সে-বছরই শাওয়াল মাসের চন্দ্রোদয় হলে (১লা সেপ্টেম্বর ১৩২৬) হেজাজযাত্রী একটি কাফেলা দামেস্ক ত্যাগ করে। আমিও তাদের সঙ্গে যাত্রা করি (৬১)। বসরায় পৌঁছে কাফেলা সাধারণতঃ চার দিন অপেক্ষা করে। কোন জরুরী প্রয়োজনে কাফেলার কেউ দামেস্কে থাকলে এ সময়ের ভেতর বসরায় এসে দলে ভিড়তে পারে। এখান থেকে তারা যায় জিঞ্জার জলাশয়ে। সেখানে একদিন কাটিয়ে আল-লাজুন হয়ে কারাক দূর্গে যায়। কারাক দূর্গকে The castle of the Raven বলা হয়। এটি অতি বিস্ময়কর ও দুর্ভেদ্য ঘোট দূর্গগুলির একটি। চতুর্দিক নদী দ্বারা বেষ্টিত এ দূর্গের প্রবেশ পথ একটি মাত্র। তাও ক্ষুদ্র পাহাড়ে সমাচ্ছন্ন। বিপদের সময় আশ্রয়স্থল হিসেবে সুলতানরা এ দূর্গটি ব্যবহার করে থাকেন। সালার সর্বময় ক্ষমতা দখল করলে সুলতান আন-নাসির এ দূর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেন। কারাকের বাইরে আ-থানিয়া নামক স্থানে কাফেলা চারদিন অবস্থান করে এবং মরুপথে যাত্রার জন্য প্রস্তুত হয়। সেখান থেকে রওয়ানা হয়ে আমরা সিরিয়ার শেষ শহর মা-আন্ পৌঁছি। পরে আকাবাত-আস সাওয়ান হয়ে মরুভূমিতে প্রবেশ করি। এ মরুভূমি সম্বন্ধে কথিত হয় : “যে এখানে প্রবেশ করে সে হারিয়ে যায়, যে মরুভূমি থেকে বেরিয়ে আসে সে নবজন্ম লাভ করে।” দুদিন পথ চলার পর আমরা দাহূত হজ এসে পৌঁছলাম। এখানে অন্তঃসলিলা জলাশয় আছে কিন্তু মানুষের বসতি নেই।(৬২) সেখান থেকে এলাম ওয়াদিবদা। (এখানে পানি নেই। তারপরে এলাম তাবুক। আমাদের পয়গম্বর (সাঃ) একবার তাবুক অভিযান করেন। সিরিয়ার হজযাত্রীদের ভেতর একটি রীতি প্রচলিত আছে। তাবুকের শিবিরে পৌঁছে তারা নিজ নিজ অস্ত্র বের করে এবং মুক্ত তরবারী দিয়ে হাতের তালুতে আঘাত করতে করতে বলতে থাকে, “আমাদের রসুলুল্লাহ্ এভাবে এখানে প্রবেশ করেছেন?”
তাঁবুকে পৌঁছে কাফেলা চারদিন বিশ্রাম করে। এ সময়ে তারা তাবুক ও আল উলার মধ্যবর্তী ভয়াবহ মরুপথের জন্য উটের ও নিজেদের প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করে নেয়। পানি সরবরাহকারী ভিস্তিরা ঝরণার কাছে বাস করে। মহিষের চামড়ায়। তৈরি আধারে তারা পানি সরবরাহ করে এবং চামড়ার পানিপাত্র বোঝাই করে দেয়। আমীর ও অন্যান্য পদস্থ ব্যক্তিদের নিজস্ব পানির আধার আছে। অপর ব্যক্তিরা নিজেদের প্রয়োজনে নির্দিষ্ট মূল্যে পানি ক্রয় করে নেয়।
এ মরুপথটির ভয়ে তাবুক ত্যাগের পর কাফেলা রাতদিন দ্রুত চলতে থাকে। অর্ধপথ অতিক্রমের পর আল-উখায়দির উপত্যকায় পৌঁছা যায়। একে দোজখের উপত্যকা বলা চলে (আল্লাহ্ এর থেকে আমাদের রক্ষা করুন (৬৩))। এক বছর সাইমুমের কবলে তীর্থযাত্রীরা এখানে ভয়ঙ্করভাবে বিপন্ন হয়। পানি শুকিয়ে যায় এবং একবারমাত্র পানের উপযোগী পানির মূল্য হাজার দিনারে পৌঁছে। কিন্তু অতঃপর ক্রেতা। ও বিক্রেতা উভয়ই ধ্বংসের কবলে পতিত হয়। এ উপত্যকায় একটি প্রস্তরখণ্ডে তাদের কাহিনী খোদিত আছে।
তাঁবুক থেকে যাত্রার পাঁচদিন পরে কাফেলা আল-হিজর কূপের কাছে পৌঁছে। আল-হিজর কূপে প্রচুর পানি আছে কিন্তু কেউ তা তুলে ব্যবহার করে না। তাবুক অভিযানের সময় পয়গম্বর (সাঃ) এখান দিয়া গমন করেন এবং এ কূপের পানি পান করতে সঙ্গীদের বারণ করে দেন।(৬৪)
