‘জেরুন দরজা’টির অপর নাম ‘ঘন্টার দরজা’। জেরুন দরজা অতিক্রম করলেই ডানদিকে উপরে প্রকাণ্ড খিলানের আকারে নির্মিত গ্যালারী বা বারান্দা। বৃহদাকার খিলানটার মধ্যে অনেকগুলি ক্ষুদ্রাকার অনাবৃত খিলান। এক দিনে যত ঘন্টা ক্ষুদ্রাকার খিলানের সংখ্যা ঠিক ততটি। এসব খিলানের একটি করে দরজা। দরজার ভিতর দিক। সবুজ এবং বাইরের দিক হলদে রঙ্গে রঞ্জিত। দিনের একটি ঘন্টা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে একটি খিলানের দরজার ভিতরের সবুজ দিক ঘুরিয়ে বাইরের দিক করে দেওয়া হয়, তখন হলদে দিকটি যায় ভিতর দিকে। লোকে বলে, বারান্দায় একজন লোক থাকে। ঘন্টা শেষ হলে সে হাত দিয়ে দরজা(৫৫) ঘুরিয়ে দেয়।
পশ্চিম দিকে দরজাটি Door of the Post (থামের দরজা) নামে পরিচিত। এ দরজার বাইরের পথে রয়েছে মোমবাতি প্রস্তুতকারক ও ফল বিক্রেতাদের দোকান। উত্তরের দরজাটি মিঠাইওয়ালাদের দরজা’ নামে পরিচিত। এ দরজার বাইরেও রয়েছে একটি প্রশস্ত রাস্তা, তার ডাইনে পানির বৃহৎ চৌবাচ্চা ও চলমান পানিসহ শৌচাগারযুক্ত খানকাহ, মসজিদের চারটি দরজার প্রত্যেকটিতেই একটি দালানে ওজুর ব্যবস্থা ও দালানে চলমান পানি সরবরাহের ব্যবস্থাযুক্ত প্রায় একশত কুটরী আছে।
সে সময়ে তকি উদ্দিন ইব্নে তায়মিয়া নামে দামেস্কে একজন হাম্বলী ধর্মশাস্ত্রবিদ ছিলেন। তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল কিন্তু মাথায় ছিল সামান্য ছিটু। দামেস্কের লোকেরা তাকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করত। তাদের সামনে উপস্থিত হয়ে মিম্বারে দাঁড়িয়ে তিনি ধর্মসম্বন্ধে। বক্তৃতা দিতেন। একবার তার কোন বক্তব্যের সঙ্গে অন্যান্য ধর্মশাস্ত্রবিদরা একমত হতে পারলেন না। বিষয়টি সুলতানের গোচরীভূত করলে তিনি ইব্নে তায়মিয়াকে কয়েক বছরের জন্য কারারুদ্ধ করে রাখেন। কারারুদ্ধাবস্থায় তিনি কোরআনের তফসির লেখেন। এবং চল্লিশ খণ্ডে সমাপ্ত সেই তফসিরের নাম রাখেন সদ্র। অতঃপর ইব্নে তায়মিয়ার মাতা সুলতানের সঙ্গে দেখা করে তায়মিয়ার মুক্তিকামনা করেন। ইব্নে তায়মিয়া পুনরায় অনুরূপ অপরাধ না করা পর্যন্ত মুক্তই ছিলেন। এক শুক্রবার তায়মিয়া যখন মিম্বার থেকে খোত্ব পড়ে মুছাল্লিদের শোনাচ্ছিলেন তখন আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। খোবার মধ্যে তিনি বললেন, “আমি যে ভাবে অবতরণ করছি ঠিক সেই ভাবে খোদাও আমাদের মাথার উপরের আকাশে অবতরণ করেন।” বলেই তিনি মিম্বার থেকে এক ধাপ নিচে নেমে এলেন। একজন মালেকী সম্প্রদায়ের শাস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তি তার প্রতিবাদ করলেন এবং তাঁর কথায় ঘোর আপত্তি উত্থাপন (৫৬) করলেন। উপস্থিত সাধারণ শ্রোতারা শেষোক্ত ব্যক্তির উপর ক্ষেপে গিয়ে তাঁকে যথেচ্ছভাবে প্রহার করতে লাগল। প্রহারের সময় তার মাথার পাগড়ীটি পড়ে যায়। পাগড়ীর তলায় লোকটির মাথায় ছিল একটি রেশমি