এ বিপুল পরিমাণ অর্থ তাঁকে দেওয়া হয়েছিল একটা বস্তায় ভর্তি করে। অর্থ শরিফের অত্যন্ত প্রিয়বস্তু বলে এবং পাছে কেউ তাতে ভাগ বসায় এ ভয়ে তিনি টাকার বস্তার উপর বয়েই ঘুমাতেন। তার ফলে স্বদেশ যাত্রার প্রাক্কালে তাঁর পাশে ব্যথা হয়ে। গেল। সে ব্যথাই তার কাল হল, টাকার বস্তা পাবার বিশ দিন পর তিনি এন্তেকাল। করলেন। টাকা তিনি রেখে গেলেন শরিফ হাসান-আল্-জারানীর কাছে। তিনিও সমস্ত টাকা খয়রাত করে দিলেন দিল্লীর শিয়াদের ভেতর। ভারতীয়রা উত্তরাধিকারের দায়িত্ব অমান্য করে না এবং বিদেশীদের টাকা পয়সায় হস্তক্ষেপ করে না, এমন কি তার। পরিমাণ যত বেশীই হোক সে সম্বন্ধে কোনও কৌতূহল প্রকাশ করে না। অনুরূপ ভাবে, কাফ্রীরাও শ্বেতচর্ম লোকদের অর্থের প্রতি লোভ করে না, সত্যিকার ওয়ারিস না পাওয়া। পর্যন্ত সে টাকা লোকটির দলপতির কাছেই থাকে।
খলিফা হজরত আলীর কবর জেয়ারতের পর আমাদের কাফেলা রওয়ানা হয়ে গেল বাগদাদের পথে। আমি সে দেশবাসী এক দল আরবের সঙ্গে বসরার পথ ধরলাম। তারা ছিল অত্যন্ত সাহসী। তাদের সঙ্গ ছাড়া এ রকম দেশে সফর করাই সম্ভব হত না। ইউফ্রেটিস নদীর পারে আল-ইহার নামক একটা স্থানের মধ্যে দিয়ে ছিল আমাদের পথ। একদল লুণ্ঠনকারী আরব অধ্যুসিত আল-ইহার নল-খাগড়ার জঙ্গলময় জলাভূমি। এখানকার আরবরা রাহাজানি করে এবং নিজেদের শিয়া বলে পরিচয় দেয়। আমাদের। পশ্চাদ্বর্তী একদল দরবেশকে আক্রমণ করে এরা তাদের পায়ের জুতা থেকে কাঠের তৈরী খাদ্যপাত্র অবধি লুঠ করে নেয়। তারা এ জঙ্গলে নিজেদের সুরক্ষিত করে নিয়েছে এবং সর্বপ্রকার আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করতেও তারা সক্ষম। ইহার মধ্যে দিয়ে তিনদিন পথ চলবার পর আমরা ওয়াসিত শহরে পৌঁছলাম ইরাকের বাসিন্দাদের ভেতর যাদের সজ্জন বলা যায়, ওয়াসিতের বাসিন্দারা তাদের অন্তর্গত। তারা শুধুই সজ্জন নয়, সর্বপ্রকারে সজ্জন। ইরাকীদের ভেতর যারা ভালভাবে কোরআন আবৃত্তি করতে চায় তারা সবাই আসে এখানে। এ উদ্দেশ্য নিয়ে এখানে এসেছে এমন একদল ছাত্র আমাদের কাফেলায়ও ছিল। আমাদের কাফেলা তিন দিন অবস্থান করায় আমি এখান থেকে এক দিনের পথ উন্মে উবায়দা নামক গ্রামে আর-রিফাইর কবর জেয়ারতের সুযোগ পেলাম। যাত্রার পরদিন দুপুর বেলা আমি এখানে গিয়ে পৌঁছলাম। বিরাট এ দরগায় হাজার হাজার দরবেশের বাস।