অতঃপর আমরা শেখ আবু দুলাকের বাসস্থান খুজুবাল২৫ শহরে এসে পৌঁছলাম। এ শেখের সঙ্গে দেখা করতেই আমরা এসেছি। আমরা তার ফুসাফেরখানায় রইলাম। তিনি আমার প্রতি অত্যন্ত সদয় ব্যবহার করেছেন এবং তাঁর একটি পুত্রের দ্বারা আমার খাবার পাঠিয়ে দিতেন। সেখান থেকে আমরা এলাম কায়েস শহরে যার অপর নাম সিরাফ ২৬। সিরাফের বাসিন্দারা সত্বংশজাত পারশী। এদের ভেতর একদল আরবীও আছে। তারা পানির নীচে থেকে মুক্তা সংগ্রহ করে। সিরাফ থেকে বাহরায়েন পর্যন্ত নদীর মত বিস্তীর্ণ এ শান্ত উপসাগরে মুক্তা সংগ্রহের কাজ চলে। এপ্রিল ও মে মাসে এ অঞ্চলে ডুবুরী ফারস, বাহরায়েন ও কাদিফ থেকে সওদাগরদের নিয়ে অনেক নৌকা আসে। ডুব দেবার আগে ডুবুরীরা কচ্ছপের খোলসে তৈরী মুখোশ পরে এবং নাকেও কচ্ছপের খোলসের তৈরী ক্লিপ লাগায়। তারপরে একগাছি দড়ি কোমরে বেঁধে ডুব দেয়। পানির নীচে ডুবে থাকার শক্তি তাদের সবার সমান নয়। তাদের মধ্যে কেউ, কেউ এক ঘন্টা বা দুঘন্টা অবধি পানির নীচে থাকতে পারে।২৭ সমুদ্রের তলায় পৌঁছে ডবুরী দেখতে পায় ছোট-ছোট টুকরা পাথরের ফাঁকে বালির উপর ঝিনুক পড়ে আছে। তারপর সে ঝিনুকগুলি কুড়িয়ে অথবা সঙ্গে থাকা ছুরি দিয়ে ছাড়িয়ে গলায় ঝুলানো চামড়ার থলেতে রাখে। যখন তার নিঃশ্বাস শেষ হয়ে আসে তখন সে দড়িতে টান দেয়। দড়িতে টান পড়লেই উপরে যারা আছে তারা দড়ি টেনে ডুবুরীকে নৌকায় তুলে আনে। তার থেকে তখন থলেটি নিয়ে ঝিনুকগুলি একে-একে খোলা হয়। ঝিনুকের খোলের ভেতর মাংস আছে। ছুরি দিয়ে মাংস কাটলে তা বাতাসের সংস্পর্শে এসে মুজায় পরিণত হয়। তখন ছোট বড় নানা আকারের মুক্তা একত্র সংগ্রহ করে সুলতানকে। দেওয়া হয় তার প্রাপ্য এক পঞ্চমাংশ এবং বাকিটা কিনে নেয় নৌকায় সওদাগরেরা। সওদাগরদের অধিকাংশই ডুবুরীদের পাওনাদার। তারা প্রাপ্যের পরিবর্তে মুক্তা নিয়ে যায়।
সিরাফ থেকে আমরা বাহ্রায়েন শহরে এলাম। সুন্দর ও বড় শহর বাহ্রায়েনে বাগান, গাছগাছড়া ও খাল আছে। এখানে পানি সহজলভ্য। হাত দিয়ে মাটি খুঁড়লেই এখানে পানি পাওয়া যায়।২৮ স্থানটি বালুকাময় এবং অত্যন্ত গরম। অনেক সময় বালি বাসস্থান অবধি বিস্তার লাভ করে। বাহরায়েন ছেড়ে আমরা পৌঁছি আল-কুদায়েফ শহরে(কাদিফ) এ সুন্দর বড় শহরে গোঁড়া শিয়া সম্প্রদায়ের আরবরা বাস করে। নিজেদের শিয়া বলে জাহির করতে তারা কাউকে ভয় করে না।
