কয়েকদিন পরেই আমি ইহাজ ছেড়ে আসি। সুলতান আমাকে এবং আমার সঙ্গীদের কিছু দিনার পাঠান বিদায়ের উপহার স্বরূপ। এ সুলতানের এলাকায় আমরা সু উচ্চ পর্বত-সঙ্কুল পথে ১০ দিন অবধি সফর করি। প্রতি রাত্রেই আমরা কোন মাদ্রাসায় পৌঁছে বিশ্রাম করেছি। সেখানে প্রত্যেক সফরকারী ও তার বাহনের খাদ্য সরবরাহ করা হয়। কোন-কোন মাদ্রাসা জনবিরল স্থানে অবস্থিত। কিন্তু মাদ্রাসার প্রয়োজনীয় সব কিছুই তাতে আছে। ঐ রাজ্যের আয়ের এক তৃতীয়াংশ এসব মুসাফেরখানা ও মাদ্রাসার ব্যয়নির্বাহের জন্য রাখা হয়। ইসফাহান প্রদেশের একটি সমতল অঞ্চলে উস্ তারকা ও ফিরুজান শহর হয়ে আমরা পথ চলতে লাগলাম। ফিরুজানে পৌঁছে শহরের অধিবাসীদের সঙ্গে শহরের বাইরেই দেখা হল। তখন তারা একটি শবযাত্রায় চলেছে। শবের খাটের সামনে ও পেছনে মশাল চলছে। তারা বাঁশী বাজাতে-বাজাতে শবের অনুগমন করছে গায়করা চলেছে আনন্দসূচক গান গাইতে-গাইতে। তাদের এ কাণ্ড দেখে আমরা বিস্মিত হলাম। পরের দিন যে পথ দিয়ে আমরা অগ্রসর হলাম তার আশে পাশে ফলের বাগান আছে, খালও আছে, আর আছে কবুতরের বাসার উপযোগী বহু সংখ্যক মিনার। বিকেল বেলা আমরা ইরাক-আল-আজমের অন্তগর্ত ইসফাহান বা ইসপাহান এসে পৌঁছলাম। ইসপাহান শহরটি যেমন বড় তেমনি সুদৃশ্য। কিন্তু শিয়া ও সুন্নী সম্প্রদায়ের বিবাদের ফলে আজ এ শহরের বহুলাংশ ধ্বংসের কবলে পড়েছে। সে বিবাদ সেখানে এখনও চলছে। ফলের জন্য স্থানটি বিখ্যাত। এখানকার খুবানী অতুলনীয়, তার ভেতরে আছে সুস্বাদু বাদাম। ইসপাহানের ন্যাসপাতি স্বাদে ও আকারে সর্বোৎকৃষ্ট। এখানে আর পাওয়া যায় চমৎকার আঙুর ও তরমুজ। ইসপাহানের বাসিন্দারা সুদর্শন। তাদের গাত্রবর্ণ রক্তাভ সাদা। তারা সাহসী ও সদাশয় এবং সর্বদাই। ভাল ব্যয়বহুল খাদ্য সংগ্রহের ব্যাপারে একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে। এ ব্যাপারে তাদের সম্বন্ধে অনেক অদ্ভুত গল্প প্রচলিত আছে। এখানে প্রত্যেক শ্রেণীর ব্যবসায়ীদেরই একটি সমিতি আছে। ব্যবসায়ে লিপ্ত না হলেও নেতৃস্থানীয় লোকদের অনেক সমিতি আছে। তাছাড়া আছে অবিবাহিত যুবকদের সমিতি। এসব সমিতি অপর সমিতির সভ্যদের দাওয়াত করে এবং সাধ্যমত জাকজমক সহকারে ভোজ দেবার প্রতিযোগিতা করে। শুনেছি, একবার এক সমিতি অপর সমিতির সভ্যদের দাওয়াত করে রান্না করেছিল মোমবাতি জ্বালিয়ে। পরে এ মেহমানরা পালটা দাওয়াত করে রান্না করেছিল রেশম জ্বালিয়ে।
