অতি পুকুর আছে। জাফরের কন্যা জুবায়দা যে সব পুকুর খনন করান এগুলি তারই। কয়েকটি। মক্কা থেকে বাগদাদ অবধি দীর্ঘ পথের প্রতিটি পুকুর, চৌবাচ্চা ও কুপ সেই মহিলার পূণ্যস্মৃতির স্তম্ভস্বরূপ। খোদা তাঁকে সর্বোৎকৃষ্ট পুরস্কারে পুরস্কৃত করুন। এ স্থানটি নজদের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। স্থানটি বেশ প্রশস্ত, আবহাওয়া ও মাটি উত্তম। সারা বছরই এখানকার আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ। আল-ফারুরা থেকে আমরা আল হাজির পৌঁছলাম। এখানে পুকুর আছে কিন্তু শুকিয়ে গেছে। কাজেই পানির জন্য অস্থায়ী পুকুর খনন ছাড়া উপায়ান্তর নেই। সেখান থেকে আমরা সামিরা এসে হাজির হলাম। সামিরা সমতল ভূমিতে অবস্থিত একটি নীচু স্থান। স্থানটি সুরক্ষিত ও পরিবেষ্টিত বলে লোকালয়পূর্ণ। এখানকার কুপে প্রচুর পানি আছে কিন্তু সে পানি লবণাক্ত। সে জলার বেদুঈনরা মেষ, মাখন ও দুধ নিয়ে সেখানে আসে হাজীদের কাছে বিক্রি করার জন্য। এসব জিনিসের পরিবর্তে একমাত্র মোটা সূতীবস্ত্র ছাড়া টাকা পয়সা বা অন্য কোন জিনিস গ্রহণ করতে কিছুতেই তারা রাজী হয় না। আমরা পুনরায় যাত্রা করে গর্তওয়ালা পাহাড়ে’ (Hill with the Hole) পৌঁছলাম। মরুভূমি অঞ্চলের এ পাহাড়টির শিরোদেশে একটি ছিদ্র আছে। সেখানে বাতাস প্রবেশ করলে একপ্রকার শব্দ শুনা যায়।
অতঃপর আমরা ওয়াদিল-কুরুশে পৌঁছলাম। এখানে পানি পাবার কোন ব্যবস্থা নেই। সেখান থেকে সারারাত্রি চলার পরে আমরা ভোরে ফায়েদ ১ দূর্গে হাজির হলাম।
সমতলভূমিতে অবস্থিত ফায়েদ একটি পরিবেষ্টিত সুরক্ষিত স্থান। এ স্থানটির উপকন্ঠে ব্যবসায়ী শ্রেণীর আরবদের বাস। তারা হাজীদের সঙ্গে ব্যবসা করে জীবিকার্জন করে। মক্কা যাবার পথে হজযাত্রীরা তাদের খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় বস্তুর কিছু অংশ এখানে রেখে যায় এবং ফেরবার সময় তা সংগ্রহ করে নেয় ২। মক্কা ও বাগদাদের অর্ধপথে ফায়েদ অবস্থিত। সর্বত্র পানি পাওয়া যায় এমনি একটি সহজ পথে এখান থেকে রওয়ানা হয়ে কুফা যেতে বার দিন লাগে। আরব দস্যুদের ভয়ে হাজীরা এখানে সশস্ত্র অবস্থায় এসে ঢোকে। কারণ, লোভী আরব দস্যুরা এখানে একত্র হয়ে অনেক সময় কাফেলা আক্রমণের চক্রান্ত করে। এখানে এসে আমরা দেখা পেলাম আমীর মোহাম্মদ বিন ইসার দুই পুত্র আমীর ফাইয়াদ ও আমীর হাইয়ার। তাদের সঙ্গে বহুসংখ্যক অশ্বারোহী ও পদাতিক সৈন্য। হজযাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য তাঁদের যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে লক্ষ্য করলাম। আরবরা বিক্রির জন্য অনেক উট ও মেষ এনেছিল। হাজীদের ভেতর যার যা দরকার কিনে নিতে লাগল।
