বসরা থেকে উবুল্লা১০ যাওয়ার উদ্দেশ্যে আমি সামবাক নামক এক প্রকারের হোট একটি নৌকায় আরোহণ করলাম। বসরা থেকে উবু দশ দিনের পথ। এ পথের দু’পারে পথিক দেখতে পায় একটানা ভাবে ফল ও তালের বাগিচা। গাছের ছায়ায়। সওদাগরেরা বসে বিক্রি করছে রুটি,মাছ, খেজুর,দুধ ও ফলমূল। উবুন্না এক সময়ে খুব বড় শহর ছিল। ভারত ও ফারসের সওদাগরেরা নিয়মিত এখানে যাতায়াত করত। কিন্তু সে শহর ধ্বংস হয়ে আজ একটি গ্রামে পরিণত হয়েছে। সূর্যাস্তের পরে এখান থেকে আমরা একটি ছোট জাহাজে আরোহণ করে পরদিন ভোরে গিয়ে আবাদান পৌঁছলাম। উবুঝার একটি লোক জাহাজটির মালিক। কৃষিবিহীন সমতল অঞ্চলে অবস্থিত আবাদান একটি গ্রাম। শুনেছিলাম আবাদানে বিশেষ যোগ্যতাসম্পন্ন একজন তাপস বাস করেন। তিনি বাস করেন সম্পূর্ন নির্জনে। মাসে একবার তিনি নদীর পারে এসে এক মাসের খাদ্যোপযোগী মাছ শিকার করে আবার প্রস্থান করেন। আমি তাকে খুঁজে বের করতে মনস্থ করলাম এবং তাঁকে নামাজরত অবস্থায় খুঁজে পেলাম একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদে। নামাজের শেষে তিনি আমার হাত ধরে বললেন, “আল্লাহ তোমার ইহকালের ও পরকালের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করুন। আলহামদোলিল্লাহ-খোদার সমস্ত প্রশংসা যে তিনি সত্যই আমার ইহকালের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেছেন। সে মনোবা দেশ ভ্রমণের ছাড়া আর কিছুই নয়। সে বাসনা তিনি এভাবে পূর্ণ করেছেন যে আমার জ্ঞাত মতে আর। কাউকে তা করেননি। পরকাল এখনও আমার সামনে রয়েছে কিন্তু সে বিষয়ে খোদার। অশেষ দয়া ও ক্ষমতার উপর আমার অসীম আস্থা আছে। আমার সঙ্গীরা পরে পূর্বোক্ত তাপসের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল কিন্তু তারা তার কোন সন্ধান পায়নি। আমরা যে মুসাফেরখানায় বাস করছিলাম সেখানকার একজন দরবেশ সেদিন সন্ধ্যায় তাপসের সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন। তিনি দরবেশের হাতে একটি তাজা মাছ দিয়ে বলে পাঠিয়েছেন, “আজ যে মেহমান আমার কাছে এসেছিল তাকে নিয়ে দাও।” দরবেশ ফিরে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “আজ তোমাদের ভেতর কে শেখের সঙ্গে দেখা করেছো?” আমি বল্লাম, “আমি দেখা করেছি।” তখন তিনি আমাকে বললেন, “তিনি বলেছেন, এইটি তোমার মেহমানের উপহার।” আমি এজন্য খোদাকে ধন্যবাদ জানালাম। পরে দরবেশ মাহটি রান্না করলে আমরা সবাই তা খেলাম। এর চেয়ে ভাল মাছ আমি কখনও খাইনি। মুহূর্তের জন্য আমার মনে হ’ল বাকী জীবন আমি এ শেখের খেদমতেই কাটিয়ে দেব। কিন্তু আমার মনের একাগ্রতা সে সঙ্কল্প থেকে আমাকে নিবৃত্ত করল।
সেখান থেকে আমরা জাহাজে মাজুল রওয়ানা হলাম। আমার অভ্যাস ছিল, যে। পথে একবার গিয়েছি সে পথে যতটা সম্ভব আর কখনও ফিরে না আসা। বাগদাদ যাওয়ার সঙ্কল্প ছিল আমার কিন্তু বসরার এক ব্যক্তি আমাকে পরামর্শ দিল সুর যেতে, সেখান থেকে ইরাক-আল-আজম, পরে ইরাক-আল-আরব। আমি তার পরামর্শই গ্রহণ করলাম। চারদিন পর আমরা মাজুল১৯ পৌঁছলাম। পারস্য উপসাগরের কূলে মাজুল একটি ছোট জায়গা। সেখানকার এক শস্যব্যবসায়ীর একটি ঘোড়া ভাড়া করে রামিজ (রাম-হারমুজ) রওয়ানা হলাম। মুক্ত প্রান্তরের মধ্য দিয়ে পথ। সেখানে যাযাবর কুদীসের বাস।