মাসিরা থেকে একরাত ও একদিন জাহাজ চালিয়ে আমরা সার নামক একটি বড় গ্রামে এসে জাহাজ ভিড়ালাম। সেখান থেকে একটি ঢালু পাহাড়ের গায়ে নির্মিত কালহাট শহর দেখা যায় এবং খুব নিকটে বলে মনে হয়।১৭ দুপুরের পরেই আমরা। এখানে এসে নোঙর করেছিলাম বলে আমার ইচ্ছে হল পায়ে হেঁটে কালহাট গিয়ে সেখানেই রাত কাটাব। কারণ, জাহাজের লোকদের ব্যবহার আমি পছন্দ করছিলাম না। জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম, বিকেলে মাঝামাঝি সময়ে সেখানে যেয়ে পৌঁছতে পারি। কাজেই একজন খালাসীকে চালক হিসেবে ভাড়া করে নিলাম। খিদর নামক একজন আমাদের সঙ্গে জাহাজের যাত্রী। সে আমার সঙ্গী ছিল। আমার সঙ্গের অন্যান্য লোকদের জাহাজে রেখে গেলাম জিনিষপত্র পাহারা দিয়ে রাখবার জন্য। কথা হল, পরের দিন তারা গিয়ে আমার সঙ্গে মিলিত হবে। আমার কিছু কাপড় জামা সঙ্গে নিলাম। ক্লান্তির হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য সেগুলি বইবার ভার দিয়েছিলাম চালকের উপর। আমি নিজে নিয়েছিলাম একটা বর্শা। এদিকে চালক মতলব করেছে, সেগুলি চুরি করবে। কাজেই সে আমাদের নিয়ে গেল সমুদ্রের একটা বাড়ির দিকে। সেখানে নিয়ে কাপড়সহ খড়ি পার হতে শুরু করল। আমি তখন বললাম, “কাপড়গুলি রেখে তুমি একলা পার হয়ে যাও। আমরা পারি তো যাব, না হলে খুঁজে দেখব পানি কোথায় অগভীর!” তখন সে ফিরে এল। একটু পরে দেখতে পেলাম, কয়েকজন লোক সেখান দিয়ে সাতরে পার হয়ে যাচ্ছে। তখন ঠিক ধারণা হল, চালক আমাদের ডুবিয়ে মেরে কাপড় চোপড় নিয়ে সরে পড়বার মতলব করেছিল। বাইরে আমি নিশ্চিন্তভাব বজায় রেখে ভেতরে ভেতরে হুশিয়ার ছিলাম আর চালককে ভয় দেখাবার জন্য সারাক্ষণ হাতের বর্শাটা উঁচিয়ে রেখে চলছিলাম। তারপর পানিহীন একটা সমতল ভূমিতে পৌঁছে পিপাসায় ভয়ানক কষ্ট পেলাম। অতঃপর খোদার অনুগ্রহে একজন অশ্বারোহী সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন আরও লোকজন সঙ্গে নিয়ে। তারা আমাদের পানি দিয়ে তৃষ্ণা নিবারণ করালেন। তখন শহরের খুব কাছাকাছি এসে গেছি মনে করে আমরা আবার পথ চলতে লাগলাম। কিন্তু আসলে তখনও আমাদের সামনে কতকগুলি নালা ছিল। আরও মাইল কয়েক হাটার পর সন্ধ্যাবেলা চালক আমাদের নিয়ে যেতে চাইল সমুদ্রের উপকূলের দিকে। সে দিকটা পাহাড় সমান্ন বলে সেখানে কোন রাস্তাঘাট ছিল না। আমাদের। পাহাড়ের দিকে নিয়ে যেতে পারলে সে কাপড় জামাগুলি নিয়ে পালাবে এই ছিল তার ইচ্ছা। কিন্তু আমি তখন এ রাস্তা ছেড়ে আর কোন রাস্তায় যেতেই রাজী হলাম না। আমার ভয় ছিল, পথে আমাদের মারধর করবে বলে। কতটা পথ শহরে পৌঁছতে তখনও বাকি আছে তাও আমাদের জানা ছিল না। কাজেই, ঠিক করলাম, রাস্তা ছেড়ে একদিক সরে নিয়ে আমরা ঘুমাব। যদিও