মক্কার বাসিন্দারা দুর্বল ও নিরীহদের প্রতি বিদেশীদের প্রতি আতিথ্য, দান, দয়া প্রভৃতি বহু সদগুণের জন্য প্রসিদ্ধ। তাদের কেউ কোন ভোজের আয়োজন করলে প্রথমেই অসহায় দরিদ্র ধর্মপ্রাণ লোকদের আহার করায়। এ সব হতভাগ্য লোকের অধিকাংশকে দেখতে পাওয়া যায় রুটীর দোকানের আশেপাশে। কেউ রুটী তৈরি করে নিয়ে যাবার সময় এরা তাকে অনুসরণ করে। সে কাউকে বঞ্চিত না করে নিজের রুটির কিছু অংশ এদের মধ্যে বিলিয়ে দেয়। যদি তার মাত্র একখানা রুটীও থাকে তবু সে তার অর্ধেক বা এক চতুর্থাংশ হাসিমুখে এদের হাতে তুলে দেয়। আরও একটি ভাল অভ্যাস এদের দেখেছি। এতিম ছেলেরা ছোট বড় দু’টি আঁকা নিয়ে বাজারে বসে থাকে। শহরের লোক বাজারে এসে শস্য, গোশত বা তরিতরকারী কিনে এদের একজনকে ডেকে এক ঝাঁকায় গোশত অপর ঝাঁকায় অন্যান্য জিনিস সাজিয়ে দেয়। ছেলেটি ঠিক ঠিক সেই জিনিসগুলি নিয়ে লোকটির গৃহে পৌঁছে দেয়। লোকটি নিজের কাজ সেরে গৃহে ফিরে এবং ইত্যবসরে তার আহার্য প্রস্তুত হয়ে থাকে। এ-কাজে এসব এতিমের কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এমন একটি দৃষ্টান্তও নেই। এ জন্য তারা অতি সামান্য মজুরী পেয়ে থাকে।
আরবের পোশাক-পরিচ্ছদ সুরুচিপূর্ণ ও পরিচ্ছন্ন। তারা সাধারণত শাদা বস্ত্র ব্যবহার করে যা সর্বদাই তুষারশুভ্র থাকতে দেখা যায়। আরবরা প্রচুর সুগন্ধদ্রব্য ও সুরমা এবং সর্বদা দাঁতন ব্যবহার করে। মক্কার নারীরাও অত্যন্ত সুন্দরী, ধর্মপরায়ণা ও স্র স্বভাবা। তারাও এত সুগন্ধদ্রব্য ব্যবহার করে যে তারা একটু আতর কিনবার পয়সা বাঁচাবার জন্য সারারাত অনাহারে কাটিয়ে দেয়। ভাল জামাকাপড় পরে প্রতি বৃহস্পতিবার রাত্রে তারা মসজিদে গমন করে। তখন তাদের আতরের গন্ধে সমস্ত পবিত্রস্থান মোহিত হয়ে যায়। এরা চলে যাবার পরেও সে স্থানে বহুক্ষণ সুগন্ধ থাকে।
যে সব ধর্মপ্রাণ তাপস তখন মক্কায় অবসর ধর্মজীবন যাপন করছিলেন তাদের ভেতর একজন ছিলেন আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু। কখনো তানজিরে এলে তিনি আমাদের সঙ্গে বাস করতেন। দিনের বেলা তিনি মুজাফফরিয়া কলেজে অধ্যাপনা করতেন এবং রাত্রিযাপন করতেন রাবি নামক স্থানে কর্মচারীদের একটি আশ্রয়স্থলে। মক্কার একটি প্রসিদ্ধ আশ্রয়স্থল রাবি। এ স্থানের নিকট এমন একটি কুয়া আছে যার পানির সঙ্গে মিষ্টতায় মক্কার অন্য কোন কুয়ার তুলনা চলে না। এখানকার অধিবাসীরা সবাই ধর্মপ্রাণ। ব্যক্তি। হেজাজের লোকেরা এ স্থানটিকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে এবং নেয়াজ দেয়। তাইফের লোকেরা এখানে ফল সরবরাহ করে। সেখানে প্রচলিত রীতি অনুসারে খেজুর, আঙ্গুর, পিচ প্রভৃতি ফলের বাগানের মালিকগণ উৎপন্ন ফলের কিছু অংশ নেয়াজ স্বরূপ। উটের পিঠে করে এখানে পৌঁছে দিয়ে যায়। তাইফ থেকে মক্কা দু’দিনের পথ। যদি কোন ব্যক্তি এখানে নেয়াজ দিতে কসুর করে তবে তার ফসলের ফলন পরের বছর কমে। যায়।
