সেখান থেকে আমরা ইয়েমেনের সুলতানের রাজধানী তাইজ পৌঁছি। তাইজ দেশের একটি চমৎকার বড় শহর ৬। কিন্তু এ শহরের বাসিন্দারা স্বেচ্ছাচারী উদ্ধত ও রূঢ় প্রকৃতির লোক। সুলতান যেখানে বাস করে সে শহরের অবস্থা সাধারণতঃ এ রকমই হয়ে থাকে। তাইজ শহরকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ভাগে সুলতানের প্রাসাদ এবং তার সভাসদগণের বাসস্থান; দ্বিতীয় ভাগের নাম উদায়না, সেখানে সৈনিকদের ঘাঁটি; তৃতীয় ভাগে সাধারণ লোকদের বাসস্থানসহ হাটবাজার। ইয়েমেনের সুলতান নাসির উদ্দিন আলী ছিলেন রসুলের বংশধর। দরবারের সময় এবং অভিযানের সময় তিনি বিশেষ জাঁকজমক পছন্দ করেন। আমাদের এখানে আগমনের পরে চতুর্থ দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। সেদিন সুলতানের দরবার বসবার দিন। কাজী আমাকে তার কাছে নিয়ে গেলে আমি তাকে সালাম করলাম। সালামের রীতি অনুসারে প্রথমে তর্জনী দ্বারা মাটি স্পর্শ করে সে তর্জনী মাথায় ঠেকিয়ে বলতে হয় “খোদা শাহানশার হায়াত দারাজ করুক।” কাজীকে সে রকম করতে দেখে আমি তাঁরই অনুসরণ করলে সুলতান আমাকে তার সামনে বসতে বললেন। বসতে বলে আমার। দেশ, আমার দেখা অন্যান্য দেশ ও দেশের সুলতানের সম্বন্ধে আলাপ-আলোচনা। করলেন। উজির সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সুলতান তাকে আমার সঙ্গে সম্মানসূচক ব্যবহারের নির্দেশ দিলেন এবং বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দিতে বললেন। তার মেহমানদারীতে কিছুদিন কাটিয়ে, আমি যাত্রা করলাম প্রাক্তন রাজধানী সানার পথে। ইট ও পলেস্তরা দিয়ে তৈরী সানা জনবহুল শহর। শহরের আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ এবং পানি উত্তম। বৃষ্টি সম্বন্ধে ভারত, ইয়েমেন ও আবিসিনিয়ার আশ্চর্য ব্যাপার এই, এসব জায়গায় বৃষ্টিপাত হয় গ্রীষ্মের সময়, বিশেষ করে সে সময়ের বিকেলবেলা, কাজেই বিদেশী ভ্রমণকারীরা বৃষ্টির ভয়ে দুপুরের দিকেই তাড়াহুড়া করে কাজকর্ম সারতে চেষ্টা করেন। বৃষ্টিপাত সে সব জায়গায় প্রচুর হয় বলে শহরের লোকেরাও তার আগে গৃহে ফিরে আসে। সমস্ত সানা শহরটি পোস্তা বাধানো বলে বৃষ্টি হলেও রাস্তাঘাট ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার হয়ে যায়।
সেখান থেকে আমি ইয়েমেনের সমুদ্রোপকুলের এডেনে এসে হাজির হলাম। এ বন্দরটি পবর্তবেষ্টিত এবং মাত্র একটি দিকে রয়েছে প্রবেশ পথ। এখানে না আছে কোন ফসল বা গাছ-গাছড়া, না আছে পানি। বৃষ্টির পানি ধরবার জন্য অনেক বড়-বড় চৌবাচ্চা রয়েছে এখানে। অনেক সময় আরবরা এখানকার পানি সরবরাহের ব্যবস্থা ছিন্ন করে দেয়। তখন টাকা-পয়সা ও কাপড়ের টুকরার বিনিময়ে পানি সরবরাহের পুনঃ প্রবর্তনের ব্যবস্থা করতে হয়। এখানে অত্যাধিক গরম অনুভূত হয়। এডেন ভারতীয়দের বন্দর এবং কিয়াত (ক্যাম্বে), ফালাম (কুইলন) কালিকট এবং