পান গাছ আঙ্গুরের লতার মত জন্মে। পান গাছের কোন ফল হয় না। শুধু পাতার জন্য এ গাছ জন্মানো হয়। পান সম্বন্ধে ভারতবাসীর ধারণা খুব উচ্চ। কোন লোক বন্ধুর বাড়ী দেখা করতে গেলে বন্ধু যদি তাকে পাঁচটি পান এনে দেয় তবে মনে করতে হবে তাকে সারা দুনিয়া দেওয়া হয়েছে, বিশেষ করে দাতা যদি নবাব বাদশা বা ঐরকম। কেউ হন। সোনা রূপার দানের চেয়ে পানের দান বেশী সম্মানজনক। পান ব্যবহার করা হয় নিম্নে বর্ণিত পদ্ধতিতে। প্রথমে নিতে হয় সুপারী। সুপারী জায়ফলের মত জিনিষ। সুপারীগুলি ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র খত্তাকারে কেটে চিবানো হয়। তারপরে লওয়া হয় পান। পানে। একটু chalk লাগিয়ে সুপারীসহ একত্রে চিবাতে হয়। পান শ্বাসপ্রশ্বাস মিষ্ট করে, হজমের সহায়তা করে, খালি পেটে পানি খাওয়ার দোষ নিবারন করে এবং কর্মশক্তি উদ্দীপিত করে।
আরেকটি আশ্চর্যজনক জিনিষ নারিকেল গাছ। নারিকেল গাছ দেখতে ঠিক খেজুর গাছের মত। নারিকেল মানুষের মাথার সদৃশ। কারণ, নারিকেলের দুটি চোখের এবং একটি মুখের চিহ্ন আছে। তাছাড়া কচি নারিকেলের শাঁস মগজের মত। মাথার চুলের মত নারিকেলের ছিবড়া আছে। ছিবড়া দিয়ে দড়ি তৈরি হয়। তার-কাঁটার পরিবর্তে সেখানে দড়ি ব্যবহৃত হয় জাহাজ তৈরির কাজে। তাছাড়া ছিবড়া দিয়ে কাছিও তৈরি হয়। নারিকেলের গুণের মধ্যে প্রধান হল,-নারিকেল শরীরে শক্তি বাড়ায়, শরীর মোটা করে, এবং মুখমণ্ডলে লালিমা এনে দেয়। কচি নারিকেল কাটলে চমৎকার টাট্রা মিষ্টি পানীয় পাওয়া যায়। পানি পান করার পরে চামচের মত এক টুকরা খোসা নিয়ে শাস চেছে তুলতে হয়। এর স্বাদ ডিমের মত, যে ডিম সিদ্ধ অথচ পুরোপুরি রান্না করা নয়। নারিকেলের শাস পুষ্টিকর। আমি মালদ্বীপে দেড় বছর কাল নারিকেল খেয়ে বাস করেছি। এ ফলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য,তৈল, দুধ ও মধু এর ফল থেকে পাওয়া যায়। মধু বের করা হয় নিম্ন বর্ণিত উপায়ে। নারিকেল গাছের যে বৃন্তে ফল ধরে তা কেটে ফেলা হয় দু’আঙ্গুল পরিমাণ বাকি রেখে। তার সঙ্গে একটি ছোট হাঁড়ি বেঁধে দেওয়া হয়। কাটা বৃন্ত থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় রস ঝরে হাঁড়িতে জমা হয়। ভোরে এ রকম করা হলে বিকেলে একজন লোক দুটি হাঁড়ি নিয়ে গাছে ওঠে। একটি হাঁড়িতে থাকে পানি, অপরটিতে ঢেলে আনা হয় সারাদিনের জমা রস। তারপরে বৃন্তটি ধুয়ে সামান্য একটু কেটে দেওয়া হয়। কেটে দেবার পর আরেকটি হাঁড়ি বেঁধে রাখা হয়। যথেষ্ট পরিমাণে রস জমা না হওয়া অবধি প্রতিদিন ভোরে একই রকম করা হয়। যথেষ্ট রস