১৩৩০ খ্রীস্টাব্দের শেষের হজের পরে আমি মক্কা থেকে ইয়েমেন রওয়ানা হলাম। প্রথমে জুন্দা (জেদ্দা) এসে পৌঁছলাম। জেদ্দা সমুদ্রোপকুলে পারশ্যবাসীদের দ্বারা তৈরী একটি প্রাচীন শহর। এখানে এসে একটি আশ্চর্য ঘটনা ঘটল। আমার অপরিচিত একজন অন্ধলোক যে আমাকে কখনও দেখে নাই, আমার নাম ধরে ডেকে হাত ধরে বলল, “আংটীটি কোথায়?”
আমার মক্কা শরীফ ত্যাগের পর একজন ফকির এসে ভিক্ষা চাইল। তখন আমার কাছে দেবার মত কিছুই না-থাকায় আংটীটি খুলে দিয়েছিলাম। আমি অন্ধ লোকটিকে তাই খুলে বলাম। সে তখন বলল, “ফিরে গিয়ে সেটির খোঁজ করো, কারণ, তার মধ্যে যে নাম লেখা আছে তাতে বিশেষ গোপন ব্যাপার আছে।”
আমি তাজ্জব হয়ে গেলাম তার এ কথা শুনে এবং তার এ রকম অলৌকিক জ্ঞান দেখে। আল্লাহ্ জানেন এ লোকটি কে ছিল। শুক্রবার জুমার নামাজের সময় মুয়াজ্জিন এসে শহরের বাসিন্দা মজিদে কতজন হাজির হয়েছে গণনা করে দেখে। তারা সংখ্যায়। যদি চল্লিশ জন হয় তবে ইমাম জুমার নামাজ পড়ান। আর শহরের বাসিন্দাদের সংখ্যা যদি চল্লিশের কম হয় তবে সেদিন তিনি পড়ান চার রাকাত জহুরের নামাজ। বিদেশী মুসাফেরের সংখ্যা সেদিন যত বেশীই হউক, এ গণনার সময় তাদের ধরা হয় না।
আমরা এখানে এসে একটি নৌকায় উঠলাম। নৌকাকে এখানে বলা হয় জলবা। শরিফ মনসুর আরেকটি নৌকায় উঠে আমাকেও তাতে উঠতে বললেন কিন্তু আমি তাতে অস্বীকার করলাম। তাঁর জবায় উঠান হয়েছিল অনেকগুলি উট। আমি কখনও সমুদ্রে সফর করিনি বলে তার জবায় উঠতে ভয় হয়েছিল। আমরা অনুকুল বাতাসে দু’দিন চলবার পরে বাতাস পালটে গেল। তখন আমাদের নৌকা পথ ছেড়ে দূরে যেতে আরম্ভ করল। ঢেউ নৌকায় উঠে আমাদের গায়ে পড়তে লাগল, আরোহীরা ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল। আয়ধাব ও সাওয়াকিনের মাঝামাঝি রাস দাওয়াইর’ নাম নৌকা ভিড়াবার উপযোগী একটি জায়গায় না-আসা অবধি আমাদের এ আতঙ্ক বজায় ছিল। আমরা এখানে তীরে উঠে নল খাগড়া দিয়ে মসজিদের আকারে তৈরী একটি ঘর দেখতে পেলাম। তার ভিতর উটপাখীর ডিমের খোলা ভরতি পানি। আমরা সে পানি এবং তা। দিয়ে রান্নাও করলাম।
একদল বেজা এল আমাদের কাছে। আমরা উট ভাড়া করলাম তাদের কাছ থেকে। যে জায়গা দিয়ে আমাদের পথ সেখানে ঘোট ঘোট এক রকম হরিণ আছে প্রচুর। বেজারা সে সব হরিণ খায় না বলে মানুষ দেখেও তারা ভয় পেয়ে পালায় না। দুদিন পথ চলার পর আমরা সাওয়াকিন (সুয়াকিন) নামক দ্বীপে এসে পৌঁছলাম। সদ্ৰকুল থেকে ছ’মাইল দূরে অবস্থিত এটি একটি বড় দ্বীপ কিন্তু এখানে না আছে পানি না আছে কোন ফসল গাছ-গাছড়া। নৌকা বোঝাই করে এখানে পানি আনা হয়। আর বৃষ্টির পানি সংগ্রহের জন্য রয়েছে বড়-বড় চৌবাচ্চা। উটপাখীর, হরিণের ও বন্য গাধার গোত এখানে পাওয়া যায়। আর পাওয়া যায় অনেক ছাগল, দুধ ও মাখন। সে সব মক্কায় চালান হয়ে যায়। খাদ্যশস্য বলতে এখানে আছে জ্বরজুর নামে মোটা দানাওয়ালা এক রকম ভূট্টা বা জোয়ার। তাও মক্কায় রপ্তানী হয়ে যায়। আমি সাওয়াকিনে থাকাকালে সেখানকার সুলতান ছিলেন মক্কার আমীরের পুত্র শরীফ জায়েদ।
