আমার সিরাজ সফরকালে সিরাজের সুলতান ছিলেন আবু ইসহাক ১৬। তিনি ছিলেন উত্তম সুলতানদেরই একজন। তিনি সুদর্শন, সদাচারী, বিনয়ী, দয়ালু প্রকৃতির একজন শক্তিশালী সুলতান ছিলেন। বিশাল একটি রাজ্য তিনি শাসন করতেন। তাঁর তুর্কী ও পার্শী সৈন্য সংখ্যা ছিল পঞ্চাশ হাজারের ঊর্ধ্বে। কিন্তু তিনি সিরাজের অধিবাসীদের বিশ্বাস করতেন না। তিনি তাদের কখনো চাকুরীতে বহাল করতেন না। এবং কাউকে কোন রকম অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দিতেন না। কারণ তারা ছিল যেমন সাহসী, তেমনি ছিল পটু শাসনকর্তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে। ১৩৩৫ খ্রীস্টাব্দে সুলতান। আবু সাঈদের মৃত্যুর পর প্রত্যেক আমীর নিজের কাছে যা ছিল তাই হস্তগত করেন। কিন্তু সুলতান আবু ইসহাক নিজের বলে সিরাজ, ফারস ও ইসপাহানে আয়ান কিসরার ১৭ মত একটি রাজপ্রাসাদ নির্মাণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এবং সিরাজের অধিবাসীদের আদেশ করেন প্রস্তাবিত প্রাসাদের ভিত্তি খননের। তখন এক সমিতির লোকেরা অপর সমিতির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে এ কাজ আরম্ভ করল। কর্মীদের প্রতিযোগিতা এতদুর গিয়ে পৌঁছল যে অনেকে মাটি বইবার ঝুড়ি চামড়া দিয়ে তৈরী করে তা আবার কারুকার্য করা রেশমী কাপড়ে মুড়ে দিল। গাধার পিঠে যে ঝুড়ি ঝুলানো থাকত তাও এভাবে মুড়তে বাকি রইল না। কেউ-কেউ কাজের যন্ত্রপাতি তৈরী করল রূপা দিয়ে। কেউ কেউ অসংখ্য মোমবাতি জ্বালিয়ে দিল। যখন তারা মাটি খনন করতে যেত তখন। সবচেয়ে ভাল পোশাকটি পরে নিত। সুলতান একটি অলিন্দে বসে তাদের এসব লক্ষ্য করতেন। ভিত্তি খননের কাজ শেষ হলে তাদের বিদায় দিয়ে বেতন ভুক কারিগর নিয়োগ করা হল। নিয়োজিত কারিগরের সংখ্যা ছিল কয়েক সহস্র। আমি শহরের শাসনকর্তার কাছে শুনেছি, যে কর সেখানে আদায় হত তার বেশীর ভাগই ব্যয় হয়েছিল। এ কাজের জন্য। দান ধ্যানের জন্য আৰু ইসহাক নিজের তুলনা করতে যাইতেন ভারতের সুলতানের সঙ্গে। কিন্তু মাটির ঢিল থেকে সপ্তর্ষীমণ্ডল’ কত দূরে”। আবু ইসহাকের সবচেয়ে বড় দানের কথা আমি যা শুনেছি, তাতে জিরাতের রাজার এক দূতকে তিনি দিয়েছিলেন সত্তর হাজার দিনার। কিন্তু ভারতের সুলতান তার চেয়ে অনেক বেশী করে দিয়ে থাকেন অসংখ্য লোককে। দানের একটি দৃষ্টান্ত এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে।
আমীর বখত একবার ভারতের সুলতানের রাজধানীতে দেখা করতে এসে নিজেকে অসুস্থ বোধ করতে লাগলেন। সুলতান তার কাছে যেতেই তিনি উঠবার চেষ্টা করলেন কিন্তু সুলতান তাকে বিছানা ছেড়ে নামতে বারণ করলেন। একটি আসন আনা হলে সুলতান সেখানে বসলেন। তারপর হুকুম করলেন দাঁড়িপাল্লা ও সোনা আনতে। সে সব এলে তিনি রুগ্ন ব্যক্তিকে একটি পাল্লায় উঠে বসতে বললেন। আমীর তখন বলে। উঠলেন, জাহাঁপনা আগে যদি বুঝতাম আপনি এই করবেন তাহলে সমস্ত জামা-কাপড় গায়ে জড়িয়ে নিতাম। সুলতান বললেন, ‘এখন পরে নিন আপনার যত জামা-কাপড় আছে। কাজেই তুলা দিয়ে তৈরী শীতের সমস্ত জামা-কাপড় পরে তিনি একটি পাল্লায় উঠে বসলেন। আরেক পাল্লায় চাপানো হলো সম-ওজনের সোনার তাল। সুলতান তখন বললেন, “এগুলি নিয়ে আপনার রোগমুক্তির জন্য দানখয়রাত করে দিন।” এই বলে তিনি চলে গেলেন।