জমা হলে তা জ্বাল দিয়ে গাঢ় করা হয়। এমনি করে অতি চমৎকার মধু তৈরী হয় এবং ভারত, ইয়েমেন ও চীনের সওদাগরেরা তা কিনে দেশে নিয়ে মিষ্টি তৈরী করে। নারিকেলের (কোরানো) শাস পানিতে ডুবিয়ে রাখলে সেই পানির রঙ ও স্বাদ দুধের মত হয় এবং অন্য খাদ্যের সঙ্গে তা খাওয়া হয়। তৈল তৈরী করতে হলে পাকা নারকেলের শাঁস রৌদ্রে শুকাতে হয়, তারপর কড়াইতে জ্বাল দিয়ে তৈল নিষ্কাষণ করা হয়। এ তৈল দ্বারা বাতি জ্বালানো হয়, রুটীর সঙ্গে খাওয়া হয় এবং মেয়েরা মাথায় ব্যবহার করে।
মাসিরার একজন লোকের হোট একখানা জাহাজে আমরা দাফারি থেকে ওমান যাত্রা করলাম। যাত্রার দ্বিতীয় দিনে আমরা হাসিক১৪ নামক জাহাজ ভিড়বার একটি জায়গায় গিয়ে জাহাজ থেকে নামলাম। হাসিকে প্রধানতঃ আরবীয় মৎস্যজীবিরা বাস করে। এখানে বহু ধূপ গাছ আছে। ধূপ গাছের পাতা সরু সরু। পাতা কেটে দিলে। দুধের মত রস পড়তে থাকে। রস থেকে প্রথমে হয় গঁদ পরে ধূপ। এ বন্দরের বাসিন্দাদের জীবিকা প্রধানতঃ নির্ভর করে মাছের উপর। লুখাম নামক যে মাছ এখানে। ধরা হয় তা অনেকটা ক্ষুদ্রকায় হাঙরের মত। এ সব মাছ ধরার পরে তারা লম্বা করে কেটে রৌদ্রে শুকায় এবং খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে। এখানে এসব মাছের কাঁটা দিয়ে ঘর তৈরী করা হয়। ঘরের চাল তৈরী হয় উটের চামড়া দিয়া।
ছয় দিন পর আমরা এক জনমানবহীন পাখীর দ্বীপে এসে পৌঁছলাম। নোঙ্গর ফেলে আমরা গিয়ে ডাঙ্গায় উঠলাম এবং দেখতে পেলাম অসংখ্য পাখীতে দ্বীপ ছেয়ে আছে। ব্ল্যাকবার্ড’ জাতীয় পাখী কিন্তু আকারে অপেক্ষাকৃত বড়। নাবিকরা কতকগুলি পাখীর ডিম সংগ্রহ করে রান্না করে খেল। তারপর ধরে আনল কতকগুলি পাখী। সেগুলি জবাই।
করেই কেটে রান্না করে ফেলল ১৫। আমার খাদ্য ছিল তখন শুকনো খেজুর আর মাছ। প্রতিদিন সকালে বিকেলে এরা মাছ ধরত। ধরা মাছ রান্না করে এরা সবাইকে সমানভাবে ভাগ করে দিত। মাছ ভাগের বেলা জাহাজের কাপ্তেনকেও বেশী দিত না। আমরা সে বছর হজ পর্ব সমুদ্রের বুকেই পালন করলাম। সে দিনের সারাদিন এবং পরের দিনেরও সূর্যোদয় অবধি সমুদ্র ছিল তরঙ্গসঙ্কুল। আমাদের সামনেই একটি জাহাজডুবি হয় এবং তার একটি লোকমাত্র অনেক কষ্টে সাঁতরে নিজের জীবনরক্ষা করে।
অতঃপর আমরা গেলাম মাসিরা নামক একটি বড় দ্বীপে। এ দ্বীপের অধিবাসীরা সম্পূর্ণভাবে মাছের দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করে।১৬ জাহাজ ভিড়াবার জায়গা দূরে বলে আমরা এ দ্বীপে উঠিনি। তা ছাড়া এ দ্বীপের লোকেরা জবাই না করেই পাখী খায় বলে তাদের প্রতি আমার একটা বীতরাগের ভাবও এসেছিল।