আবার আমাদের যাত্রা শুরু হল আল-আজফার, জারুদ এবং আরও কয়েকটি বিশ্রাম-স্থানের মধ্য দিয়ে। আমরা শয়তানের পথ’ নামক গিরিপথে এসে পৌঁছলাম। রাত্রির জন্য সেখানে আস্তানা ফেলে পরের দিন আবার যাত্রা শুরু হল। সমস্ত পথের মধ্যে এ অংশটাই সবচেয়ে বন্ধুর এবং চলা কষ্টসাধ্য।
আমাদের পরবর্তী বিশ্রাম-স্থানের নাম ওয়াকিসা। এখানে একটি দূর্গ আছে, পানির পুকুরও আছে। তাছাড়া এখানে আরবদের বসতি রয়েছে। এ পথের এটিই শেষ জায়গা যেখানে পানি পাওয়া যায়। ইউফ্রেটিস্ থেকে বেরিয়ে আসা নহর ছাড়া এখান থেকে কুফা পর্যন্ত পানি পাবার উল্লেখযোগ্য কোন জায়গা নেই। কুফার অনেক লোক ওয়াকিসা অবধি এগিয়ে আসে হাজীদের সঙ্গে দেখা করবার জন্য। সঙ্গে করে আনে ময়দা, কুটী, খেজুর এবং অন্যান্য ফলমূল। এখানে এসে তারা হাজীদের সঙ্গে প্রীতি বিনিময় করে পরস্পর কোলাকোলি করে।
এখান থেকে রওয়ানা হয়ে আমরা পৌঁছলাম লাওজা। এখানে প্রকাও একটি পুকুর রয়েছে। সেখান থেকে এলাম আল-মাসাজিদ (মসজিদ শব্দের বহুবচন)। এখানে পুকুর আছে তিনটি। তারপর গেলাম মানারাত আল-কারুন (Minarat of the Hons)। নামক একটি মিনারের কাছে। মরু অঞ্চলে অবস্থিত এ মিনারটি যথেষ্ট উঁচু বলে বহুদূর থেকেই দৃষ্টিগোচর হয়। মিনারের শীর্ষদেশ হরিণের শিং দ্বারা সজ্জিত। কিন্তু মিনারটির আশেপাশে কোন লোকালয় নেই।
অতঃপর আমরা আল-উধায়ের নামে একটি উর্বর উপত্যকায় এসে পৌঁছলাম। সেখান থেকে আল-কাদিসিয়ার প্রসিদ্ধ যুদ্ধের ময়দানে। এখানেই পার্শীদের সঙ্গে মুসলমানদের যুদ্ধে আত্মাহ্ ইসলামের গৌরব বৃদ্ধি করেন। এখানে কয়েকটি খেজুর বাগান আছে এবং ইউফ্রেটিস্ ৩ থেকে একটি নহরও এ অবধি এসেছে।
সেখান থেকে যাত্রা করে আমরা নজফের মাশহাদ আলী শহর গিয়ে পৌঁছলাম। ইরাকের একটি চমৎকার শহর এটি। প্রস্তরময় একটি প্রশস্ত সমতল ভূমিতে অবস্থিত এ শহরটি যেমন সুগঠিত তেমনি জনবহুল। শহরের বাজারগুলি সুন্দর এবং পরিষ্কার। পরিচ্ছন্ন।
আমরা (বাইরের) বাব-আল্ হারা দিয়ে বাজারে প্রবেশ করে প্রথমেই পেলাম। তরিতরকারীর দোকান, বাবুর্চিদের এবং কশাইদের দোকান। তারপরে ফলের বাজার দরজির দোকান, আতরের দোকান। তারপরে হাজির হলাম (ভিতরের) বাব-আল্ হারায়। এখানে একটি কবর আছে যাকে সবাই আলীর কবর বলে। বাব-আল হারা দিয়া কেউ ভিতরে ঢুকলেই প্রথমেই পাবে একটি বৃহৎ মুসাফেরখানা, তার