সিরাজে এমন অনেকগুলি পবিত্র স্থান আছে যার প্রতি বাসিন্দাদের যথেষ্ট শ্রদ্ধা আছে। তারা এসব স্থান জেয়ারত করতে আসে। এ-সবের ভেতর ইমাম আবদুল্লাহ ইব্নে খাফিফের কবরস্থান একটি। সেখানে শেখ বললেই এ ইমামকে ছাড়া আর কাউকে বুঝায় না। মুসলিম তাপসদের মধ্যে তার স্থান ছিল অতি উচ্চ। তার সম্বন্ধে একটি গল্প প্রচলিত আছে। একবার ত্রিশজন দরবেশকে সঙ্গী হিসাবে নিয়ে তিনি সিংহলের সরণ দ্বীপে (Adam’s peak) যান। পথে এক জনমানবহীন স্থানে পৌঁছে ক্ষুধায় তারা অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়েন। সিংহলে অনেক হাতী পাওয়া যায়। সিংহল থেকে ভারতে অনেক হাতী চালান হয়ে আসে। ক্ষুধার যন্ত্রণা যখন অসহ্য হয়ে উঠে তখন দরবেশরা একটি ছোট হাতী মেরে খাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে, কিন্তু শেষ তাদের বারণ করেন। অবশেষে ক্ষুধায় অস্থির হয়ে তারা শেখকে অমান্য করেই একটি হাতীর বাচ্চা মেরে ক্ষুধা নিবারণ করেন। অবশ্য শেখ হাতীর গোশত ভক্ষণে রাজী হন না। অতঃপর রাত্রে তাদের নিদ্রিত অবস্থায় চারদিক থেকে অনেক হাতী এসে সেখানে হাজির হয় এবং তাদের প্রত্যেকের ঘ্রাণ নিয়ে একে-একে সবাইকে হত্যা করে। নিদ্রিত শেখেরও ঘ্রাণ নেয় কিন্তু তার কোন অনিষ্ট করে সহসা একটি হাতী গুড় দিয়ে তাকে নিজের পিঠে তুলে নেয় এবং একটি লোকালয়ে গিয়ে হাজির হয়। গ্রামবাসীরা শেখকে হাতীর পিঠে এ অবস্থায় দেখে বিস্মিত হয়। হাতিটি তখন তাকে মাটিতে নামিয়ে রেখে প্রস্থান করে।
এ সিংহল দ্বীপেও আমি সফর করেছি। এখানকার লোকেরা এখনও পৌত্তলিক (বৌদ্ধ) রয়েছে। কিন্তু তা হলেও মুসলমান দরবেশদের এরা সম্মান করে, নিজেদের গৃহে আশ্রয় দেয় এবং আহার করতে দেয়। নিজেদের গৃহে এর স্ত্রীপুত্র নিয়ে বসবাস করে। ভারতের যে সব পৌত্তলিক (ব্রাহ্মণ ও হিন্দু) বাস করে তাদের রীতিনীতি এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা কখনও মুসলমানদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে না এবং কখনও নিজেদের পাত্রে পানাহার করতে দেয় না। অথচ কথায় বা কাজে তারা মুসলমানদের প্রতি আপত্তিকর কিছু করে না। এখানে আমরা একবার তাদের হাতে রান্না করা গোশত খেতে বাধ্য হয়েছিলাম। তাদের নিজেদের পাত্রেই আমাদের খাদ্য পরিবেশন করা হল, তারা বসে রইল কিছু দূরে। তারা কলাপাতায় করে আমাদের ভাতও খেতে দিত। ভাত তাদের প্রধান খাদ্য। ভাত দিয়ে তারা চলে যেত। আমাদের খাওয়ার যা কিছু পড়ে থাকত তা কুকুর ও পাখী এসে খেয়ে ফেলত। যদি কোন অবোধ শিশু কখনো এসব। খেত তবে তাকে প্রহার করে কিছু গোবর খাইয়ে দেওয়া হত। তারা বলে, এই করে। তাকে পবিত্র করা হয়।