মালাবারের বহু বন্দর থেকে বড়-বড় জাহাজ যাতায়াত করে এ বন্দরে। এখানে ভারতীয় সওদাগরেরা বাস করে, মিসরের অনেক সওদাগরও এখানে রয়েছে। এখানকার সমস্ত বাসিন্দাই হয় সওদাগর, মোটবাহী, নয় তো মৎস্যজীবী। কোন কোন ব্যবসায়ী বিশেষ বিত্তশালী। তাঁদের কেউ-কেউ এত ধনশালী যে একাই সমুদয় সাজসরঞ্জামসহ একটি জাহাজের মালিক। এ নিয়ে সওদাগরদের মধ্যে প্রতিযোগিতা পর্যন্ত চলে। তা সত্ত্বেও তারা ধর্মপরায়ণ, বিনয়ী, সৎ ও সদয় প্রকৃতির লোক। বিদেশীদের প্রতি তাদের ব্যবহার। ভাল, ধার্মিকদের মুক্তহস্তে দান-খয়রাত করেন এবং যাকাতাদি খোদার প্রাপ্য যথারীতি আদায় দেন।
এডেন বন্দরে জাহাজ ধরে চার দিন সমুদ্রপথে চলার পর আমি জায়লা (Zayla) পৌঁছি। বারবেরা নামক কাফ্রী সম্প্রদায়ের লোকদের শহর এটি। জায়গা থেকে দু’মাসের পথ মাগডাশা অবধি বিস্তৃত তাদের এ দেশটি মরুভূমিসঙ্কুল। বড় বাজার সহ জায়লা বেশ বড় শহর কিন্তু পৃথিবীর মধ্যে এ শহরটি সবচেয়ে নোংরা ও জঘন্য দুর্গন্ধময় শহর। তার কারণ এখানে যথেষ্ট মাছ আমদানী হয় এবং এখানকার বাসিন্দারা রাস্তায় উট জবাই করে রক্ত সেখানেই ফেলে রাখে। সমুদ্র তরঙ্গ সঙ্কুল থাকা সত্ত্বেও আমরা শহরের অপরিচ্ছন্নতা এড়াবার জন্য জাহাজে রাত কাটালাম।
জায়লা থেকে সমুদ্রপথে পরদিন জাহাজ চালিয়ে আমরা এলাম মাগডাশা (মাগদি)। মাগডাশা বিস্তৃত একটি শহর। এখানকার বাসিন্দারা ব্যবসায়ী এবং প্রত্যেকে বহু উটের মালিক। শত শত উট এখানে জবাই হয় খাদ্যের জন্য। কোন জাহাজ এসে এখানে ভিড়লে সামবাক নামক ছোট-ছোট নৌকা গিয়ে তার গায়ে লাগে। প্রত্যেক নৌকায় থাকে একদল যুবক, তাদের হাতে ঢাকা দেওয়া খাবারের থালা। জাহাজে যে সব সওদাগরেরা আসে তাদের একজনের হাতে খাবারের থালা দিয়ে বলে “ইনি আমার মেহমান।” এমনি করে সবাই এক এক জনকে মেহমান মেনে নেয়। সওদাগররাও তখন শুধু সেই মেজবানের বাড়ি যায়। যারা পূর্বে এ শহরে এসেছে এবং পূর্ব থেকেই লোকজনের সঙ্গে পরিচিত তারা যেখানে খুশী যেতে পারে। অতঃপর মেজবান সওদাগরের হয়ে তার জিনিসপত্র বেচাকেনা করে দেয়। যদি কেউ কোন জিনিস সওদাগরের কাছ থেকে অত্যন্ত কম দামে কিনে অথবা মেজবানের অনুপস্থিতিতে সওদাগরের কাছে কেউ কিছু বিক্রয় করে তবে সে কেনাবেচা সিদ্ধ হয় না। এ রীতি সওদাগরদের পক্ষে বিশেষ সুবিধাজনক। এ সব যুবকের দল আমাদের জাহাজে উঠলে তাদের একজন এগিয়ে এল আমার দিকে। আমার সঙ্গীরা বললেন, “ইনি সওদাগর নন; একজন ধর্মশাস্ত্রজ্ঞ লোক ইনি।” তা শুনে যুবক তার বন্ধুদের ডেকে বলল, “ইনি কাজীর মেহমান। তাদের দলে কাজীর লোকও ছিল। সে ছুটে গেল কাজীকে খবর দিতে। কাজী তখন সমুদ্রতীরে এলেন তার একদল ছাত্র সঙ্গে নিয়ে। ছাত্রদের একজনকে পাঠিয়ে দিলেন আমার কাছে। আমার দলবল নিয়ে জাহাজ থেকে নেমে গিয়ে তাঁকে। সালাম করলে তিনি বললেন, “বিসমিল্লাহ্ বলে চলুন আমরা শেখকে ছালাম করতে যাই।”
