অতঃপর আমি লাঠিকিয়া (Lataka] শহরে গেলাম। শহরের বাইরে খ্রীস্টানদের একটি মঠ আছে। মঠটি দার-আল-ফাস্ নামে পরিচিত। সিরিয়া এবং মিসরের মধ্যে। এটিই বড় মঠ। খ্রীস্টান সাধুরা এখানে বাস করে এবং বিভিন্ন দেশের খ্রীস্টানরা এখানে তীর্থ করতে আসে। খ্রীস্টান বা মুসলমান যারাই এখানে আসে তাদেরই খাবার দেওয়া হয়। খাবার হল রুটী, পনির, জলপাই এবং সিকা। লাঠিকিয়ার পোতাশ্রয়টি দুটি টাওয়ার বা স্তম্ভের মধ্যে শিকল বেঁধে বন্ধ করে রাখা হয়। শিকলটি নিচু করে না দেওয়া পর্যন্ত কোন জাহাজ যেতে বা আসতে পারে না। এটি সিরিয়ার একটি প্রসিদ্ধ পোত্রয়। এখান থেকে আমি যাই আল-মারফাব (Beluedere) দূর্গে। কারাকের। দূর্গের মত এটিও একটি প্রসিদ্ধ দূর্গ। একটি উঁচু পাহাড়ের উপর দূর্গটি নির্মিত হয়েছে। বিদেশী মুসাফেররা এলে এর উপকণ্ঠে আশ্রয় পায়, ভেতরে প্রবেশের অনুমতি পায় না। আল-মালিক আল-মনসুর কালাউন এ দূর্গটি খ্রীস্টানদের নিকট থেকে অধিকার করেন। এ দূর্গের নিকটেই তার পুত্র, মিসরের বর্তমান সুলতান আল-মালিক আন্-নাসিরের জন্ম হয়। এখান থেকে আমি আল-আকরা পর্বত দেখতে পাই। আল-আরা সিরিয়ার সর্বোচ্চ পর্বত। সমুদ্র থেকে দেশের যে অংশটি দৃষ্টিগোচর হয় সে অংশেও এত বড় পর্বত আর নেই। পার্বত্যাঞ্চলের অধিবাসীরা তুর্কীমেন। এখানে ঝরণা এবং নহর। আছে।
অতঃপর আমি লুবনান (Lebanon) পর্বতে যাই। পৃথিবীর সবচেয়ে উর্বর পর্বতশ্রেণী এই লুবনান। এখানে সবরকম ফলমূল জন্মে এবং অনেক ঝরণা ও লতাকুঞ্জ আছে। এখানে সব সময়েই বহুসংখ্যক ধর্মনিষ্ঠ লোক যাতায়াত করে এবং এজন্যই স্থানটি প্রসিদ্ধ।
এখান থেকে আমি বা-আবেক শহরে এলাম। বা-আলবেক দামাস্কের মতই সুখ সুবিধাযুক্ত একটি পুরাতন শহর। এখানকার মত এত প্রচুর চেরী কোন জেলায়ই জন্মে না। এখানে বহুরকম মিষ্টি তৈরি হয়। তাছাড়া এখানকার বস্তু, কাঠের পাত্র ও চামচ সর্বোকৃষ্ট। এখানকার কারিগরেরা এক রকম থালা তৈরি করে একটির ভেতর আরেকটি করে দশটি অবধি এভাবে সাজিয়ে রাখে যে, দেখলে একখানা থালা বলেই মনে হয়। চামচও তারা এমনি করেই তৈরি করে এবং চামড়ার থলেতে রেখে দেয়। একজন লোক তার কোমরবন্দের মধ্যেই এগুলো রাখতে পারে। পরে প্রয়োজন মত বের করলে দেখা যাবে একটি চামচ কিন্তু সে তখন তার অপর নয় জন বন্ধুকেও নয় খানা চামচ দিতে পারবে। দ্রুত হেঁটে গেলে বা-আলবাক থেকে দামেস্ক একদিনের পথ। বা-আলবাক ছেড়ে কাফেলা আজ-জাদানী নামক ছোট্ট একটি গ্রামে গিয়ে রাত্রি যাপন করে এবং পরের দিন ভোরে দামেস্কে পৌঁছে। দামেস্কে যাওয়ার জন্য আমি উদ্বিগ্ন ছিলাম বলে বিকেল বেলা বা-আলবাক পৌঁছে পরের দিন ভোরেই পথে বেরিয়ে পড়ি।
মঙ্গলবার ৯ই রমজান, ৭২৬ হিজরী (৯ই আগস্ট, ১৩২৬ খ্রঃ) আমি দামেঙ্কে প্রবেশ করলাম এবং আশ শারাবিসিয়া বিদ্যালয়ে আশ্রয় গ্রহণ করলাম। সৌন্দর্যে দামেস্ক শহর অন্যান্য সমস্ত শহরের শীর্ষস্থানে। এ শহরের শোভা-সৌন্দর্য বর্ণনার অতীত। ইব্নে জুবাইর(৫২) এ শহরের যেভাবে সৌন্দর্য বর্ণনা করেছেন তার চেয়ে ভাল বর্ণনা আর হতে পারে না। এখানকার উন্মিয়া মসজিদ নামে পরিচিত গীর্জা মসজিদটি জগতে অতুলনীয়। গঠন-পারিপাট্যে ও বহি সৌন্দর্যে মসজিদটি সর্বোৎকৃষ্ট এবং অদ্বিতীয়। খলিফা প্রথম ওয়ালিদ (৭০৫-৭১৫) এ মসজিদ স্থাপন করেন। মসজিদ প্রস্তুতের জন্য তিনি কনস্টান্টিনোপলের ম্রাটের কাছে কারিগর চেয়ে পাঠান। ম্রাট এ কাজের জন্য বার হাজার দক্ষ কারিগর দামেস্কে পাঠান। মসজিদ যেখানে স্থাপিত আছে পূর্বে সেখানে। একটি গীর্জা ছিল। মুসলমানরা যখন দামেস্ক অধিকার করে তখন একজন সেনানায়ক। তরবারী হস্তে গীর্জার একদিকের দরজা দিয়ে প্রবেশ করে মধ্যদেশ অবধি পৌঁছে। কাজেই গীর্জার যে অর্ধাংশ মুসলমানরা বলপ্রয়োগে দখল করে সে অর্ধাংশ মসজিদে