ভিতর দিয়া দরগায় প্রবেশের পথ। প্রবেশ পথে কর্মচারী, হাজিরা বই-রক্ষক ও খোঁজা প্রহরীরা আছে। কোন দর্শনার্থী কবরের দিকে অগ্রসর হলেই প্রহরীদের একজন বা দর্শনার্থীর পদমর্যাদানুযায়ী সবাই উঠে দাঁড়ায় এবং তার সঙ্গে দরজায় গিয়ে আপেক্ষা করে। সেখান থেকে তারা দর্শনার্থীর ভেতরে প্রবেশের অনুমতি চেয়ে বলে উঠে, “হে আমীর উল-মোমনিন, আমি খাকসার আপনার পবিত্র বিশ্রাম স্থলে প্রবেশের অনুমতি চাইছি।” অতঃপর তাকে দরজায় চুম্বন করতে বলে। দরজা-চৌকাঠ রৌপ্য নির্মিত। পরে সে দরগায় প্রবেশ করে। দরগার মেঝে রেশমী কার্পেটে মোড়া। দরগার ভিতরে ছোটবড় অনেকগুলি স্বর্ণ ও রৌপ্যের দীপাধার আছে। মধ্যস্থলে মানুষ সমান উঁচু একটি চতুষ্কোণ বেদী রয়েছে। কাঠের বেদীটি সম্পূর্ণভাবে সোনার পাত দিয়ে রূপার পেরেকে আঁটা। এখানে তিনটি কবর রয়েছে। এখানকার লোকদের মতে করবগুলি হজরত আদম, হজরত নূহ ও হজরত আলীর। কবরগুলির মধ্যস্থলে স্বর্ণ ও রৌপ্যের থালা রাখা আছে। থালায় রয়েছে গোলাব, কস্তরী এবং অন্যান্য আতর। আগন্তুক হাতের অঙ্গুলি দ্বারা আতর নাকে মুখে লাগায় এবং দোয়া প্রার্থনা করে। দরগায় আরও একটি দরজা আছে। তার চৌকাটি রৌপ্য নির্মিত এবং রঙীন রেশমের ঝালরওয়ালা। দরজার পরেই একটি মসজিদ। এ শহরের সমস্ত অধিবাসীই শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত। এ সমাধিসৌধে অনেক। অলৌকিক ঘটনা ঘটে বলে তারা এ সমাধিকে হজরত আলীর সমাধি বলে দাবী করে। এ সব অলৌকিক ঘটনার একটি ঘটে ২৭শে রজব ৫ তারিখের শেষে। সেদিন ইরাকের উভয়াংশ, খোরাসান, পার্শিয়া ও আনাটোলিয়া থেকে প্রায় ত্রিশ, চল্লিশ জন খোঁড়াকে এখানে এনে পবিত্র সমাধিসৌধে রাখা হয়। উপস্থিত লোকেরা তখন মোনাজাত, দোয়া দরুদ অথবা কোরআন পাঠ করে রাত্রিযাপন করে এবং ঐ সকল খোঁড়ারা কখন ভাল হয়ে উঠবে তার অপেক্ষা করতে থাকে। যখন রাত্রির আধাআধি হয় অথবা তিনভাগ গিয়ে একভাগ থাকে তখন তারা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বলে উঠে, “লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মদর রসুলল্লাহ ওয়া আলিউন হাবিবুল্লাহ।” এ ঘটনা এখানকার লোকদের কাছে বিশেষ বিদিত। আমি বিশ্বাসী লোকের কাছে একথা শুনেছি কিন্তু নিজে কখনও তেমন কোন রাত্রে উপস্থিত থাকিনি। আমি মেহমান কলেজে (Guest’ College) চারজন বিকলাঙ্গ লোকের দেখা পেয়েছিলাম এবং তাদের সঙ্গে আলাপ করেছিলাম। তারা বলল যে, সে রাত্রে তারা হাজির হতে পারেনি বলে পরবর্তী সুযোগের অপেক্ষা করছে।
