তাব্রিজে আমরা মাত্র এক রাত্রি কাটালাম। পরের দিন সুলতান আমীরকে ফিরে যাবার নির্দেশ পাঠালেন। কাজেই এখানকার কোন জ্ঞানীগুণী ব্যক্তির সঙ্গে দেখা হবার আগেই ফিরে আসতে হল। ফিরে আসবার পরে আমীর আমার বিষয়ে সুলতানকে বললেন এবং আমাকে চাক্ষুষ পরিচয় করিয়ে দিলেন। সুলতান আমায় দেশ সম্বন্ধে আলাপ-আলোচনা করে একটি পোশাক ও ঘোড়া আমাকে উপহার দিলেন। আমীর তখন সুলতানকে বললেন যে আমি হেজাজ যেতে চাইছি। তার ফলে তিনি আমাকে রসদ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিষ দিতে হুকুম করলেন। আমীর-উল-হজের সঙ্গে আমার সফরের ব্যবস্থা হল এবং তিনি বাগদাদের শাসনকর্তাকে সে কথা পত্র লিখে জানিয়ে দিলেন। বাগদাদে ফিরে এসে সুলতানের ব্যবস্থা মত সবকিছুই আমি পেলাম। হজযাত্রীর কাফেলা রওয়ানা হতে তখনও দু’মাসের বেশী সময় বাকি ছিল। কাজেই এ সুযোগে মাসুল ও দিয়ার বাকর জেলা দুটি সফর করে আসা আমার উত্তম বলে মনে হল।
বাগদাদ ত্যাগ করে আমরা দুজাল খালের পাড়ে একটি সরাইখানায় এলাম। তাইগ্রীস নদী থেকে বেরিয়ে এসে অনেকগুলি নদীতে পানি সরবরাহ করছে এ খালটি। দুদিন পর আমরা এলাম হারবা নামক বড় একটি গ্রামে সেখান থেকে তাইগ্রীস নদীর তীরস্থ আল-মাগুক নামক একটি দূর্গের নিকটে। এর উল্টা দিকে পূর্ব তীরে সুররা মানরা বা সামারা শহর। এ শহরটির শুধুমাত্র ধ্বংসাবশেষ এখন বর্তমান। এখানকার আবহাওয়া সুষম প্রকৃতির এবং স্থানটি ধ্বংসাব শেষে পূর্ণ হলেও অত্যন্ত মনোরম ২৮। আরও একদিনের পথ এগিয়ে গিয়ে আমরা তাকরিট পৌঁছলাম। তাকরিট শহরটি বেশ বড় এবং এখানে সুন্দর-সুন্দর বাজার এবং অনেকগুলি মসজিদ আছে। এ শহরের বাসিন্দারা তাদের বিবিধ সদৃগুণের জন্য প্রসিদ্ধ। সেখান থেকে রওয়ানা হয়ে আরও দু’মঞ্জিল পথ চলে আমরা এলাম আল্-আকর নামে আরেকটি গ্রামে। এখান থেকে একটানা কতগুলি গ্রাম ও আবাদী জমি পার হয়ে মসুল। সেখান থেকে আমরা যেখানে এলাম সেখানকার জমি কাল। বসরা ও কুফার মধ্যকার স্থানের ঝরণার মত এখানকার কুপে পি পাওয়া যায়। এখান থেকে আরও দু’মঞ্জিল গিয়ে আমরা আল-মাউসিল (মসুল) পৌঁছলাম।
মসুল একটি পুরাতন বর্ধিষ্ণু শহর। এখানকার সুদৃঢ় দূর্গটি আল-হাদরা (The Humpback) নামে পরিচিত। দূর্গের পরেই সুলতানের প্রাসাদরাজি। শহর থেকে প্রাসাদগুলিকে পৃথক করে রেখেছে বেশ চওড়া একটি দীর্ঘ রাস্তা। রাস্তাটি শহরের শুরু থেকে শেষ অবধি প্রসারিত। শহর বেষ্ট করে আছে ঘন-ঘন সন্নিবিষ্ট মিনারওয়ালা। দু’টি সুদৃঢ় প্রাচীর। প্রাচীরগুলি এতটা পুরু যে পর-পর অনেকগুলি কোঠা তৈরী করা হয়েছে। প্রাচীরের ভিতরে দিল্লী ছাড়া আর কোথাও আমি এমন নগর প্রাচীর দেখি নাই। শহরের বাইরেই বিস্তৃত শহরগুলি। সেখানে মজিদ, গোসলখানা, বাজার, মুসাফেরখানা প্রভৃতি সবই আছে। এখানে তাই গ্রীসের তীরে রয়েছে প্রসিদ্ধ একটি মজিদ। মসজিদের চারদিকে লোহার জাফরি-কাটা জানালা। আর আগে এর সংলগ্ন নদীর দিকে প্রসারিত সুদৃশ্য ও সুগঠিত বেদী। মসজিদের সামনেই একটি হাসপাতাল। এ ছাড়া আরও দুটি প্রসিদ্ধ মজিদ আছে শহরের ভিতরে। মসুলের কায়সারিয়া লোহার দরজাওয়ালা সুন্দর একটি অট্টালিকা।২৯