অতঃপর আমরা হাজার শহরে এলাম। এখন হাজারকে বলা হয় আলহা২৯। একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে, “হাজারে খেজুর বয়ে আনা। কারণ, অন্য কোন জেলার চেয়ে এখানে অনেক বেশী খেজুর আছে। এমন কি এখানকার লোকেরা পত্তকেও খেজুর খেতে দেয়। হাজার থেকে আমরা জামামা শহরে পৌঁছি। তারপর জামামার শাসন কর্তার সহযাত্রী হয়ে মাশরিফ গিয়ে হজব্রত পালন করি। সেটা ছিল ১৩৩২ খ্রষ্টাব্দে। সে বছরই মিসরের সুলতান আল-মালীক আন্-নাসির তার শেষ হজ পালন করেন। মক্কা ও মদিনার উভয় দরগায় তিনি সে বছর যথেষ্ট দান খয়রাত করেন এবং দরগার অধিবাসীদেরও উপহার দেন। এ যাত্রাতেই তিনি বিষপ্রয়োগে হত্যা করেন নিজের পুত্র আমীর আহমদকে এবং নিজের প্রধান আমীর বেকতিমারকে। সুলতান শুনেছিলেন, এরা তাকে হত্যা করে মসনদ দখলের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছে।
টিকা
পরিচ্ছেদ ৩
১। রাস দাওয়াইর, এর অর্থ বলা হয় “ঘূর্ণীবাত্যার তন্তরীপ” (কিম্বা ঘূর্ণীস্রোত)–কিন্তু আমি কোনো গ্রন্থে এর উল্লেখ দেখিনি। এটা সেই অগ্রভৃমি ছাড়া আর কিছু নয় যাকে এখন বলা হয় রাস্ রইয়া (২০ উত্তরে)-এবং খুব সম্ভব এ নাম ভুল করে লেখা হয়েছে।
২। হালি সঠিক ভাবে ‘হ্যালি (ব্যঞ্জন বর্ণের ওয়াই যুক্ত) ইয়াকুবের পুত্র। এটা ছিল সানা থেকে মক্কা যাওয়ার পথে একটি বড় শহর প্রায় তিরিশ মাইল ভিতরে। কুনফুদার চল্লিশ মাইল দক্ষিণ পূর্বে একটি জেলার মধ্যে যেখানে বছরে তিন ফসল তোলার যোগ্য যথেষ্ট উর্বর ভূমি রয়েছে।
হালির বন্দর জেলার মধ্যে একটি আশ্রিত নোঙ্গর স্থান। এখন একে বলা হয় আসির-১৮.৩৬ উত্তরে ৪১.১৯ পূর্বে অবস্থিত। সে সময়ে হালি ছিল ইয়েমেনের সুলতানের অধীনে। (হামদানী ১৮৮, রেড়হাউজ রাজত্বের প্রথম খন্ড, ৩০৭; ভূমির খণ্ড, ১৬৯; আরাবিয়ার হ্যান্ড বুক ১৩৬, ১৪৪)।
৩। সারজা নামের একটি স্থান সান-মক্কা পথের একটি বিশ্রাম স্থান-হালির দশ স্টেশন পূর্বের (হামদানী ১৮৮), কিন্তু ইব্নে বতুতার গন্তব্য বন্দর ছিল সারজা, লুহাইয়ের নিকটবর্তী একটি নোঙ্গর স্থান (ট্রাসিয়াল ওমানের সারজা থেকে পৃথক)। (কালকাশান্দি পঞ্চম খণ্ড, রেডহাউজ তৃতীয় খণ্ড)।
৪। জাবিদ ছিল সুলতানের শীতকালীন আবাস এবং তাইজ গ্রীষ্মকালের রাজধানী। সমুদ্র। উপকূল থেকে জাবিদের দূরত্ব পনেরো আরবী মাইল, আরবী গ্রন্থকারগণ একে বলেছেন ঘালাফিক-এর বন্দর ছিল আল-অহোয়াব (মুদ্রিত গ্রন্থের আল আবোয়াব নয়)। (কালকাশান্দি পঞ্চম খণ্ড, ৯-১০; রেড় হাউস ৩য়, ১৪৯)।
৫। সাবুত আন্-নখল, আক্ষরিকভাবে “পাম ষ্টার-ডে জাবিদের সামাজিক জীবনের একটি সুপরিচিত অনুষ্ঠান। রেড়হাউজের মতে “এটা ছিল স্থানীয় সাধারণের শনি-দেবতার উৎসব, সম্ভবতঃ এর উদ্ভব ইসলাম-পূর্বের জড়-উপাসকদের কাল থেকে।