সাওয়াকিন থেকে আমরা জাহাজে উঠলাম ইয়েমেন যাওয়ার উদ্দেশ্যে। এ পথে সমুদ্রে অনেক পাহাড় আছে বলে রাত্রে জাহাজ চালান হয় না। সন্ধ্যা হলেই কোন জায়গায় থেমে আবার যাত্রা শুরু হয় ভোরে। জাহাজের কাপ্তেন সর্বক্ষণ সামনে দাঁড়িয়ে থেকে হাল ধরে যে থাকে তাকে হুঁশিয়ার করে দেয় পাহাড় সম্বন্ধে। সাওয়াকিন থেকে যাত্রার ছ’দিন পর আমরা হালি ২ শহরে পৌঁছি। আরবের দু’টি গোত্রের লোকেরা প্রধানতঃ বাস করে এ জনবহুল বড় শহরে। সুলতান একজন সপ্রকৃতির লোক। তিনি শিক্ষিত এবং একজন কবি। মক্কা থেকে জেদ্দা পর্যন্ত পথে আমি তার সঙ্গী ছিলাম। তার শহরে এসে পৌঁছলে তিনি আমার প্রতি অত্যন্ত সদয় ব্যবহার করেন এবং কয়েকদিন অবধি আমার মেহমানদারী করেন। আমি তারই একটি জাহাজে চড়ে সারজা এসে পৌঁছলাম। সারজায় ইয়েমেনের সওদাগরেরা বাস করে। তারা দয়ালু ও মুক্তহস্ত। মুসাফেরদের খেতে দেয় এবং হজযাত্রীদের সাহায্য করে নিজেদের জাহাজ দিয়ে। গন্তব্যস্থানে পৌঁছে দিয়ে এবং অর্থ সাহায্যে করে। আমরা মাত্র একটি রাত্রি কাটালাম। সারজা শহরে তাদের মেহমান হিসাবে। তারপরে গেলাম আল-আহওয়াব এবং সেখান থেকে জাবিদ ৪।
জাবিদ সানা থেকে এক শ বিশ মাইল। সানার পরে জাবিদই ইয়েমেনের সবচেয়ে বড় ও সমৃদ্ধিশালী শহর। বহু খাল পরিবেষ্টিত অনেক ফলের বাগান আছে এ শহরের আশেপাশে। এখানে কলা ও ঐ জাতীয় আরও ফলাদি জন্মে। শহরটি দেশের অভ্যন্তরে অবস্থিত সমুদ্রের উকুলে নয় এবং এটি দেশের একটি প্রধান শহর। শহরটি যেমন বড় তেমনি জনবহুল। এর চারদিকে তাল বৃক্ষের কুঞ্জ, মধ্যে মধ্যে চলমান খাল। এক কথায় জাবিদ ইয়েমেনের সবচেয়ে সুদৃশ্য ও মনোরম শহর। এখানকার বাসিন্দারাও ব্যবহারে দ্র ন্ত্র এবং সৎ ও সুদর্শন। বিষেশতঃ এখানকার নারীরা পরমা সুন্দরী। এ শহরের লোকদের মধ্যে সুবুত-আন্ নখল নামে প্রসিদ্ধ আনন্দ ভোজের রীতি প্রচলিত আছে। যখন খেজুর রঙ ধরে ও পেকে উঠে তখন প্রতি শনিবার এরা খেজুর বাগানে গিয়ে জমায়েত হয়। শহরের স্থায়ী বাসিন্দাই হউক বা বিদেশী হউক শহরে তখন একজন লোকও থাকে না। গীতবাদ্যের দল সঙ্গে যায় তাদের আনন্দদানের জন্য, ব্যবসায়ীরা যায় তাদের ফল-ফলাদি ও মিষ্টির পশরা নিয়া। নারীরা সেখানে যায় উটের পিঠে আরোহণ করে। পরমা সুন্দরী হয়েও এখানকার নারীরা নীতিপরায়ণ ও বহু সদৃণ সম্পন্না। বিদেশীদের প্রতিও তারা অনুরাগিণী এবং আমাদের দেশের নারীদের মত বিদেশীদের সঙ্গে বিবাহে তারা অসম্মতি প্রকাশ করে না। যখন কোন স্বামী বিদেশে সফরে যায় স্ত্রী তখন তাকে বিদায় সম্ভাষণ দিয়ে এগিয়ে দিয়ে আসে। শিশু থাকলে স্বামীর অনুপস্থিতিকালে মা-ই তার পালন ও রক্ষণাবেক্ষণের ভার নেয়। স্বামী বিদেশে গেলে স্ত্রী তার নিজের খোরপোশ বাবদ কিছুই দাবী করে না। যখন সে স্বামীর সঙ্গে বাস করে তখনও অতি অল্পেই সন্তুষ্ট থাকে। কিন্তু এখানকার নারীরা কখনও নিজের শহর ছেড়ে কোনক্রমেই অন্যত্র যেতে রাজী হয় না।