আমি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম তবু ক্লান্তির ভাব গোপন করে জামা-কাপড়গুলি নিজের কাছে রেখে বর্শী হাতে বসে রইলাম। আমার সঙ্গীটিও খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। সে ও আমাদের চালক ঘুমিয়ে পড়ল, আমি জেগে রইলাম। আমাদের চালক যখনই একটু নড়ে চড়ে উঠছিল তখনই তার সঙ্গে কথা বলে জানিয়ে দিচ্ছিলাম যে আমি জেগেই আছি। ভোরে আমি চালককে পাঠালাম পানি খুঁজে আনতে। তখন আমার সঙ্গী নিল কাপড়গুলি। তখন আমাদের কয়েকটি ছোট নদী ও নাল পার হতে বাকি ছিল। চালক পানি নিয়ে এল। অবশেষে অত্যন্ত ক্লান্ত অবস্থায়। আমরা এসে কালহাট শহরে পৌঁছলাম। জুতোর ভিতরে আমার পা দুটি এমনভাবে ফুলে উঠেছিল যে, প্রায় রক্ত বেরিয়ে আসছিল। তখন আবার আমাদের চরম দুরবস্থা স্বরূপ দ্বাররক্ষক পীড়াপীড়ি করতে লাগল জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আমাদের শাসনকর্তার কাছে হাজির করবে বলে। ভাগ্যক্রমে শাসনকর্তা ছিলেন খুব দয়ালু লোক। তিনি আমাকে সেখানে রেখে দিলেন। তার সঙ্গে আমি ছয় দিন কাটালাম। পায়ের ক্ষতের জন্য এ কয়দিন আমি চলাফেরা করতে পারিনি।
কালহাট শহরটি সমুদ্রের তীরে। এখানে ভাল বাজার এবং অতি সুদৃশ্য একটি মসজিদ আছে। মসজিদের দেওয়ালগুলি কাশানী টালি দিয়ে সাজানো। মসজিদটি বেশ উচ্চস্থানে অবস্থিত বলে এখান থেকে সারা শহর ও পোতাশ্রয় নজরে পড়ে। এখানে। এসে এমন এক রকম মাছ খেলাম যা আর কোথাও খাইনি। যে কোন রকম মাংসের চাইতে সে মাছ আমার কাছে ভাল লেগেছিল বলে আমি এ মাছ ছাড়া আর কিছুই খেলাম না। মাছগুলি গাছের পাতার সাহায্যে ভেজে ভাতের সঙ্গে খেতে দেয়। ভাতের জন্য সমুদ্র পথে তারা ভারত থেকে চাউল আমদানী করে। এখানকার বাসিন্দারা ব্যবসায়ী। ভারত মহাসাগর দিয়ে যা কিছু আসে তারই উপর এদের জীবিকা। কোন জাহাজ এসে। এ বন্দরে পৌঁছলে তাদের আনন্দের পরিসীমা থাকে না।
অতঃপর সেখান থেকে যাত্রা করে ছয়দিন পর আমরা ওমান দেশে পৌঁছি।১৮ নদী নালা, গাছপালা, বাগান, তালবন এবং অনেক রকম ফল দেখে বুঝা যায় দেশটি উর্বর। এখানকার রাজধানী নাজওয়া পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত। এখানে সুন্দর বাজার ও পরিচ্ছন্ন মসজিদ আছে। এ শহরের বাসিন্দাদের মসজিদের চত্বরে বসে আহার করা অভ্যাস। যার যা খাবার আছে সবাই এখানে এনে একত্র বসে খায় এবং মুসাফেররাও। তাদের সঙ্গে যোগদান করে। এরা খুব সাহসী ও যুদ্ধে পারদশী বলে সর্বক্ষণ নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ লেগেই আছে। এখানকার সুলতান আজ গোত্রের একজন আরবী। তাঁকে বলা হয় আবু মোহাম্মদ। ওমানের শাসনকর্তা মাত্রেরই পদবী আবু মোহাম্মদ।১৯ সুমদ্রোপকূলের বেশীর ভাগ শহর হরমুজ সরকারের শাসনাধীন।