মসুল থেকে আমরা গেলাম জাজিরাত ইব্নে ওমর নামক বৃহৎ একটি শহরে। শহরটি নদী দ্বারা বেষ্টিত বলেই নাম হয়েছে জাজিরা (দ্বীপ)। শহরের বহুলাংশ আজ ধ্বংসের কবলে। জাজিরার বাসিন্দারা সচ্চরিত্র ও বিদেশীদের প্রতি সদাশয়। এখানে যেদিন ছিলাম সেদিন আমাদের জুদি পর্বত দেখবার সুযোগ হয়। এই জুদি পর্বতে এসে হজরত নূহ-এর কিশতি নোঙর করেছিল বলে কোরআন শরীফে উল্লেখ আছে। জাজিরাত-ইব্নে ওমর থেকে দু’মঞ্জিল এগিয়ে আমরা পৌঁছলাম নাসিবিন শহরে। মাঝারী আকারের একটি প্রাচীন শহর নাসিবিন। বিস্তীর্ণ একটি উর্বর সমতটে অবস্থিত। এ শহরেরও অনেকাংশ ভগ্নদশায় উপনীত। এ শহরে যে গোলাব পানি তৈরী হয় সুগন্ধের জন্য তা অতুলনীয়। নিকটবর্তী একটি পাহাড় থেকে উৎপন্ন নদী শহরটিকে ঘিরে আছে। নদীর একটি শাখা শহরে প্রবেশ করে রাস্তা, বাড়ীঘর, প্রধান মজিদের চত্বর পার হয়ে দুটি চৌবাচ্চায় গিয়ে নিঃশেষ হয়েছে। এ শহরে একটি হাসপাতাল ও দু’টি মাদ্রাসা আছে।
অতঃপর আমরা হাজির পর্বতের পাদদেশে স্থাপিত সিজার ৩০ নামক শহরে। শহরের অধিবাসীরা সাহসী ও দয়ালু প্রকৃতির কুর। সিজার থেকে এলাম দারা। দারা নামক এ বৃহৎ পুরাতন শহরে মনোরম একটি দূর্গ ৩১ আছে। এ শহরটিও ধ্বংসপ্রায় এবং একেবারেই জনবিরল। শহরের বাইরের জনপদে গিয়ে আমরা থাকবার ব্যবস্থা করলাম। সেখান থেকে যাত্রা করে পাহাড়ের পাদদেশে মিরিদিন শহরে গেলাম। মুসলমান দেশগুলিতে যে সব সুন্দর সুগঠিত শহর আছে তার মধ্যে মিরিদিন একটি। এখানে যে উলের সূতা তৈরী হয় তা এ নামেই সর্বত্র পরিচিত। পাহাড়ের শীর্ষদেশে অবস্থিত এখানে সুউচ্চ একটি দূর্গ আছে। আমি যখন সেখানে যাই তখন মিরিদিনের সুলতান ছিলেন আল্ মালীক আস্-সালি৩২। ইরাক, সিরিয়া বা মিসরে দানে তার মত মুক্তহস্ত ব্যক্তি আর নাই। কবি ও দরবেশরা আসেন তার সঙ্গে দেখা করে তার দান গ্রহণের জন্য।
এখান থেকে বাগদাদ ফিরে যাবার বন্দোবস্ত করতে হল। মসুলে পৌঁছে দেখলাম সেখানকার হজযাত্রী দল বাগদাদের দিকে যাত্রা করে শহর ছেড়ে বাইরে এসেছে। আমিও তাদের শামিল হয়ে গেলাম। বাগদাদে পৌঁছে দেখতে পেলাম, সেখানকার হজযাত্রীরাও যাত্রার আয়োজন করছে। কাজেই আমি সুলতানের সঙ্গে দেখা করে আমার প্রাপ্যের কথা উল্লেখ করলাম। একটি উটের পিঠের অর্ধাংশ তিনি আমার জন্য বরাদ্দ। করে দিলেন আর দিলেন খাদ্য ও চারজনের উপযোগী পানি। এবং তদনুযায়ী একটি হুকুমনামা লিখে দিয়ে আমীর-উল-হজের কাছে আমাকে হাওলা করে দিলেন। তার সঙ্গে আমার আগে থেকেই পরিচয় হয়েছিল। কিন্তু পরে আমাদের পরিচয় বন্ধুত্বে পরিণত হয়। তার তত্ত্বাবধানে আমাকে রেখে তিনি যথেষ্ট যত্ন ও দয়া প্রদর্শন করেন এবং আমার ন্যায্য প্রাপ্যের চেয়ে তিনি অনেক বেশী দেন। কুফা ত্যাগ করার পর আমি। পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হই। সেজন্য আমাকে প্রত্যহ বহুবারের জন্য উটের পিঠ থেকে ওঠানামা করতে হয়। আমীর-উল-হজ সর্বদা আমার কুশলাদি জিজ্ঞাসা করতেন এবং আমাকে দেখাশুনা করতে অপর সবাইকে আদেশ দিতেন। আব্বার দরগাহ্ মক্কা পৌঁছা পর্যন্ত আমি অসুস্থই ছিলাম। সেখানে পৌঁছে যথারীতি পবিত্র কাবা তওয়াফ করলাম এবং আর সব করণীয় বসা অবস্থায় সমাধা করতে হল। সাফা ও মারোয়া গেলাম আমীরের ঘোড়ায় চড়ে।৩৩ মিনায় এসে আমি অনেকটা ভাল বোধ করতে লাগলাম ও সুস্থ হয়ে উঠলাম। হজের শেষে একটি বছর আমি পুরোপুরিভাবে ধর্মকর্ম উদ্যাপনে কাটালাম।
