এ শহরের লোকেরা কোন খাজনা বা কর দেয় না, শাসনকর্তাও নেই কিন্তু এ শহর এককভাবে নকিব-আল-আশরাফ (Keeper of the Register of the descendants of the Prophet)-এর অধীনে। এখানকার লোকদের সবাই উদ্যমশীল ব্যবসায়ী। তারা সাহসী, দয়ালু ও সফরের সঙ্গী হিসাবেও উত্তম কিন্তু হজরত আলী সম্বন্ধে অত্যন্ত গোঁড়া। যদি এখনকার লোকেদের ভেতর কেউ মাথায়, হাতে, পায়ে অথবা শরীরের অপর কোন অঙ্গে রোগাক্রান্ত হয় তবে সোনা বা রূপা দিয়ে সে অঙ্গের একটি প্রতিকৃতি তৈরী করে এ স্মৃতিস্তয়ে নিয়ে আসে। এ সমাধিসৌধের খাজাঞ্চিখানা অনেক ধনরতে সমৃদ্ধ। দরবারে নকিব-আল-আশরাফ উচ্চ পদমর্যাদার অধিকারী। যখন তিনি ভ্রমণে বের হন তখন ঠিক প্রধান সেনানায়কের সমমর্যাদায় তাঁর। অনুগমন করে পতাকাবাহী ও দামামা বাদকগণ। প্রত্যহ ভোরে ও সন্ধ্যায় তাঁর প্রাসাদের প্রবেশদ্বারে রণবাদ্য বাজান হয়। বর্তমানে যিনি এ পদে আছেন তার আগে একত্রে একাধিক ব্যক্তি এ পদ দখল করছিলেন। পালাক্রমে তারা শাসনকতার কর্তব্য পালন। করতেন।
এ সব খ্যাতনামা ব্যক্তিদের একজন ছিলেন শরিফ আবু ঘুরা। তরুণ বয়সে তিনি ধর্মকর্ম ও বিদ্যাশিক্ষায় কাটান কিন্তু নকিব-আল-আশরাফ পদে অধিষ্ঠিত হবার পর ইনি দুনিয়াদারিতে লিপ্ত হয়ে পড়েন, ধর্ম স্বভাব ত্যাগ করেন এবং অসদুপায়ে তাঁর অর্থে ব্যবহার করতে থাকেন। বিষয়টি সুলতানের গোচরীভূত করা হলে আবু ঘুরা তা জানতে পেরে খোরাসান যান এবং সেখান থেকে রওয়ানা হন সোজা ভারতের পথে। সিন্ধুনদ পার হয়েই তিনি সঙ্গীদের হুকুম করলেন জয়ঢাক আর রণভেরী বাজাতে। ভেরী বেজে উঠতেই গ্রামবাসীরা ভয় পেয়ে গেল, মনে করল হয়ত বা তাতার দস্যুরাই দেশে হামলা করেছে। গ্রাম ছেড়ে তারা পালিয়ে গেল উজা (উ) শহরে। সেখানকার শাসনকর্তাকে খবর দিল যা-কিছু তারা শুনেছে। খবর পেয়েই তিনি যুদ্ধের আয়োজন করে একদল সৈন্য নিয়ে এগিয়ে গেলেন। কিন্তু যে সন্ধানী সৈন্যদলকে তিনি আগে পাঠিয়েছিলেন তারা দেখল, মোটেই জন-দশেক অশ্বারোহী, তাদের সঙ্গে কিছু সংখ্যক পদাতিক, পেছনে রয়েছে সওদাগরেরা, দামামা ও পতাকাবাহীর দল। তাদের আগমনের উদ্দেশ্য জানতে চাইলে, তারা বলল, ইরাকের নকিব শরিফ এসেছেন ভারতের সুলতানের কাছে। এ সংবাদ নিয়ে সন্ধানী সৈন্যরা ফিরে এল শাসনকর্তার কাছে। তিনি বুঝতে পারলেন, শরিফের বুদ্ধি বিবেচনা কম, নয়তো নিজের দেশের বাইরে এসে তিনি নিশান উড়িয়ে দামামা বাজাতে শুরু করতেন না। শরিফ কিছুদিন উজ্ব শহরেই অবস্থান করলেন। তখনও প্রতিদিন সকালে-বিকালে তার বাড়ির বাইরে তিনি নিশান উড়িয়ে ও জয়ঢাক বাজিয়ে তৃপ্তিবোধ করতেন। শুনা যায়, ইরাকে থাকতে তার উপস্থিতিতে যখন ঢাক বাজানো হতো তখন বাজনা থামলেই তিনি বলে উঠতেন, “আরেকবার হোক, ঢাকী।” তারপর এ শব্দ কটাই হয় ব্যঙ্গচ্ছলে তার ডাকনাম।