অতঃপর আমরা ইসপাহান থেকে রওয়ানা হই সিরাজে শেখ মাজদ্দিনের সঙ্গে দেখা করতে। সিরাজ সেখান থেকে দশ দিনের পথ। ছয় দিন পথ চলার পর আমরা পৌঁছলাম ইয়াজদিখস্তে। শহরের বাইরে একটি ধর্মশালায় মুসাফেরদের থাকবার ব্যবস্থা। আছে। শহরটি সুরক্ষিত এবং প্রবেশদ্বারটি লৌহ নির্মিত। ভিতরে রয়েছে কতকগুলি দোকান। মুসাফেররা প্রয়োজনীয় সব জিনিস এখানে কিনতে পারে। এখানে যে পনির তৈরী হয় তা ইয়াজদিখাস্তি নামে পরিচিত। উৎকর্ষতায় সে পনির অতুলনীয়। প্রতিটি পনিরের টুকরার ওজন দু’ থেকে চার আউন্স। সেখান থেকে তুর্কী অধ্যুষিত একটি অঞ্চল পার হয়ে সিরাজ গিয়ে পৌঁছলাম। জনবহুল সিরাজ শহরটি সুপরিকল্পিত ও সুগঠিত। প্রত্যেক রকম কারবারের জন্যই এখানে রয়েছে স্বতন্ত্র বাজার। এখানকার অধিবাসীরাও সুদর্শন এবং সুবেশধারী। সমগ্র প্রাচ্যে একমাত্র দামেস্ক ছাড়া বাজারের সৌন্দর্যে, ফলেফুলের বাগানে, নদীনালায় ও অধিবাসীদের সুশ্রীতায় সিরাজের তুলনা হয় না। চারদিক ফলের বাগানে বেষ্টিত একটি সমতল ভূমিতে সিরাজ অবস্থিত। মধ্যে মধ্যে রয়েছে নদী। তারই একটি নাম রুকনাবাদ১৩। এ নদীর সুমিষ্ট পানি গ্রীষ্মে অতি শীতল এবং শীতের সময় গরম। সিরাজের বাসিন্দারা ধর্ম প্রাণ ও সৎ, বিশেষ করে সেখানকার নারী সমাজ। তাদের মধ্যে চমৎকার একটি রীতি প্রচলিত আছে। প্রতি সোম, বৃহস্পতি ও শুক্রবার শহরের প্রধান মসজিদে এক দু’ হাজার নারী পাখা হাতে গিয়ে জমায়েত হয় এবং ধর্ম সম্বন্ধে বক্তার বক্তৃতা শোনে। অত্যাধিক গরম বলে তারা তখন নিজের-নিজের পাখা ব্যবহার করে। আমি আর কোনো দেশেই মহিলাদের এত বড় জমাত দেখি নি।
সিরাজ নগরে প্রবেশ করে আমার অন্তরে জাগরূক ছিল একটি মাত্র বাসনা। সে বাসনা হ’ল যুগের শ্রেষ্ঠ বিস্ময় খ্যাতনামা শেখ মাজদ্দিন ইসমাইলকে খুঁজে বের করা। আমি যখন তার গৃহে গিয়ে পৌঁছলাম তিনি তখন আসরের নামাজের জন্য বাইরে। যাচ্ছিলেন। আমি তাকে ছালাম করলাম। তিনি আমার সঙ্গে কোলাকোলি করে আমার হাত ধরে জায়নামাজ অবধি এগিয়ে গেলেন এবং তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতে ইঙ্গিত দিলেন। অতঃপর শহরের খ্যাতনামা ব্যক্তিরা এলেন তাঁকে ছালাম করতে। ভোরে ও সন্ধ্যায় এই তাদের রীতি। এরপর তিনি আমার সফর এবং যে সব দেশ সফর করেছি সে সব-সম্বন্ধে আলাপ করলেন। আলাপের পর তার মাদ্রাসায় আমার থাকার ব্যবস্থা করতে হুকুম দিলেন। ইরাকের সুলতান শেখ মাজদ্দিনকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখেন। তার এ শ্রদ্ধার কারণ নিমোত কাহিনীটিতে বুঝা যায়।
