আমি জিজ্ঞেস করলাম, “শেখ এখন কে?”
তিনি বললেন, “সুলতান।” সুলতানকে তারা এখানে শেখ বলেন।
আমি তখন বললাম, “থাকবার জায়গায় ঠিকঠাক হয়ে গিয়ে দেখা করব তাঁর সঙ্গে।”
তিনি জবাব দিলেন, “কোন শাস্ত্রবিদ, শরিফ বা ধার্মিক কেউ এখানে এলে এখানকার রীতি অনুসারে বাসস্থানে যাবার আগেই দেখা করতে হয় শেখের সঙ্গে।
কাজেই, তার কথা মত শেখের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। বারবেরা সম্প্রদায়ের এ সুলতানের নাম আবু বকর। আরবী জানা সত্ত্বেও তিনি কথা বলেন মাগডিসি ভাষায়। আমরা প্রাসাদে পৌঁছে অন্দরে খবর পাঠালে একজন খোঁজা এল থালায় পান সুপারী নিয়ে। সে আমাকে ও কাজীকে দশটি করে পান ও কিছু সুপারী দিয়ে বাকী সব দিল আমার সঙ্গীদের এবং কাজীর ছাত্রদের। পরে বলল, “আমাদের হুজুর বলেছেন, ইনি থাকবেন ছাত্রদের সঙ্গে।
পরে সে খোঁজা ভূত্যই প্রাসাদ থেকে আমাদের খাবার নিয়ে এল। তার সঙ্গে এল উজির। মেহমানদের দেখাশুনা করবার ভার তার উপর। তিনি বললেন, “আমাদের হুজুর আপনাকে তার শুভেচ্ছা ও অভ্যর্থনা জানিয়েছেন।”
আমরা সেখানে তিন দিন ছিলাম। প্রত্যহ তিন বার করে খাবার দেওয়া হত আমাদের। চতুর্থ দিন ছিল শুক্রবার। সেদিন কাজী ও একজন উজির আমাকে এক প্রস্থ পোশাক এনে দিলেন। অতঃপর আমরা মসজিদে গেলাম এবং সুলতানের পর্দার ৮ আড়ালে থেকে নামাজ আদায় করলাম। শেখ বাইরে এলে আমি তাকে অভিবাদন। জানালাম। তিনিও আমাকে অভ্যর্থনা করলেন। অতঃপর নিজে পাদুকা পরে আমাদেরও আদেশ করলেন আমাদের নিজ নিজ পাদুকা পরে নিতে। পাদুকা পরা হলে আমাদের নিয়ে পায়ে হেঁটে প্রাসাদের দিকে চললেন। বাকি সবাই চলে গেল খালি পায়ে। শেখের মাথার উপরে ধরা হয়েছে রঙ্গীন রেশমের চারটি চাঁদোয়া। প্রতিটি চাঁদোয়ার উপরে একটি করে সোনার পাখী। প্রাসাদের রীতিনীতি পালন করার পর সবাই সালাম করে নিজ নিজ পথে চলে গেল।
সাওয়াহিল দেশে কুওয়া (কিলওয়া, কুইলোয়া) শহরে যাবার উদ্দেশ্যে আমি মাগডাশা থেকে আবার জাহাজে চড়লাম। এ শহরটি জাজ নামক কাফ্রীদের। আমরা মোম্বাসা নামক বড় একটি দ্বীপে এলাম। সাওয়াহিল দেশ ১০ থেকে সমুদ্রপথে এখানে পৌঁছতে দুদিন লাগে। দ্বীপের বাইরে মূল ভূমিতে এ দ্বীপের কোন অংশ নেই। দ্বীপে ফলের গাছ আছে কিন্তু কোন খাদ্যশস্য নেই। খাদ্যশস্য আমদানী করতে হয়। সাওয়াহিল থেকে। এ দ্বীপের বাসিন্দাদের প্রধান খাদ্য কলা ও মাছ। বাসিন্দারা। ধর্মপরায়ণ, সম্মানী এবং সম্প্রকৃতির। শহরে কাঠের সুগঠিত মসজিদ আছে। এ দ্বীপে। আমরা এক রাত্রি কাটালাম। তারপরে যাত্রা করলাম উপকুল শহর কুলওয়ার উদ্দেশ্য। এ শহরের লোকেদের অধিকাংশ জাজ। তাদের গাত্র বর্ণ গাঢ় কৃষ্ণ, মুখে উঁকির চিহ্ন। একজন সওদাগর আমাকে বলেছিলেন, কুওয়া থেকে পনর দিনের পথ দক্ষিণে সুফালা। লিমিদের দেশ জুফি থেকে সুফালায় স্বর্ণরেণু আনা হয়। সুফালা থেকে জুফি এক মাসের পথ ১১। কুওয়া একটি সুন্দর শহর। শহরের