সিরাজ নগরের বাইরে যে সব পবিত্র কবর আছে তার মধ্যে ধর্ম প্রাণ শেখ সাদীর১৮ কবর একটি। ফারসী ভাষায় তিনি তাঁর সময়কার শ্রেষ্ঠ কবি ছিলেন। তিনি তাঁর রচনায় অনেক সময় আরবী কবিতা ব্যবহার করেছেন। কবির দ্বারা নির্মিত চমৎকার একটি মুসাফেরখানা এখানে আছে। মুসাফেরখানার ভেতরে সুদৃশ্য একটি ফুলবাগান। নিকটেই রয়েছে রুকনাবাদ নামক প্রসিদ্ধ নদীর উৎপত্তিস্থল। শেখ সাদী কাপড় ধোয়ার জন্য মার্বেল পাথরের কতগুলি চৌব্বাচ্চা তৈরী করে গেছেন। সিরাজের বাসিন্দারা কবর জেয়ারত করতে এসে এখানেই খেতে পায় এবং নদীতে নিজেদের কাপড় ধুয়ে নেয়। আমিও তাই করলাম–আল্লাহ্ তার আত্মার মঙ্গল করুন।
সিরাজ থেকে দু’মাইল পশ্চিমে কাজান। সিরাজ থেকে কাজারুন রওয়ানা হলাম শেখ আবু ইসহাক আল-কাজারুনীর কবর জেয়ারত করতে। ভারত ও চীনের বাসিন্দারা শেখ আবু ইসহাককে অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখে। চীন সমুদ্রে ভ্রমণকালে বাতাস যদি বিপরীত দিকে বইতে থাকে এবং জলদস্যুর আক্রমণের ভয় থাকে তবে ভ্রমণকারীরা শেখ আবু-ইসহাকের নামে মানত করে এবং যে যা মানত করল তা কাগজে লিখে রাখে। অতঃপর তারা নিরাপদ স্থানে পৌঁছলে ঐ ধর্ম স্থানের লোকেরা জাহাজে গিয়ে তালিকা দেখে মানতের টাকা পয়সা আদায় করে আনে। ভারত ও চীন থেকে এমন কোন জাহাজ এখানে আসে না যাতে মানতের হাজার হাজার দিনার আদায় না হয়। শেখের নাম করে কোন ফকির এখানে এসে ভিক্ষা চাইলে তাকে শেখের নামের মোহরাঙ্কিত একটি হুকুমনামা দেওয়া হয়। তাতে লেখা থাকেঃ যদি কেউ শেখ আবু ইসহাকের নামে মানত করে থাকো তবে অমুককে এত টাকা মানতের টাকা থেকে দিয়ে দাও।” অতঃপর হাজার, শ’ বা কমবেশী টাকার কথা উল্লেখ করে দেয়। ফকির কোন মানত কারীর দেখা পেলে তাকে হুকুমনামা দেখিয়ে টাকা আদায় করে অপর পিঠে রশিদ লিখে দেয়।
কাজারুণ থেকে জায়দানের পথে আমরা এলাম হুবায়জা। সেখান থেকে পানিবিহীন মরুভূমির ভেতর দিয়ে পাঁচদিন পথ চলে কুফায়১৯ হাজির হলাম। এক সময়ে কুফা ছিল আস্হাবদের, পণ্ডিতব্যক্তিদের ও ধর্মশাস্ত্রজ্ঞদের বাসস্থান এবং আমির উল-মমামেনিন হজরত আলীর রাজধানী। কিন্তু এখন সে কুফা পার্শ্ববর্তী যাযাবর আরবদের আক্রমনের ফলে ধ্বংসের কবলে এসে পড়েছে। শহরটির চারদিকে কোন প্রাচীর নেই। এখানকার সবচেয়ে প্রসিদ্ধ মসজিদটির সাতটি গুম্বজ সুউচ্চ স্তরে উপর স্থাপিত। কারুকার্যখচিত স্তম্ভগুলির একটি অংশ অপরটির উপর পর-পর বসিয়ে জোড়া দেওয়া হয়েছে গলানো সীসার সাহায্যে। এখান থেকে রওয়ানা হয়ে আমরা বীর মাল্লাহা (Salt well) নামক সুন্দর একটি শহরে এসে রাত কাটালাম। সুন্দর এ শহরটির চারদিক তাল বাগানে বেষ্টিত। আমি শহরে প্রবেশ না করে বাইরেই তাবু খাটালাম। কারণ, এ শহরের বাসিন্দারা গোড়া শিয়া মতাবলম্বী।