ইরাকের ভূতপূর্ব সুলতান মুহাম্মদ খোদাবান্দার ১৪ ইসলাম গ্রহণের আগেই তার সহচর ছিলেন শিয়া মতাবলম্বী একজন ধর্মশাস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তি। পরে তাদের সহ তিনি যখন ইসলাম গ্রহণ করলেন তখন এ ব্যক্তিকে তিনি তার যথেষ্ট শ্রদ্ধা করতে লাগলেন। এ সুযোগে তিনিও সুলতানকে পীড়াপীড়ি করে রাজী করালেন তার রাজ্যের সর্বত্র শিয়া মত প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু বাগদাদ, সিরাজ ও ইস্পাহানের লোকেরা এ মত প্রচারে বাধা দিল। সুলতান তাতে ক্রোধান্বিত হলেন। তিনি ঐ তিন জায়গায় কাজীদের সমন দিয়ে হাজির। করতে হুকুম দিলেন। সুলতানের হুকুম মোতাবেক প্রথম যাকে দরবারে আনা হল তিনিই সিরাজের কাজী শেখ মাজদ্দিন। সুলতান তখন ছিলেন তাঁর গ্রীবাস কারাবাগ ১৫ নামক একটি স্থানে। কাজীকে তার কাছে হাজির করা হলে তিনি হুকুম দিলেন তাকে কুকুরের সামনে নিক্ষেপ করতে। গলায় শিকল বাঁধা প্রকাও এ কুকুরগুলিকে নরমাংস খেতে শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল। যখন কাউকে কুকুরের সামনে দেবার জন্য আনা হয়। তখন তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় প্রকাণ্ড একটি ময়দানে। তারপর কুকুরগুলিকে লেলিয়ে দেওয়া হয় তার উপর। লোকটি তখন স্বভাবতই পালাবার চেষ্টা করে। কিন্তু পালাবার পথ পায় না। কুকুরগুলি অনায়াসে তাকে ধরে ছিন্ন-ভিন্ন করে তার মাংস খেতে থাকে। কিন্তু কাজী মাজদিনকে যখন কুকুরের সম্মুখে ছেড়ে দেওয়া হল তখন একটি কুকুরও তাকে আক্রমণ করল না। বরং কুকুরগুলি অত্যন্ত বন্ধুভাবে তাঁর কাছে গিয়ে লেজ নাড়তে লাগল। এ খবর শোনার পর হতেই সুলতান কাজীকে অশেষ শ্রদ্ধা দেখাতে লাগলেন এবং শিয়া মত পরিত্যাগ করলেন। শুধু তাই নয়, সিরাজের প্রসিদ্ধ এলাকা জামানের একটি গ্রাম সহ অনেক কিছু কাজীকে দান করলেন। ভারত থেকে। ফিরবার পথে ১৩৪৭ খ্রীস্টাব্দে পুনরায় আমি কাজীর সঙ্গে দেখা করেছিলাম। তিনি তখন এত দুর্বল যে চলাফেরা করতে পারেন না। তবু তিনি আমাকে দেখেই চিনলেন এবং উঠে কোলাকোলি করলেন। একদিন আমি তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে দেখলাম সিরাজের সুলতান নিজের কান ধরে তার সামনে বসে আছেন। কোন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিকে সম্মান দেখাবার এই রীতি সেখানে। সুলতানের সামনে হাজির হয়ে সেখানে সবাই তাই করে।
