আমি অতঃপর হরমুজ দেশে এলাম। হরমুজ নামে সমুদ্রের তীরে একটি শহর আছে। এ শহর মুর্গিস্তান নামেও পরিচিত। শহরের উল্টা দিকে সমুদ্রের নয় মাইল ভিতরে একটি দ্বীপ আছে। দ্বীপটির নাম নতুন হরমুজ।২০ এ দ্বীপে যে শহরটি আছে তার নাম জারাওন। শহরটি যেমন বড়, তেমনি সুন্দর। বাজারগুলিও কর্মব্যস্ত। কারণ এ বন্দর থেকেই ভারত ও সিন্ধু থেকে আমদানীকৃত পণ্যদ্রব্য উভয় ইরাক, ফারস ও খোরাসানে চালান দেওয়া হয়। দ্বীপটি লোনা এবং দ্বীপের বাসিন্দারা বসরা থেকে আমদানী করা মাছ ও খেজুর খেয়ে জীবনধারণ করে। এখানকার লোকেরা নিজেদের ভাষায় বলে, “খোরমা ওয়ামাহি সুতি পাদশাহী” অর্থাৎ খেজুর ও মাছ শাহী খাদ্য। এ দ্বীপে পানি একটি বিশেষ মূল্যবান বস্তু। শহর থেকে দূরে কুপ ও বৃষ্টির পানি জমিয়ে রাখবার জন্য চৌবাচ্চা আছে। লোকেরা সেখানে গিয়ে মশক ভর্তি করে সমুদ্রের তীরে আনে এবং তারপর নৌকার সাহায্যে দ্বীপে আনে। আমি একটি আশ্চর্যজনক জিনিষ এখানে দেখলাম। বড় মসজিদের দরজায় বিশাল একটি মাছের মাথা ফেলে রেখে যার আকার ছোটোখাটো একটি পাহাড়ের টিলার সমান। তার এক একটি চোখের কোটর ঘরের দরজার মত। লোকেদের দেখা যায় তার এক চক্ষু দিয়ে ভেতরে ঢুকে আরেক চক্ষু দিয়ে বেরিয়ে আসে।
হরমুজের সুলতান কুতুবউদ্দিন তাহামতান একজন অতিশয় দয়ালু ও প্রকৃতির শাসনকর্তা। যে সব ধর্মশাস্ত্রজ্ঞ বা ধর্মপরায়ণ লোক কিংবা শরিফ এখানে আসেন। তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে দেখা করে হক আদায় করা তার অভ্যাস। আমরা তাকে গিয়ে পেলাম বিদ্রোহী ভ্রাতুস্পুত্রদের সঙ্গে যুদ্ধরত অবস্থায়। সেখানে ষোলদিন কাটিয়ে ফিরে আসবার সময় আমার এক সঙ্গীকে বললাম, “সুলতানের সঙ্গে একটি বার দেখা না করে কি করে চলে যাই। কাজেই আমরা উজিরের সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি আমার হাত ধরে প্রাসাদে নিয়ে হাজির করলেন। সেখানে ময়লা জামা কাপড় গায়ে, মাথায় পাগড়ী ও কটিবন্ধে রুমাল সহ এক বৃদ্ধ বসে আছেন দেখলাম। উজির তাকে সালাম করলেন। উজিরের দেখাদেখি আমিও তাকে সুলতান বলে না চিনেই সালাম করলাম। তারপর পরিচিত একজন লোক পাশে দাঁড়িয়ে আছে দেখে আমি তার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলাম। পরে উজির আমার ভুল ভেঙ্গে দিলে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম ও ত্রুটি স্বীকার করে ক্ষমা চাইলাম। সুলতান তখন উঠে প্রাসাদের ভেতরে চলে গেলেন। উজির ও অপরাপর সভাসদেরাও তাঁর সঙ্গে গেলেন। তৎপর আমিও ভেতরে প্রবেশ করে দেখলাম, তিনি সেই জীর্ণমলিন পোষাক নিয়েই মসনদে বসে আছেন। তিনি আমার কুশলাদি জিজ্ঞাসা করলেন। যে-সব দেশ সফর করেছি, রাজারাজড়াদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি তাদের সম্বন্ধে আলাপ আলোচনা করলেন। তারপর খাওয়ার পরে তিনি উঠে গেলে আমরা বিদায় নিয়ে চলে এলাম।