একদিন মক্কার শাসনকর্তার সহিসরা তাঁর ঘোড়াগুলি নিয়া এ আশ্রয়স্থলে আসে এবং উপরোক্ত কুয়ার পানি দ্বারা ঘোড়ার শরীর ধোয়ায় ও পানি খেতে দেয়। পরে ঘোড়া গুলি আস্তাবলে নিয়া গেলে তারা পেটের ব্যথায় মাটীতে মাথা ও পা আছড়াতে থাকে। শাসনকর্তা এ সংবাদ পেয়ে নিজে ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিদের সেই আশ্রয়স্থলে যান এবং ক্ৰটী স্বীকার করে সেখানকার বাসিন্দাদের এক ব্যক্তিকে নিজের সঙ্গে নিয়ে আসেন। তিনি এসে স্বহস্তে ঘোড়াগুলির পেট মলে দেবার পরে তারা যতটুকু পানি খেয়েছিল তার সবই মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে। অতঃপর ঘোড়াগুলি সুস্থ হয়। এর পর কোন দিনও সহিসরা ভাল উদ্দেশ্য ছাড়া উক্ত স্থানে যায়নি।
***
টীকা
পরিচ্ছেদ ১
১। সৌর বৎসরের হিসাবে একুশ বছর চার মাস।
২। জিয়ানিদ বংশের প্রথম আবু তাশিফিনের রাজত্বকাল ১৩১৮হতে ১৩৪৮সাল অবধি। এ সময়ে তার রাজ্য আলজিয়ার্স অবধি বিস্তৃতি লাভ করেছিল। তিউনিসের সুলতানের বিরুদ্ধে। ১৩২৫ খ্রীষ্টব্দে আৰু তাশিফিন এক সংঘর্ষে অবতীর্ণ হন।
৩। এ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করা হতো। এসবের একটি ছিল, কোরাণের বিশেষ কোন আয়াত পাঠ করে স্বপ্নদেশের অপেক্ষা করা। আরেকটি প্রধা, কোরাণের কিছুটা অংশ পাঠ করে তার ভেতর থেকে ভবিষ্যত কর্মপন্থা নির্ধারণ করা। ইব্নে বতুতা প্রায়ই এ প্রথা অবলম্বন করতেন।
৪। আলজিয়ার্সের পশ্চাতে অবস্থিত উর্বরা সমতলভূমি।
৫। তখনকার দিনে ইরিকিয়া(তিউনিস) রাজ্যের সীমান্ত জেলা।
৬। একাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে কোন একজন বিদ্রোহী শাসনকর্তাকে শাস্তি দিবার জন্য মিশরের ফাতেমী বংশীয় খলিফা যাযাবর আরবদের প্রেরণ করেন। সে সময় আরব সৈন্যের দ্বারা তিউনিসিয়া ও আলজিরিয়ার পূর্বাঞ্চল বিধ্বস্ত হয়। সে আক্রমণের মুখে শুধু প্রাচীর বেষ্টিত নগরগুলির জান ও মাল রক্ষা পায়।
৭। মোড়শ শতাব্দীতে হাফসি বংশের আমলে তিউনিসিয়া ছিল উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রস্থল এবং বহু মুর পরিবার স্পেন থেকে সেখানে গিয়ে বসবাস শুরু করেছিল।
৮। রমজান মাসের রোজার পরে যে উৎসব বা পর্ব উদযাপিত হয় প্রাচ্য দেশে তাকে ঈদ উল-ফিতর বা বাইরাম বলে। ৭২৫ খ্রীস্টাব্দে এ পর্ব উদযাপিত হয় ৯ই সেপ্টেম্বর। এই পর্বদিনের নামাজ আদায় করা হয় প্রাচীরের বাইরে নির্দিষ্ট স্থানে। সে স্থানকে বলা হয় ‘মুসাল্লা’। এ সময় নতুন পোষাক-পরিচ্ছদ ব্যবহারের রীতি প্রচলিত আছে।
