দামেস্ক শহরে ধর্মের নামে দান-খয়রাতের পরিমাণ ও প্রকার মানুষের ধারণার অতীত। অক্ষম হজযাত্রীদের অর্থসাহায্য, বদলা হজের জন্য সাহায্য, কন্যার বিবাহের দান দেহাজ দেবার জন্য দরিদ্র পিতা-মাতাকে সাহায্য, গোলাম আজাদ করার উদ্দেশ্যে সাহায্য, মুসাফেরদের আহার, বাসস্থান ও স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের জন্য সাহায্য। এসব ছাড়াও আছে রাস্তাঘাটের উন্নতি বিধান ও রাস্তাঘাট পাকা করার সাহায্য। কারণ, দামেস্কের সকল রাস্তারই দুপার পাকা। পথচারীরা সেখান দিয়া যাতায়াত করে, মধ্যের অংশ ব্যবহার করে অশ্বারোহীরা। এসব ছাড়াও আছে অন্যান্য দাঁতব্য ব্যাপার। একদিন দামেঙ্কের এক গলিপথে যেতে যেতে আমি দেখতে পেলাম, একটি ছোট গোলাম একটি চীনা মাটির বাসন হাত থেকে ফেলে ভেঙ্গে ফেলেছে। তাই দেখে কয়েকজন লোক তাকে ঘিরে ধরেছে। তাদের একজন লোক ছেলেটিকে বলল, “বাসনের টুকরাগুলি কুড়িয়ে নিয়ে তৈজসপত্রের দানের যিনি জিম্মাদার তার কাছে যাও।” ছেলেটি তাই। করল। পরে ঐ লোকটি তাকে নিয়ে জিম্মাদারের কাছে গেলে ভাঙ্গা পাত্রের টুকরাগুলি পরীক্ষা করে তিনি ছেলেটিকে টাকা দিয়ে দিলেন। কারণ, এরকম ব্যবস্থা না থাকলে। ছেলেটিকে মনিবের প্রহার অথবা গালাগাল নিশ্চয়ই সহ্য করতে হত। তাছাড়া এ ঘটনার জন্য ছেলেটিও মনমরা হয়ে যেত। এ রকম দান মানুষের অন্তরের ক্ষত আরোগ্য করে। ভাল কাজের জন্য যারা দান করেন খোদা তাদের পুরস্কৃত করুন।
মসজিদ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বিদ্যালয়, সমাধিস্তম্ভ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠার কার্যে দামেস্কবাসীরা একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে। উত্তর আফ্রিকাবাসীদের সম্বন্ধে তাদের ধারণা খুব উচ্চ। বিনাদ্বিধায় তারা তাদের অর্থ ও স্ত্রীপুত্রের ভার উত্তর আফ্রিকার লোকদের উপর ছেড়ে দেয়। বিদেশীদের প্রতিও তারা খুব ভাল ব্যবহার করে। সম্মানের হানিজনক কোন কাজ যাতে বিদেশীদের না করতে হয় সেদিকে এরা সর্বদাই নজর রাখে। আমি দামেস্কে আসার পর মালিকী সম্প্রদায়ভুক্ত অধ্যাপক নূর উদ্দিন শাখায়ীর সঙ্গে আমার যথেষ্ট বন্ধুত্ব হয়। রমজানের মাসে তিনি আমাকে তার গৃহে এফতার করার নিমন্ত্রণ করেন। চারদিন তার গৃহে এফতার করার পর আমি জ্বরাক্রান্ত হয়ে পঞ্চম দিনে। অনুপস্থিত থাকতে বাধ্য হই। তিনি আমার সংবাদ নিতে পাঠান। অসুখের কথা বলে পাঠালে তিনি তা মেনে নিতে নারাজ হন। কাজেই আমাকে পুনরায় সেখানে যেতে হয় এবং তাঁর গৃহে রাত্রি যাপন করতে হয়। পরের দিন ভোরে আমি বিদায় নিতে চাইলে তাতেও অসম্মতি জানিয়ে তিনি বললেন, “আমার বাড়িটাকে আপনার নিজের ভাইয়ের বা পিতার বাড়ী বলে মনে