পরিণত করে এবং বাকি যে অংশে তারা শান্তিপূর্ণভাবে প্রবেশ করে সে অংশ গীর্জাই। থেকে যায়। অতঃপর ওয়ালিদ সমগ্ৰ গীর্জা ব্যাপিয়া মসজিদটি সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে যে। কোন মূল্যে গীর্জাটি ক্রয়ের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু গ্রীকগণ তাহাতে সম্মত হয় না। তখন খলিফা গীর্জাটি অবরোধ করতে বাধ্য হন। খ্রীস্টানগণ তখন বলতে থাকে যে, এ গীর্জা যে নষ্ট করবে সে উন্মাদ রোগে আক্রান্ত হবে। এ কথা ওয়ালিদের কানে গেলে তিনি বললেন, ‘আল্লাহর খেদমত করতে আমিই প্রথম উন্মাদ হতে চাই।’ এই বলে তিনি কুঠার হস্তে নিজে গীর্জাটি ভাঙ্গতে আরম্ভ করেন। তখন অন্য মুসলমানরা তার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে এবং খ্রীস্টানদের ধারণা যে অলীক তা প্রমাণ করে।(৫৩)
এ মসজিদের চারটি প্রবেশদ্বার। দক্ষিণ দ্বারটি ‘বৃদ্ধির দ্বার’ নামে খ্যাত। দরজার সামনেই প্রশস্ত একটি পথ আছে। সেখানে পুরাতন জিনিস এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দোকানপাট আছে। এ পথেই পূর্বেকার অশ্বারোহী সৈন্যদের বাসস্থানে যেতে হতো। এখান থেকে বেরিয়েই তাম্রনির্মিত জিনিসপত্রের কারিগর বা কাঁসারীদের। বাজার। মসজিদের দক্ষিণ দিক অবধি প্রসারিত এ বাজারটি দামেস্কের অন্যতম সুন্দর বাজার। মাবিয়া খলিফার আল-খাদূরা (সবুজ প্রাসাদ) নামক প্রাসাদের স্থানে। বাজারটি স্থাপিত হয়েছে। আব্বাসিকগণ প্রাসাদ ধ্বংস করে এখানে বাজার স্থাপন। করে। মসজিদের পূর্বদিকের সুবৃহৎ দরজাটি ‘জেরুন দরজা’ নামে পরিচিত। এখান থেকে একটি প্রশস্ত রাস্তা স্তম্ভশ্রেণীর ভেতর দিয়ে ছয়টি সুউচ্চ স্তম্ভের মধ্যস্থ প্রবেশদ্বার পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে। রাস্তাটির উভয় পার্শ্বস্থ স্তম্ভের উপরে গোলাকৃতি বারান্দা বা। গ্যালারী। এসব বারান্দায় বস্ত্র বিক্রেতা এবং অন্যান্যদের দোকান। তার উপরে লম্বা বারান্দায় রয়েছে স্বর্ণকার, পুস্তক বিক্রেতাদের দোকান এবং সুদৃশ্য কাঁচের জিনিসের দোকান। প্রথম দরজা সংলগ্ন চত্বরে দলিলপত্রাদি সম্পাদনকারী কর্মচারীদের কার্যালয়। প্রত্যেক কার্যালয়ে পাঁচ ছয় জন করে সাক্ষী মোতায়েন রয়েছে আর রয়েছে বিবাহাদি অনুষ্ঠানের জন্য কাজীর দ্বারা ক্ষমতাপ্রাপ্ত একজন কর্মচারী। দলিলপত্র সম্পাদনের কার্যালয় শহরের অন্যান্য জায়গায়ও আছে। এসব দোকানের কাছেই মনোহারী বাজার। সেখানে কাগজ, কলম, কালি বিক্রয় হয়। পথের মধ্যস্থলে মার্বেল পাথরের গোলাকার একটি প্রকাণ্ড চৌবাচ্চা। চৌবাচ্চা আবেষ্টন করে রয়েছে মার্বেল পাথরের উপর স্থাপিত ছাদবিহীন চত্বর। চৌবাচ্চাটির মধ্যস্থলে একটি তামার নল। নলটির মুখ দিয়ে সজোরে পানি নির্গত হয়ে মানুষ সমান উঁচুতে উঠে ছড়িয়ে পড়ে। লোকেরা একে Waterspoul বলে। দৃশ্যটি সত্যই মনোরম।