সমস্ত ঘরবাড়ী কাঠের তৈরী। কুওয়ার সঙ্গেই নাস্তিক জাদের দেশ বলে কুওয়ার বাসিন্দাদের সর্বক্ষণ যুদ্ধ। বিগ্রহে লিপ্ত থাকতে হয়। আমার সময়ে এখানে বাসিন্দাদের সর্বক্ষণ যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত থাকতে হয়। আমার সময়ে এখানে সুলতান ছিলেন আবুল মুজাফফর হাসান। দান ধ্যানের জন্য তিনি প্রসিদ্ধ ছিলেন। যুদ্ধে জয়লাভের পর যা কিছু পাওয়া যেত, কোরাণের নির্ধারিত নীতি ১২ অনুযায়ী তার একপঞ্চমাংশ তিনি দাঁতব্য কাজের জন্য পৃথক করে রাখতেন। আমি দেখেছি একজন ফকির এসে চাইলে তিনি তার গায়ের। কাপড় দান করে দিলেন সেই ফকিরকে। এ দানশীল ও নীতিপরায়ন সুলতানের। এন্তেকালের পর সুলতান হলেন তার ভাই দাউদ। এসব ব্যাপারে তিনি ছিলেন ভাইয়ের। বিপরিত প্রকৃতির লোক। যখনই কেউ এসে তাঁর কাছে কিছুর আবেদন করত, তিনি বলতেন, “যিনি দিতেন তিনি মরে গেছেন এবং দেবার মত কিছুই রেখে যাননি।”মুসাফেররা তার ওখানে মাসেক থাকবার পর তিনি তাদের যৎকিঞ্চিৎ দিয়ে বিদায় করতেন। তার ফলে তার দরজায় আর কেউ কখনও আসত না।
কুলওয়া থেকে আমরা যাত্রা করি দাফারি (দোফার)। দাফারি ইয়েমেনের একেবারে শেষ প্রান্তে অবস্থিত। এখান থেকে ভাল জাতের ঘোড়া ভারতে রপ্তানী হয়। অনুকূল বাতাসে এখান থেকে ভারতে জাহাজ যেতে একমাস সময় লাগে। এডেন থেকে মরুভূমির মধ্য দিয়া দাফারি আসতে একমাস লাগে। শহরটি লোকালয়হীন স্থানে। অবস্থিত। এখানকার বাজারটি অত্যন্ত নোংরা, কারণ প্রচুর মাছ ও ফল আমদানী হয় এ বাজারে। এখানকার মাছ সামুদ্রিক পোনা জাতীয় এবং অত্যন্ত তৈলাক্ত। একটি আশ্চর্য। ব্যাপার এই, পোনা জাতীয় এ মাছ এখানে পশুর প্রধান খাদ্য। পৃথিবীর আর কোথাও এমন ব্যাপার আমার চোখে পড়ে নাই। বাজারের বেশীর ভাগ বিক্রেতা কাল রঙের বস্ত্র পরিহিতা ক্রীতদাস নারী। এখানকার বাসিন্দারা ভুট্টার চাষ করে এবং গভীর কুপ থেকে তুলে জমিতে পানি সেচন করে। ক্রীতদাসদের কোমরে দড়ি বেঁধে মস্ত বড় বালতির সাহায্য কুপ থেকে সেই পানি তোলা হয়। এদের প্রধান খাদ্য ভাত। সেজন্য চাউল আমদানী করা হয় ভারত থেকে। এখানকার বাসিন্দাদের একমাত্র জীবিকা ব্যবসায়। এখানে কোন জাহাজ এসে ভিড়লে তারা কাপ্তেন, খালাসী থেকে শুরু করে সবাইকে সুলতানের গৃহে নিয়ে যায় এবং তাদের ভোজন করায় তিন দিন অবধি। এমনি করে তারা জাহাজীদের কাছে সুনাম অর্জন করে। আরও একটি আশ্চর্য ব্যাপার এই, এখানকার লোকদের রীতিনীতির সঙ্গে পুরোপুরি মিল আছে উত্তর পশ্চিম আফ্রিকার লোকদের সঙ্গে। শহরের আশেপাশে অনেক ফলের বাগানেই কলা গাছ রয়েছে। এখানকার কলার আকারও বেশ বড়। আমার সাক্ষাতেই একটা কলা ওজন করে দেখা। গেল সেটি বার আউন্স। এখানকার কলা মিষ্টি ও সুস্বাদু। এখানকার লোকেরা পান ও নারিকেলের চাষ করে, যা শুধু ভারতে ও এখানেই দেখা যায়।১৩ আমি এ দুটি জিনিষের উল্লেখ করেছি বলে বিস্তারিত ভাবেই এ সম্বন্ধে বলছি।
