তারপর সেখান থেকে এলাম বাগদাদ-শান্তির আগার, ইসলামের রাজধানী ২২। হিল্লার সেতুর মত এখানে দুটি সেতু আছে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সে সেতুর উপর দিয়ে রাত-দিন নদীর এপার ওপার লোক চলাচল করে। বাগদাদে মোট এগারটি প্রধান (Cathedral) মসজিদ আছে, তার আটটি নদীর দক্ষিণ তীরে, বাকী তিনটি বাম তীরে। এ ছাড়াও বাগদাদে আরো মসজিদ ও মাদ্রাসা আছে কিন্তু মাদ্রাসাগুলির সবই ভগ্নদশা প্রাপ্ত। বাগদাদে হামাম বা গোসলখানার সংখ্যা প্রচুর এবং সেগুলি সুন্দর ভাবে গঠিত। অধিকাংশ হামামের দেওয়াল পিচ দিয়ে রং করা হয়েছে বলে কাল মার্বেল পাথরের মত দেখায়। কুফা ও বসরার মধ্যস্থলে অবস্থিত একটি ঝরণা থেকে এ পি সগ্রহ করা হয়। সেখানে ক্রমাগত পিচের ধারা বয়ে এসে ঝরণার দু’পাশে কাদার মত জমা হয়। শাবলের সাহায্যে তাই তুলে আনা হয় বাগদাদে। প্রতি বেসরকারী গৃহ বা। প্রতিষ্ঠানের গোসলখানা রয়েছে। গোলসখানার এক কোণে আছে পানির গামলা (Basin) তার সঙ্গে যুক্ত ঠাণ্ডা ও গরম পানির দু’টি কল। প্রত্যেক মানার্থীর জন্য তিনখানা করে তোয়ালের ব্যবস্থা আছে। একখানা থাকে গোলসখানায় ঢুকবার আগে পরবার জন্য, অপরখানা পরে বাইরে আসবার জন্য এবং তৃতীয়খানা শরীর মুছে। শুকাবার জন্য। একমাত্র বাগদাদ ছাড়া অপর কোন শহরে আমি এ ধরনের বিস্তৃত ব্যবস্থা দেখি নাই, যদিও কোন-কোন শহরে এর কাছাকাছি সুব্যবস্থা আছে২৩। বাগদাদ শহরের পশ্চিমাংশ নির্মিত হয়েছে আগে যদিও তার বহুলাংশ এখন ধ্বংসের কবলে। তা সত্ত্বেও এখানে এখনও তেরটি মহল্লা আছে এবং তার প্রতিটিই একটি শহরের মত এবং প্রতিটি মহল্লায় দু’ তিনটি করে গোসলখানা আছে। হাসপাতালটি মনে হয় একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাসাদ, যার চিহ্ন মাত্র এখন বর্তমান। শহরের পূর্বাংশে রয়েছে অনেকগুলি বাজার। সবচেয়ে বড় বাজারটিকে বলা হয় মঙ্গলবারের বাজার। শহরের এ অংশে কোন ফলের গাছ নেই বলে এখানে ফল আনা হয় পশ্চিমের অংশ থেকে। সেখানে ফলের বাগানাদি আছে।
আমার বাগদাদ আগমনের সম সময়ে সেখানে আসেন উভয় ইরাক ও খোরাসানের সুলতান আবু সাঈদ বাহাদুর খান ২৪। ইনি সুলতান মোহাম্মদ খোদাবান্দার পুত্র। সুলতান খোদাবান্দার ইসলাম গ্রহণের উল্লেখ আমরা আগেই করেছি। বর্তমান সুলতান একজন দয়ালু ব্যক্তি। তিনি যখন পিতার মসনদ দখল করেন তখনও বয়সে তিনি। বালক মাত্র। তাঁকে নামে মাত্র সুলতান রেখে সমস্ত ক্ষমতা দখল করেছিল প্রধান আমীর জুবান। এভাবেই কিছুকাল চলবার পর একদিন ভূতপূর্ব সুলতানের বেগমগণ জুবানের পুত্র দামাস্ক খাজার ঔদ্ধত্য সম্বন্ধে নালিশ করেন বর্তমান সুলতানের কাছে। সুলতান। জুবানের পুত্রকে গ্রেপ্তার করিয়ে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। তার সৈন্যদলের সঙ্গে জুবান তখন ছিলেন খোরাসানে। তাতার সৈন্যদল জুবানের প্রস্তাবে সম্মত হয়ে সুলতানের বিরুদ্ধে লড়াই করতে অগ্রসর হয়। কিন্তু উভয় পক্ষের সৈন্যরা যখন সামনাসামনি হয় তখন তাতার সৈন্যরাও জুবানকে ত্যাগ করে সুলতানের সঙ্গে যোগদান করে। জুবান অগত্যা সিজিস্তানে (সিস্তান) পলায়ন করতে বাধ্য হয় এবং পরে হিরাতের সুলতানের আশ্রয় গ্রহণ করে। কিছুদিন পরেই হিরাতের সুলতান তার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে তাকে ও তার কনিষ্ঠ পুত্রকে হত্যা করে তাদের মাথা সুলতানের কাছে পাঠিয়ে দেন। অতঃপর আবু সাইদ যখন সর্বেসর্বা তখন তিনি জুবানের কন্যাকে বিবাহ করবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। জুবানের কন্যাকে বলা হত বাগদাদ খাতুন। তিনি পরমাসুন্দরী ছিলেন এবং শেখ হাসানের সঙ্গে তার বিবাহ হয়েছিল। আবু সাইদের মৃত্যুর পরে শেখ হাসানই সর্বেসর্বা হয়ে উঠেন। শেখ হাসান ছিলেন আবু সাঈদের ফুপাত ভাই। আবু সাঈদের হুকুমে হাসান তার স্ত্রীকে তালাক দেন এবং বাগদাদ খাতুন শীঘ্রই আবু সাঈদের প্রিয়তমা পত্মী হয়ে উঠেন। তুর্কী ও তাতারদের মধ্যে মহিলাদের স্থান অতি উচ্চে। তারা যখন কোন হুকুম দেন তখন বলেন, “সুলতান ও মহিলাদের আদেশানুসারে।” প্রত্যেক মহিলাই বিরাট আয়ের কয়েকটি শহর ও জেলার মালিক। সুলতানের সঙ্গে যখন তারা সফরে বের হন তখন তাদের জন্য পৃথক তাবুর বন্দোবস্ত থাকে।
উপরে বর্ণিত অবস্থায় কিছুদিন চলবার পরে সুলতান দিলশাদ নাম্নী এক নারীকে বিবাহ করেন এবং অচিরেই তার অনুরক্ত হয়ে উঠেন।২৫ তখন বাগদাদ খাতুনকে। অবহেলা করার ফলে সে হিংসার বশে একখানা রুমালের সাহায্যে সুলতানকে বিষ প্রয়োগ করে। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বংশ লোপ হয়ে গেল। তখন আমীররা নিজ নিজ প্রদেশের মালিক হয়ে বসলেন। পরে যখন তারা জানতে পারলেন যে, বাগদাদ খাতুনই সুলতানকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করেছে তখন তাঁরাও বাগদাদ খাতুনকে হত্যা করবেন বলে স্থির করেন। খাজা সুলু নামে একজন গ্রীক ক্রীতদাস ছিলেন প্রধান আমীরদের একজন। বাগদাদ খাতুন যখন স্নানাগারে ছিলেন তখন সেখানে প্রবেশ করে সুলু লাঠির প্রহারে বাগদাদ খাতুনকে হত্যা করেন। এক টুকরা চট দিয়ে ঢাকা অবস্থায় তার মৃতদেহ কয়েকদিনের জন্য সেখানেই পড়েছিল।
অতঃপর আমি সুলতান আবু সাঈদের মহল্লার’২৬ সহগামী হয়ে বাগদাদ ত্যাগ করি। সুলতান কোন্ পথে যান তাই দেখাই ছিল আমার উদ্দেশ্য। তার সঙ্গে দশদিন চলার পরে আমি একজন আমীরের সঙ্গে তাব্রিজ ২৭ শহরে রওয়ানা হই। দশদিন সফরের পরে আমরা তাব্রিজ শহরের বাইরে আস্-শাম নামক একটি জায়গায় হাজির হয়ে তাবু খাটালাম। এখানে সুন্দর একটি মুসাফেরখানা আছে। এখানে মুসাফেরদের রুটি, গোশত, ঘৃতপক্ক ভাত ও মিষ্টান্ন দেওয়া হয়। পর দিন ভোরে শহরে প্রবেশ করে গাঁজান বাজার নামে প্রকাণ্ড একটি বাজারে হাজির হলাম। দুনিয়ার যত সুন্দর-সুন্দর বাজার আমি দেখেছি তার একটি গাঁজান বাজার। প্রত্যেক পণ্য-দ্রব্যের জন্যই এখানে নির্দিষ্ট পৃথক স্থান আছে। স্বর্ণকারদের দোকানের পাশ দিয়ে যেতে-যেতে নানা রঙের মণিমুক্তা দেখে আমার চোখ ঝলসে যাবার উপক্রম হল। রেশমী কোমরব সহ মূল্যবান পোশাকে সজ্জিত সুশ্রী ক্রীতদাসদের সাহায্যে এসব রকমারী মণিমুক্তা দেখানো হয়। তারা মহাজনের সামনে দাঁড়িয়ে তুর্কী বেগমদের এসব দেখায়, বেগমরা তখন এসে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে প্রচুর পরিমাণে কিনতে থাকে। এসব দেখে একটি দাঙ্গা দেখছি বলে মনে হল।-আল্লাহ্ এসব থেকে আমাদের রক্ষা করুন। তারপর গেলাম কস্তুরী ও অন্যান্য গন্ধদ্রব্যের বাজারে। সেখানেও অনুরূপ বা তার চেয়েও খারাপ দাঙ্গা দেখে এলাম।