আল-হিজর থেকে (৬৫) অর্ধদিন বা তার চেয়ে কম সময় চলার পরে আল্-উলা পৌঁছা যায়। আল-উলা নামক মনোরম ও বৃহৎ এ গ্রামটিতে খেজুর বাগান ও পানির ঝরণা আছে। নিজেদের পরিধেয় বস্ত্রাদি ধৌতকরণ ও প্রয়োজনীয় খাদ্যাদি সংগ্রহের জন্য যাত্রীরা এখানে চার দিন অপেক্ষা করে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্য বা অপর কিছু। সঙ্গে থাকলে যাত্রীরা তা এখানে রেখে যায়। এ গ্রামের বাসিন্দারা সবাই বিশ্বস্ত। সিরিয়ার খ্রীস্টান ব্যবসায়ীগণ এ স্থান অবধি আসতে পারে এবং এর বেশী অগ্রসর হতে পারে না। তারা যাত্রীদের কাছে খাদ্য ও অন্যান্য দ্রব্যাদি বিক্রয় করে। আল্-উলা ত্যাগের তৃতীয় দিনে কাফেলা মদিনা শরিফের উপকণ্ঠে গিয়ে হাজির হয়।
সেই দিন বিকালেই আমরা পবিত্রস্থানে বিখ্যাত মসজিদে হাজির হলাম। শাস্তির দরজায় আমরা আমাদের অন্তরের শ্রদ্ধা নিবেদন করে হজরতের (সাঃ) রওজা মোবারক ও পবিত্র মিম্বারের মধ্যবর্তী প্রসিদ্ধ ‘বাগানে’ প্রার্থনা করলাম। অতঃপর হজরত (সাঃ) যে খেজুর গাছটির পাশে দাঁড়িয়ে খোতবা পাঠ করতেন তার ধ্বংসাবশেষ শ্রদ্ধাভরে স্পর্শ করলাম।
এ যাত্রায় আমরা মদিনায় চারদিন অবস্থান করলাম। চার দিনই আমরা পবিত্র। মসজিদে রাত্রিযাপন করলাম। মসজিদের চত্বরে যাত্রীরা বহুসংখ্যক মোমবাতি জ্বেলে বৃত্তাকারে বসে পবিত্র কোরআন পাঠ করে, সুর করে দরুদ শরীফ পড়ে বা পবিত্র রওজা জেয়ারত করে।
অতঃপর মদিনা থেকে আমরা পবিত্র মক্কার পথে রওয়ানা হলাম। পাঁচ মাইল দূরে ধুনা-হুজায়ফা মসজিদে গিয়ে আমরা অবস্থান করলাম। এখানেই আমাদের পয়গম্বর। (সাঃ) হজের বস্ত্র পরিধান করেন এবং অন্যান্য বাধ্যবাধকতা পালন করেন। আমিও এখানে সেলাই করা বস্ত্রাদি ত্যাগ করে গোসল করলাম। পরে হজের জন্য নির্দিষ্ট বস্ত্র পরিধান করে নামাজ আদায় করে নিজেকে হজের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করলাম। আমাদের যাত্রার চতুর্থ বিরতিস্থান হল বদর। এখানেই খোদা তার প্রিয় পয়গম্বরকে সাহায্য করেন। এবং নিজের প্রতিজ্ঞা রক্ষা করেন।(৬৬) বদর একটি গ্রাম। কয়েকটি খেজুর বাগান ও ঝরণা থেকে উৎসারিত একটি নহর এখানে আছে। এখান থেকে আমাদের পথ শুরু হয় ভয়াবহ বাজওয়া উপত্যকার মধ্য দিয়ে। বাজওয়া ছেড়ে তিন দিন চলার পর রাবিখ উপত্যকা। এখানে বৃষ্টির পানি জমে একটি পুকুরের সৃষ্টি হয় এবং অনেক দিন অবধি পানি থাকে। এখানে এসে মিসরের এবং আফ্রিকার উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের হজযাত্রীরা হজের বস্ত্র পরিধান করে। রাবিক ত্যাগের তিন দিন পরে আমরা খুলার জলাশয়ে পৌঁছি। সমতল ভূমিতে অবস্থিত খুলায় অনেক খেজুর বাগান আছে। আশেপাশের বেদুঈন অধিবাসীদের দ্বারা এখানে একটি বাজারের সৃষ্টি হয়েছে। বেদুঈনরা এখানে। ভেড়া, ফলমূল ও মসল্লাদি বিক্রয়ের জন্য আনে। এখান থেকে উসফান হয়ে আমরা মার-ভী(৬৭) নামক উপত্যকায় পৌঁছলাম। মার উপত্যকাটি বেশ উর্বর। এখানে বহু খেজুর বাগান ও একটি ঝরণা থেকে উৎসারিত নহর আছে। এখান থেকে সারা এলাকায় পানি সেচনের কাজ চলে। এ উপত্যকা থেকেই মক্কার পবিত্র তীর্থে হাজির হলাম। গন্তব্যস্থানে পৌঁছবার অদম্য আশায় ও আনন্দে তখন অন্তর আমাদের ভরপুর। ভোরে আমরা গিয়ে মক্কা শরীফ হাজির হলাম এবং তৎক্ষণাৎ পবিত্র কাবা গৃহে প্রবেশ করে হজের পালনীয় কর্তব্যাদি সম্পাদনে রত হলাম।(৬৮)