টুপি। রেশম ব্যবহারের জন্য (৫৭) তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গেল হাম্বলীদের কাজীর কাছে। কাজী লোকটিকে কারাগারে বন্দী করে প্রহারের হুকুম দিলেন। এ ব্যবহারের প্রতিবাদ করলেন অপরাপর শাস্ত্রবিদগণ। তারা বিষয়টি প্রধান আমীরের গোচরীভূত করলেন। তিনি সমুদয় লিখে পাঠালেন সুলতানের কাছে। অধিকন্তু তায়মিয়া বিভিন্ন সময়ে যে সব আপত্তিকর উক্তি করেছেন তারও একটি ফিরিস্তি সুলতানের নিকট দাখিল করলেন। সুলতান তায়মিয়াকে দূর্গে বন্দী রাখবার হুকুম। দিলেন। তায়মিয়া আমরণ সে দূর্গে বন্দী ছিলেন।(৫৮)
দামেস্কের আর একটি পবিত্র স্থান পদচিহ্ন মসজিদ (আল্-আকদাম)। শহর থেকে দু’মাইল দক্ষিণে হেজাজ, জেরুজালেম ও মিসর যাবার পথে এ মসজিদটি স্থাপিত। দামেস্কবাসীরা সুবৃহৎ এ মসজিদটিকে বিশেষ সম্ভ্রমের চোখে দেখে। একখণ্ড পাথরের উপর অঙ্কিত যে পদচিহ্নের জন্য মসজিদের নামকরণ হয়েছে সেগুলি হরজত মূসার পদচিহ্ন বলে কথিত। এ মসজিদের ক্ষুদ্র একটি কক্ষে এক খণ্ড পাথরের খোদিত আছে–”কোন একজন ধার্মিক লোক একরাত্রে হজরত রসূলুল্লাকে স্বপ্নে দেখেন। তখন রসূলুল্লাহ বলেন, এখানে আমার-ভাই মুসার কবর আছে।’ এ মসজিদটিকে দামেস্কবাসীরা সত্যই কি রকম শ্রদ্ধার চোখে দেখে তার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখেছিলাম ১৩৪৮ খ্রীস্টাব্দের জুলাই মাসের শেষাশেষি দামেস্ক হয়ে ফিরবার পথে। দামেস্কের তত্ত্বালীন শাসনকর্তা আরগুন শাহ্ ঢোল শহরৎ যোগে রাষ্ট্র করে দিলেন, দামেস্কের সবাইকে তিনদিন রোজা রাখতে হবে এবং উক্ত তিন দিন বাজারে কেউ কোন রকম খাদ্যদ্রব্য তৈরি করতে পারবে না।(৫৯) কারণ সেখানকার অধিকাংশ লোকই বাজারে তৈরি খাদ্য ছাড়া আর কিছু গ্রহণ করে না।(৬০) শাসনকর্তার হুকুম মত সবাই একাদিক্রমে তিন দিন রোজা রাখল। শেষের দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। সেদিন। দামেস্কের আমীর, শরিফ, কাজী, মোল্লা থেকে শুরু করে সাধারণ লোক অবধি নারী পুরুষ শিশু বৃদ্ধ নির্বিশেষে প্রধান মসজিদে গিয়ে হাজির হল। সেখানে সারারাত তারা। খোদার এবাদত বন্দেগীতে কাটাল। পরের দিন সেখানে ফজরের নামাজ সেরে পুনরায় তারা মিছিল করে রওয়ানা হল পদচিহ্নের মসজিদের দিকে। এ মিছিলে খালি পায়ে আমীর ওমরাহ সবাই এসে যোগদান করল। মুসলমানগণ চলল কোরআন হাতে, খ্রীস্টানগণ বাইবেল হাতে এবং য়িহুদীগণ তাদের কেতাব হাতে। সবারই সঙ্গে পরিবারের নারী ও শিশুরা রয়েছে। সবাই কেঁদে কেঁদে স্ব স্ব ধর্মগ্রন্থের ও পয়গম্বরের দোহাই দিয়ে খোদার করুণা ভিক্ষা করতে লাগল। এমনি করে প্রায় দ্বিপ্রহর অবধি তারা সেখানে কাটাল। অতঃপর তারা শহরে ফিরে এসে শুক্রবারের জুমা নামাজ আদায় করল। এর ফলে খোদা তাদের দুঃখের লাঘব করেছিলেন। দামেস্ক শহরে একদিনে মৃত্যুসংখ্যা কখনও দু’হাজারের উপরে উঠত না, অথচ কায়রো ও পুরাতন কায়রো। শহরে দৈনিক মৃত্যুসংখ্যা চব্বিশ হাজারে উঠত।