করে নিন।” এই বলে তৎক্ষণাৎ তিনি একজন ডাক্তার ডেকে পাঠালেন। হুকুম দিলেন ডাক্তার যে ঔষধ পথ্যের ব্যবস্থা করবেন তার সবই আমার জন্য তৈরি হবে তার বাড়িতে। এভাবে রোজা শেষ হওয়া অবধি আমাকে তাঁর সঙ্গে। থাকতে হ’ল। সেখানে ঈদের উৎসব উদযাপনের পরে খোদা আমাকে নিরাময় করলেন। ইত্যবসরে আমার ব্যয়নির্বাহের জন্য যে অর্থ ছিল তা সবই নিঃশেষ হয়ে গেছে। নুরউদ্দিন তা জানতে পেরে আমাকে উটভাড়া করে দিলেন এবং প্রয়োজনীয় আরও সবকিছু দিয়ে কিছু অর্থও দিলেন। দিয়ে বললেন, “পথে কোন রকম বিপদ আপদে প্রয়োজনের সময় কাজে লাগবে।” খোদা যেন তাকে পুরস্কৃত করেন।
জানাজার শোকযাত্রার সময় দামেস্কবাসীরা অত্যন্ত প্রশংসনীয়ভাবে নিয়ম পালন। করে। সুললিত কণ্ঠে তারা কোরআন আবৃত্তি করতে করতে লাশের খাটের পুরোভাগে থেকে অগ্রসর হয় এবং গীর্জা ও মসজিদে গিয়ে জানাজা আদায় করে। জানাজা শেষ হলে মোয়াজ্জিন উঠে বলেন, “অমুক জ্ঞানী ও ধর্মপ্রাণ ব্যক্তির জন্য প্রার্থনা করুন।” এই বলে মৃতকে গুণবাচক বিশেষণে ভূষিত করে প্রার্থনা সমাপন করার পরে কবরে সমাহিত করে।
ভারতে এর চেয়েও প্রশংসনীয়ভাবে মৃতকে সমাহিত করা হয়। মৃত্যুর তৃতীয় দিবস ভোরে তারা গোরস্থানে জমায়েত হয়। সেখানে সুদৃশ্য কাপড় বিছিয়ে দেওয়া হয় এবং কবরের উপরেও দেওয়া হয় কাপড়ের আচ্ছাদন। কবর আবৃত করা হয় গোলাপ ও নানা রকম সুগন্ধি ফুলে। কারণ, ফুল সেখানে বারমাসেই পাওয়া যায়। তারা লেবুগাছ বা ঐ জাতীয় গাছ নিয়ে আসে এবং তখন গাছে ফল না থাকলে ফল এনে গাছে বেঁধে দেয়। শোকযাত্রীদের ছায়া দেবার জন্য মাথার উপরে থাকে চাঁদোয়া। কাজী, আমীর ও অন্যান্য পদস্থ ব্যক্তিরা এসে আসন গ্রহণ করেন। কোরআন পাঠের পর কাজী উঠে। মৃতের কথা বলে, তার মৃত্যুতে শোকপূর্ণ গাথায় তার জন্য শোক প্রকাশ করে সর্বশেষ মৃতের আত্মীয়দের সান্ত্বনা দিয়ে ও সুলতানের জন্য প্রার্থনা করে কর্তব্য সম্পাদন করে। যখন সুলতানের নামোচ্চারণ করা হয় তখন শ্রোতারা সবাই উঠে সুলতানের বাসস্থানের দিকে মাথা নোয়ায়। অতপর কাজী আসন গ্রহণ করলে কাজীর থেকে শুরু করে সবাইকে গোলাপ জল ছিটিয়ে দেওয়া হয়। তারপর শরবত এনে প্রথমে কাজীকে এবং পরে সবাইকে বিতরণ করা হয়। সর্বশেষে দেওয়া হয় পান। পানকে তারা শ্রদ্ধার চোখে দেখে এবং সম্মানের চিহ্ন স্বরূপ মেহমানদের পান দেওয়া হয়। সুলতানের নিকট হতে অর্থ বা পোশাক-পরিচ্ছদের চেয়ে এনাম স্বরূপ পান পাওয়া অধিকতর সম্মানজনক। কোন ব্যক্তি এন্তেকাল করলে এ দিনের অনুষ্ঠান হবার পূর্বে তার পরিবারের কেউ পান খায় না। অনুষ্ঠানের পরে কাজী কয়েকটি পানপত্র গ্রহণ করে মৃতের ওয়ারীশদের হাতে দেন। অতঃপর শোকযাত্রীরা স্ব-স্ব গৃহে ফিরে যায়।