৬ আসরের নামাজের পর জয়ঢাক ও দামামার বাজনা শুরু হল এবং সঙ্গে-সঙ্গে হাজার-হাজার দরবেশ নৃত্য শুরু করলেন। অতঃপর মাগরেবের নামাজ আদায় করে তারা আহারে বসলেন। আহার্য ছিল চাউলের রুটি, মাছ, দুধ ও খেজুর। এশার নামাজের পরে তারা নিজেদের দরুদ পড়তে লাগলেন। অনেক জ্বালানী কাঠ সেখানে জড়ো করে অগ্নিকুণ্ড তৈরী করা হয়েছিল। দরবেশরা নৃত্য করতে করতে অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে গিয়ে পড়লেন। কেউ-কেউ আগুনের ভেতর গড়াগড়ি করতে লাগলেন। কেউ-কেউ বা আঙ্গার নিভে না যাওয়া পর্যন্ত মুখের ভেতর রাখলেন। আহমদী দরবেশদের এ সব আজব রীতি। তাদের ভেতর কেউ-কেউ বড়-বড় সাপ এনে দাঁত দিয়ে সাপের মাথায় কামড়ে এপিঠ-ওপিঠ বিদ্ধ করে দেয়।
আর-রিফাইর কবর জেয়ারতের পর আমি ওয়াসিতে ফিরে এসে দেখলাম আমাদের কাফেলা আগেই রওয়ানা হয়ে গেছে। আমি পথে গিয়ে তাদের নাগাল পেলাম এবং তাদের সঙ্গে বসরা অবধি গেলাম। শহরের দিকে অগ্রসর হতে-হতে দু’মাইল দূরে নজরে পড়ল দূর্গের মত দেখতে সুউচ্চ একটি অট্টালিকা। জিজ্ঞাসা করে জানলাম, এটি হজরত আলীর মসজিদ। এক সময়ে বসরা এত বিরাট একটি শহর ছিল যে এ মসজিদটি ছিল তার কেন্দ্রস্থলে। আর এখন কিনা মসজিদটি পড়েছে গিয়ে দু’মাইল দূরে। এখান থেকেও দু’মাইল দূরে শহরের পুরাতন প্রাচীর। কাজেই বর্তমান শহরও পুরাতন প্রাচীরের মধ্যস্থলে এ-মসজিদটি। ইরাকের প্রসিদ্ধ নগরগুলির ভেতর বসরা একটি। এখানকার মত খেজুর বাগান পৃথিবীর আর কোথাও নেই। চৌদ্দ পাটও খেজুরের চলতি দাম ইরাকী এক দিরহাম অর্থাৎ এক নুকরার ৮ তিন ভাগের এক ভাগ। এখানকার কাজী আমাকে এমন প্রকাণ্ড এক ঝুড়ি খেজুর দিলেন যা একজনে অতি কষ্টে বয়ে আনতে পারে। সেগুলি বিক্রি করে আমি মোটে নয় দিরহাম পেলাম, তার তিন দিরহাম দিতে হল কুলীকে সেই ঝুড়ি বাড়ি থেকে বাজার অবধি বয়ে নেবার মজুরী বাবদ। বসরার বাসিন্দারা একাধিক সদ্গুণের অধিকারী। বিদেশীদের প্রতি তাদের ব্যবহার অত্যন্ত অমায়িক। তারা এভাবে বিদেশীদের হক আদায় করে যে তাদের ভেতর কেউ নিজেকে নিঃসঙ্গ বোধ করে না। শুক্রবার তারা জুমার নামাজ পড়ে পূর্ববর্ণিত হজরত আলীর মসৃজিদে কিন্তু অন্যান্য দিন মসজিদটির দ্বার বন্ধ থাকে। একদিন শুক্রবারের জামা’তে আমি উপস্থিত ছিলাম। এমাম খোত্র পাঠ করতে উঠে কতকগুলি মারাত্মক ব্যাকরণ (৯) ভুল করলেন। আমি বিস্মিত হয়ে কাজীর সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ করলাম। তিনি বললেন, “ব্যাকরণ শাস্ত্র জানেন এমন একজন লোকও আর এ শহরে নেই।” সমস্ত কিছুর পরিবর্তন সাধন যিনি করেন তাঁর মহত্ব বৃদ্ধি হউক। চিন্তাশীল ব্যক্তিদের এটি একটি শিক্ষনীয় বিষয়, ব্যাকরণ শাস্ত্রে বসরার বাসিন্দাদের জ্ঞান এক সময়ে উচ্চ শিখরে উঠেছিল। যেখানকার মাটিতে এর কাণ্ড ও শাখা-প্রশাখা বিস্তার লাভ করেছে, যে দেশের অধিবাসীদের এ বিদ্যায় প্রাধান্য ছিল অবিসম্বাদিত, সেই দেশের এমাম আজ ব্যাকরণের নিয়মাবলী ভঙ্গ না করে খোত্বা পাঠ করতে পারেন না।