পরের দিন ভোরে যাত্রা শুরু করে আমরা হিল্লা শহরে এলাম। ইউফ্রেটিস নদীর পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত হিল্লা বেশ বড় একটি শহর। শহরের বাজারগুলিতে ফসলাদি ছাড়াও স্থানীয় অনেক শিল্পদ্রব্য কিনতে পাওয়া যায়। এখানে নদীর এপার থেকে ওপার অবধি নৌকার পর নৌকা সার বেঁধে সাজিয়ে সুন্দর একটি সেতু তৈরী করা হয়েছে। নৌকাগুলির ‘আগা’ ও পাছায় লোহার শিকল লাগিয়ে উভয় তীরে বাঁধা হয়েছে কাঠের শক্ত খুঁটীর সঙ্গে। হিল্লার বাসিন্দারা সবাই ‘Twelver’ দলভূক্ত শিয়া সম্প্রদায়ের লোক। কিন্তু তাদের ভেতর আবার রয়েছে দুটি উপদল। এক দলের লোকেরা কুর্দ বলে পরিচিত অপর দলকে বলা হয় দুই মসজিদের দল। দু দলের ভেতর সর্বক্ষণ ঝগড়া বিবাদ লেগেই আছে। শহরের প্রধান বাজারের সন্নিকটে একটি মসজিদ আছে। এ মসজিদটির দরজা রেশমী পর্দায় ঢাকা থাকে। তারা এ মসজিদকে বলে জামানার ইমাম (বা Master of the Age)–এর দরগা। এখানকার প্রচলিত নিয়মানুসারে প্রতিদিন সূর্যাস্তের পূর্বে প্রায় শতেক লোক মুক্ত তরবারি ও অন্যান্য অস্ত্রাদি হাতে নিয়ে নগরের শাসনকর্তার কাছে হাজির হয়। তিনি তাদের জাজিম ও লাগাম লাগানো একটি ঘোড়া বা গাধা দেন। সেই ঘোড়া বা গাধাটি নিয়ে তখন তারা ঢাক ঢোল বাশীসহ মিছিল করে পঞ্চাশ জন ঘোড়ার আগে এবং পঞ্চাশ জন পিছনে, ডাইনে বামে অনেক লোক সহ জামানার ইমামের দরগায় গিয়ে হাজির হয়। দরজার সামনে গিয়ে বলতে থাকে, “বিছমিল্লাহু, হে জামানার ইমাম, বিছমিল্লাহ্ চলে আসুন, দুর্নীতি শুরু হয়েছে, অবিচার চলছে। এখনই আপনার আগমনের সময়, যাতে আপনার দ্বারা আল্লাহ্ সত্য ও মিথ্যার যাচাই করতে পারেন।” মাগরেবের নামাজের সময় অবধি তারা ঢাক, ঢোল ও বাঁশী বাজিয়ে এমনি করে ডাকতে থাকে। তাদের বিশ্বাস, আল হাসান আল্-আসকারির পুত্র মোহাম্মদ এই মসজিদে ঢুকে লোকচক্ষুর অন্তরালে অদৃশ্য হয়েছেন এবং একদিন আবার এখান থেকেই হবে তার আবির্ভাব। কারণ তাদের মতে, ইনিই হবেন সেই প্রত্যাশিত ইমাম।
সেখান থেকে চলে এলাম আমরা কারবালা-হযরত আলীর পুত্র হোসেনের দরগাহ্। এ কবরটির পারিপার্শ্বিকতা ও জেয়ারতের রীতিনীতি নাজাফে হযরত আলীর কবরের অনুরূপ। এ শহরের বাসিন্দারা সবাই শিয়া মতাবলম্বী এবং তারাও দুটি দলে বিভক্ত। যদিও তারা একই বংশ থেকে উদ্ভূত তবু সর্বক্ষণ পরস্পর ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত থাকে। তার ফলে শহরটি ধ্বংসপ্রায় হয়ে গেছে।