উজার শাসনকর্তা শরিফের সংবাদ লিখে পাঠালেন সুলতানের কাছে। তার আগমনের সময়ে এবং আসার পর অবধি বাসগৃহের দরজায় সকালে-বিকালে জয়ঢাক। বাজানো এবং নিশান উড়ানোর সংবাদ দিতেও তিনি ভুললেন না। ভারতে তখন প্রচলিত নিয়ম ছিল; সুলতানের বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত ব্যক্তি ছাড়া কেউ ঢাক বাজাতে বা নিশান উড়াতে পারবেন না। কেউ অনুমতি পেলেও শুধু সফরের পথে বাজনা বাজাতে পারতেন। তাছাড়া বাজনা বাজার রীতি ছিল শুধু সুলতানের প্রাসাদের প্রবেশদ্বারে। পক্ষান্তরে মিশর, সিরিয়া ও ইরাকে বাজনা বাজানো হয় সেনানায়কের গৃহের দ্বারে। কাজেই শরিফের ব্যবহারের কথা শুনে সুলতান বিরক্ত ও অসন্তুষ্ট হলেন। শরিফ তখন যথারীতি জয়ঢাক বাজাতে-বাজাতে রাজধানীর দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন, এ-দিকে সুলতানও যাচ্ছিলেন সিন্ধুর আমীরের সঙ্গে দেখা করতে। পথে দেখা হতেই শরিফ এগিয়ে এসে সুলতানকে অভ্যর্থনা জানালেন। সুলতান কুশল প্রশ্নাদির পর তাঁর আগমনের কারণ জিজ্ঞাসা করলেন এবং তার জবাব শুনে আমীরের কাছে চলে গেলেন। ফিরবার পথেও শরিফের আসার বা অন্য কোন রকম ব্যবস্থা না করেই রাজধানীতে ফিরে এলেন। তিনি তখন দৌলতাবাদে যাত্রার জন্য তৈরী হয়েছিলেন। যাত্রার পূর্বে শরিফকে পাঁচশ দিনার (মরক্কোর ১২৫ দিনার) দূত মারফত পাঠিয়ে বলে দিলেন, “তাকে বলবে, তিনি যদি ফিরে যেতে চান তাহলে এ টাকা তার পথ খরচের জন্য, যদি তিনি আমাদের সঙ্গে আসতে চান তবে এ টাকা সফরে ব্যয় করবেন, আর যদি থাকতে চান তবে আমাদের ফিরে না-আসা পর্যন্ত তার খাওয়ার খরচ এ টাকা দিয়ে হবে।” শরিফ খুশী হতে পারলেন না। তিনি ভেবে রেখেছিলেন, সুলতান অপরকে যেমন
বখশিশ দেন তেমনি দরাজ হস্তে তাঁকেও বড় রকম কিছু দেবেন। অবশেষে তিনি সুলতানের সঙ্গে যাওয়াই স্থির করলেন এবং উজিরের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠতা করতে লাগলেন। উজিরও তাকে যথেষ্ট স্নেহের চোখে দেখতে লাগলেন এবং সুলতানের উপর নিজের প্রভাবের বলে দৌলতাবাদ জেলার দুটি গ্রাম তার জন্য জায়গীর স্বরূপ আদায় করে দিলেন। প্রায় আট বছর কাল শরিফ সেখানে বাস করে দুটি গ্রামের প্রজাদের কাছে কর আদায় করে যথেষ্ট অর্থ সঞ্চয় করেন। অতঃপর তিনি ভারত ত্যাগ করতে চান কিন্তু তাতে সক্ষম হন না। কারণ, যারা সুলতানের অধীনে চাকুরী করেন তারা। সুলতানের বিনানুমতিতে কোথাও যেতে পারেন না। বিদেশীদের সঙ্গে তার সংস্রব বেশী বলে তাদের তিনি কদাচিৎ অনুমতি দিয়ে থাকেন। শরিফ প্রথমে চেষ্টা করেন সমুদ্রোপকুলের পথে পালাতে কিন্তু ব্যর্থ হয়ে তাঁকে রাজধানীতে ফিরে আসতে হয়। তখন পুনরায় উজিরের চেষ্টায় তিনি ভারত ত্যাগের অনুমতি লাভ করেন। শুধু। অনুমতিই নয়, সুলতান তাকে দশ হাজার দিনারও দান করেন।
