেকে দশ মাইল দূরে বাস করেন। আমরা গিয়ে দেখলাম, তিনি সমুদ্র পারে একটি। টিলার উপর বসে আছেন, নীচে বসে আছেন আমীর ও উজিরগণ। সুলতানের ডাইনে ও বামে রয়েছে সৈনিকরা। তিনি তার চুলে কাল রং দিয়েছেন। আমি তাকে অভিবাদন। করলাম এবং আমার আগমনের কারণ সম্বন্ধে তিনি যে সব প্রশ্ন করলেন তার জবাব। দিলাম। আমি চলে আসার পর তিনি আমাকে কিছু অর্থ উপহার পাঠিয়েছিলেন।
আলেয়া থেকে আমরা এলাম অতি সুদৃশ্য শহর আস্তালিয়া (আদালিয়া)৩। শহরটি আয়তনে বিশাল। কিন্তু তা হলেও এমন আকর্ষণীয় শহর অন্যত্র দেখা যায় না। শহরের লোকসংখ্যা যথেষ্ট হলেও উত্তমরূপে সজ্জিত। এখানে প্রত্যেক সম্প্রদায়ের লোকদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চল বা মহল্লা রয়েছে। শহরের খৃষ্টান অধিবাসীরা প্রাচীরবেষ্টিত মিনা (বন্দর) নামক একটি মহল্লায় বাস করে। রাত্রে এবং শুক্রবার নামাজের ৪ সময় প্রাচীরের প্রবেশদ্বার ভেতর থেকে বন্ধ করে রাখা হয়। এ শহরের আদি বাসিন্দা গ্রীকরাও পৃথক একটি মহল্লায় বাস করে, ইহুদীরা অপর একটিতে। সুলতান ও তার বিভিন্ন কর্মচারীরাও পৃথক একটি মহল্লায় বাস করেন। প্রত্যেক মহল্লাই প্রাচীরবেষ্টিত। বাকি মুসলমান অধিবাসীরা শহরের কেন্দ্রস্থলে বাস করে। সমস্ত শহর ও উল্লিখিত মহল্লাগুলির চতুর্দিক বেষ্টন করে আরও একটি বৃহৎ প্রাচীর আছে। এখানকার ফলের বাগানগুলিতে উক্তৃষ্ট শ্রেণীর এক প্রকার খুবানী বা অ্যাপ্রিকট পাওয়া যায়। স্থানীয় লোকদের কাছে তা কামালউদ্দীন নামে পরিচিত। এ ফলের শাষের ভেতরে মিষ্ট বাদাম পাওয়া যায়। শুষ্ক খুবানী এখান থেকে মিশরে চালান হয়ে যায়। মিশরে এ ফলের যথেষ্ট কদর।
আমরা এখানকার কলেজের মসজিদে ছিলাম। কলেজের তখনকার অধ্যক্ষের নাম ছিল শেখ শিহাবউদ্দীন আল হামাবী। আনাতোলিয়ার প্রতি জেলায়, শহরে ও গ্রামে যে সব তুর্কমেন আছে, তাদের ভেতর সর্বত্রই আখিয়া (Akhiya) বা ‘যুব ভ্রাতৃত্ব’ (Young Brotherhood) নামক একটি প্রতিষ্ঠানের সভ্য দেখা যায়। মেহমানদের আদর আপ্যায়ন করতে সদাই ব্য, এদের মত এমন সম্প্রদায় আর কোথাও দেখা যায় না। মেহমানদের কাছে এরা যথাসম্ভব খাবার হাজির করে, অন্যের অভাব দূর করে, অন্যায় অত্যাচার দমন করে এবং পুলিসের অত্যাচারী চরদের বা তাদের সঙ্গে যে সব। দুষ্কৃতকারী যোগদান করে, তাদের হত্যা করে। যুবভাই বা স্থানীয় লোকদের ভাষায় আখি নির্বাচিত হয় সমব্যবসায়ী সকলের ভোটে, অবিবাহিত লোকদের দ্বারা অথবা কঠোর সংযমী ধর্মপরায়ণ কোন ব্যক্তি দ্বারা। নির্বাচিত যুবই স্ব-সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব। করে। এই প্রতিষ্ঠান ফতুয়া’ (বা Order of youth) নামেও পরিচিত। নেতা একটি মুসাফেরখানা প্রতিষ্ঠা করেন এবং তাতে কম্বল, বাতি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিষ এনে দেন। প্রতিষ্ঠানের সভ্যরা সারাদিন নিজ-নিজ জীবিকার জন্য উপার্জন করে, দিনের শেষে বিকালে বা উপার্জন করে সবই এনে দেয় নেতার কাছে। এভাবে যে অর্থ সঞ্চিত হয় তা দিয়ে ফল, খাদ্য এবং মুসাফেরখানার অন্যান্য দরকারী জিনিষ ক্রয় করা হয়। সেদিন যদি কোন মুসাফের শহরে আসে তবে তাকে মুসাফেরখানায় রেখে ঐ দিনের সংগৃহিত খাদ্য দেওয়া হয়। এভাবে যতদিন খুশী সে সেখানে থাকতে পারে। যদি কোনদিন কোন মুসাফের না আসে তবে নিজেরা একত্র হয়ে সে সব খাবার খায় এবং খাওয়ার পরে নৃত্য-গীত-বাদ্যের দ্বারা আমোদ প্রমোদ করে। পরের দিন আবার যে যার কাজে চলে যায় এবং শেষ বেলায় উপার্জিত অর্থ এনে নেতার কাছে যথারীতি জমা দেয়। প্রতিষ্ঠানের সভ্যদের বলা হয় ফিতায়ানা (Fityan) Youth)। নেতাকে বলা হয় ‘আখি’৫ আগেই তা বলেছি।
আমাদের আন্তালিয়ায় পৌঁছবার পরের দিন এমনি একটি যুবক শেখ শিহাবউদ্দিনের কাছে এসে তুর্কী ভাষায় কথাবার্তা বল্লেন। আমি তখন তার কথা বুঝতে পারিনি। লোকটির পরিধানে ছিল পুরাতন কাপড়, মাথায়ও একটি টুপি ছিল। শেখ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “এ লোকটি কি বলছে বুঝতে পারলে?”
আমি বল্লাম, “না, কিছুই বুঝতে পারলাম না।”
শেখ তখন বললেন, “তোমাকে এবং তোমার দলের আর সবাইকে তার ওখানে খাওয়ার দাওয়াত করতে এসেছে।”
আমি মনে মনে বিস্মিত হলাম কিন্তু মুখে বল্লাম, “বেশ তো।”
লোকটি চলে গেলে শেখকে বললাম, “লোকটি গরীব। আমাদের খাওয়াতে গেলে তার কষ্ট হবে। লোকটির উপর আমাদের বোঝা চাপাতে চাই না।”
শেখ হেসে বললেন, “সে যুব ভ্রাতৃত্বের একজন শেখ। মূচির কাজ করে কিন্তু খুব দয়ালু। তার দলে রয়েছে বিভিন্ন ব্যবসায়ে লিপ্ত প্রায় দু’শ লোক। তারা একে নেতা নির্বাচিত করে একটি মুসাফেরখানা তৈরী করেছে। সেখানে মুসাফেরদের খাওয়ানো হয়। সারা দিনে এরা যা উপায় করে রাত্রে তাই খরচ করে।”