আমরা হরমুজ থেকে যাত্রা করলাম খুজুবাল শহরে একজন তাপসের সঙ্গে দেখা করতে। প্রণালীটি পার হয়ে গিয়ে আমাদের বাহন ভাড়া করতে হল তুর্কমেনদের কাছ থেকে। এসব তুর্কমেন এখানকারই বাসিন্দা। এ অঞ্চলে এদের সঙ্গে ছাড়া সফর করা সম্ভব নয়। কারণ এরা খুব সাহসী এবং সমস্ত পথঘাট এদের জানা আছে। এখানে চারদিনের পথ অবধি বিস্তৃত একটি মরুভূমি আছে। সে মরুভূমিতে আরবরা বিচরণ করে এবং জুন ও জুলাই মাসে মারাত্মক সাইমুম’ এ অঞ্চল দিয়ে বয়ে যায়। সাইমুমের কবলে একবার পড়লে ধ্বংস ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। শুনেছি এ বিষাক্ত বাতাসের কবলে পড়ে যে প্রাণ হারায় তার আত্মীয় বন্ধুরা তার দাফন করার জন্য গোসল করাতে গেলে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আলগা হয়ে যায়।২১ সারা রাস্তায়ই এভাবে মৃত্যুমুখে পতিত লোকদের কবর দেখতে পাওয়া যায়। আমরা রাত্রে সফর করতাম এবং সূর্যোদয় থেকে বিকেল অবধি বিশ্রাম করতাম গাছের ছায়ায়। এ মরুভূমিটির বুকেই কুখ্যাত দস্যু
জামাল আল-লুক লুটপাট করে বেড়াত। তার অধীনে একদল আরবী ও পারশী অশ্বারোহী দস্যু ছিল। লুষ্ঠিত টাকার সাহায্যে সে মুসাফেরখানা স্থাপন করত ও মুসাফেরদের অর্থ সাহায্য করত। শুনা যায়, যারা যাকাত আদায় করে না তাদের ছাড়া অপর কারও ধনরত্ন সে অপহরণ করত না। কোন সুলতানই তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা অবলম্বন করতে পারেন নাই। অবশেষে সে নিজেই অনুতপ্ত হয়ে ধর্মের পথে এসে ধর্মজীবনযাপন করতে থাকে। তার কবর এখন একটি তীর্থস্থান বিশেষ।
এ মরুভূমি পার হয়ে আমরা কাওরাস্তানে পৌঁছলাম। ছোট এ শহরে চলমান নহর ও ফলের বাগান আছে কিন্তু ভয়ানক গরম এখানে।২২ এখান থেকে অনুরূপ আরও একটি মরুভূমির উপর দিয়ে আমরা তিন দিন পথ চলে লার ২৩ নামক বড় একটি শহরে এলাম। এখানে সারা বছর পানি পাওয়া যায় এমন নদী ও অনেক ফলের বাগান আছে। আমরা দরবেশদের এক আস্তানায় বাস করতে লাগলাম। তাদের ভেতর একটি চমঙ্কার। রীতি প্রচলিত আছে। তারা প্রতিদিন বিকেলে এসে হাজির হন তাদের এ আস্তানায়; তারপরে বেরিয়ে শহরের ঘরে ঘরে ঘুরে বেড়ান। প্রত্যেক বাড়ী থেকে তাদের একখানা বা দু’খানা করে রুটী দেওয়া হয়। সে রুটী থেকেই এরা মুসাফেরদের খেতে দেয়। গৃহস্থরাও প্রয়োজনের অতিরিক্ত রুটী তৈরি করে এবং দরবেশদের এ রীতি প্রচলিত রাখতে সাহায্যে করে। আর শহরে একজন তুর্কমেন সুলতান বাস করেন। তিনি আমাদের উপহার ২৪ পাঠিয়েছিলেন কিন্তু আমরা তার সঙ্গে দেখা করি নাই।