ফলের গাছ ও নদী সম্বলিত রামিজ সুন্দর একটি শহর। সেখানে এক রাত্রি বাস করে পুনরায় কুর্দী অধ্যুষিত একটি সমতল ভূমির উপর দিয়ে তিন রাত্রি পথ চললাম। প্রতি মঞ্জিলের শেষেই একটি করে মুসফেরখানা। মুসাফেরখানায় প্রত্যেক মুসাফেরকে রুটি, মাংস ও মিষ্টি বিতরণ করা হয়। অতঃপর আমরা তুন্তর (সুত্তার) শহরে এসে পৌঁছলাম। শহরটি একটি সমতল ভূমির প্রান্তদেশে অবস্থিত। সেখান থেকে পর্বতের গুরু। সেখানে শেখ শরাফউদ্দিন মুসার মাদ্রাসায় আমি মোল দিন কাটালাম। মুসা একজন অত্যন্ত সৎ প্রকৃতির লোক। প্রতি শুক্রবার জুমার জামাতের পর তিনি ‘ওয়াজ করেন। একদিন তার ওয়াজ শুনে মনে হল তার তুলনায় মিসরে, হেজাজে, সিরিয়ার যত ওয়াজ এতদিন শুনেছি সবই ম্রিয়মান। একদিন নদীর পাড়ের এক ফলের বাগানে দরবেশ, ধর্মশাস্ত্রজ্ঞ ও খ্যাতনামা লোকদের এক সমাবেশে তার সঙ্গে আসবার সুযোগ আমার হয়েছিল। উপস্থিত সবাইকে আহার্য দিয়ে তিনি বিশেষ মর্যাদা ও গাম্ভীর্যের সঙ্গে ওয়াজ (খোত্বা পাঠ) করলেন। তিনি হোত পাঠ শেষ। করতেই চারদিক থেকে-ছোট ছোট কাগজের টুকরা তার উপর নিক্ষিপ্ত হতে লাগল। পারস্যের লোকদের মধ্যে রীতি আছে, কাগজের টুকরায় প্রশ্ন লিখে তা ওয়াজখানের দিকে নিক্ষেপ করে। ওয়াজখান পর-পর সেগুলির জবাব দিয়ে যান। এক্ষেত্রেও শেখ সমস্ত কাগজের টুকরা সগ্রহ করে পর-পর অতি সুন্দরভাবে জবাব দিয়ে সবাইকে সন্তুষ্ট করলেন।
তুস্তার থেকে রওয়ানা হয়ে উচ্চ পার্বত্য পথে আমরা তিন রাত্রি পথ চলবার পর ইহাজ শহরে হাজির হলাম। ইহাজ মাল-আল-আমীর নামেও পরিচিত। মাল-আল আমীর সুলতান আতা বেগের রাজধানী। সেখানকার সকল শাসনকর্তার উপাধিই আবেগ ১২। আমি সুলতানের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা করেছিলাম কিন্তু তা সম্ভব হল না; কারণ তিনি মদ্যাসক্ত এবং কেবলমাত্র শুক্রবার বাইরে আসেন। কয়েকদিন পরে সুলতান নিজেই আমাকে আমন্ত্রণ পাঠান তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য। পত্র বাহকের সঙ্গে আমি সাইপ্রাস দ্বার নামে পরিচিত একটি প্রবেশদ্বারে গিয়ে হাজির হলাম। সেখান থেকে একটি উচ্চ সিঁড়ি গিয়ে উঠেছে একটি কোঠায়। সুলতানের পুত্রের জন্য তারা শোকাতুর বলে সে কোঠাটি সজ্জিত করা হয়নি। সুলতান একটি গদি আঁটা আসনে বসেছিলেন। তার সামনে দুটি আবৃত পানপাত্র। তার একটি সোনার অপরটি রূপার। তার আসনের কাছেই আমার জন্য একটি সবুজ কম্বল বিছানো হয়েছিলো। আমি তার উপর আসন গ্রহণ করলাম। সে কামরায় তখন তার একজন সভাসদ ও একজন অন্তরঙ্গ বন্ধু ছাড়া আর কেউ উপস্থিত ছিলেন না। সুলতান আমার নিজের সম্বন্ধে, দেশ সম্বন্ধে এবং মিসরের ও হেজাজের সুলতান সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। আমি তার সমস্ত প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিলাম। ঠিক তখন বিশিষ্ট একজন আইনজ্ঞ ব্যক্তি সেই কামরায় ঢুকলেন। সুলতান লোকটির প্রশংসা করতে লাগলেন। আমি তখন লক্ষ্য করলাম, সুলতান মদ্য পান করেছেন। কিছুক্ষণ পরে বিশুদ্ধ আরবীতে তিনি আমাকে বলেন, “কথা বলুন।” আমি তাকে বললাম, “যদি আপনি শুনতে রাজী হন তবে বলতে পারি। আপনার পিতা ছিলেন দানধ্যান ও সততার জন্য বিখ্যাত একজন সুলতান। শাসক। হিসাবে আপনার বিরুদ্ধেও কোন অভিযোগ নেই ঐ একটি বস্তু ছাড়া।” বলেই আমি পানপাত্র দুটি দেখিয়ে দিলাম। আমার কথায় তিনি বিস্ময়াবিষ্টের মত চুপ করে রইলেন। আমি তখন চলে আসতে চাইলাম, কিন্তু তিনি আমাকে বসতে ইঙ্গিত করে বললেন, “আপনার মত লোকের সঙ্গে দয়ার শামিল। দেখলাম তিনি যেন ঘুরে পড়ে যাচ্ছেন এবং প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছেন। কাজেই আমি চলে এলাম। আমি আমার পাদুকা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু যে আইনজ্ঞ লোকটির কথা উল্লেখ করেছি তিনি ঘরের ভেতর খুঁজে পাদুকা জোড়া এনে দিলেন। তার এ দয়ার জন্য লজ্জিত হয়ে আমি ক্রটি স্বীকার। করলাম। কিন্তু তাতে তিনি আমার পাদুকা চুম্বন করে মাথার উপর তুলে বললেন। “আল্লাহ যেন আপনার মঙ্গল করেন। আজ সুলতানকে আপনি যা বলেছেন আপনি ছাড়া কেউ তা পারতেন না। আশাকরি আপনার কথা তার মনের উপর গাদ কাটবে।”
