ত্রিপলি থেকে হিস-আল্ আকরাদ (এখন কালাতে-আল্-হিস) ও হিস হয়ে আমরা হামা পৌঁছলাম। হামা সিরিয়ার অপর একটি প্রসিদ্ধ শহর। শহরটি ফলের বাগ বাগিচায় ঘেরা। এখানে গোলকাকার ও ঘূর্ণায়মান অনেকগুলি (water wheel) আছে। সেখান থেকে আমরা মা’রা এসে হাজির হলাম। মারা যে এলাকায় অবস্থিত সে। এলাকায় একশ্রেণীর শিয়া বাস করে। তারা দশ সাহাবা’কে ঘৃণার চোখে দেখে এবং ‘ওমর’(৪৪) নামধারী লোকমাত্রই ঘৃণা করে। মারা থেকে আমরা যাই সারমিন। সারমিনে সাবান প্রস্তুত হয় এবং দামাস্কাস ও কায়রোতে রপ্তানী হয়। হাত ধোবার উপযোগী সুগন্ধি সাবানও এখানে প্রস্তুত হয়। এ সাবান তারা লাল ও হলদে রঙে রঞ্জিত করে। এখানকার বাসিন্দারাও দশ সাহাবাকে ঘৃণা করে। একটি তাজ্জব ব্যাপার এই যে, এরা। দশ’ শব্দটিও উচ্চারণ করে না। দালালরা যখন নীলামে কোন জিনিস বিক্রি করতে যায় তখন বাজারে তারা নয়ের পর দশ না বলে নয় আর এক’ বলে। একদিন সেখানে একজন তুর্কী উপস্থিত ছিল। এক দালালকে নয় আর এক বলতে শুনেই সে তার। হাতের লাঠিটা দালালের মাথার কাছে তুলে বলল, “বল দশ!” তাতে লোকটি বলল, “লাঠির সঙ্গে দশ।”
সেখান থেকে আমরা এলাম হালাব (Aleppo) (৪৫)। এখানে মালিক-উল-উমারার ঘাঁটি অবস্থিত। তিনি ছিলেন মিসরের সুলতানের প্রধান সেনানায়ক। তিনি সুবিচারক ছিলেন এবং তার ন্যায় বিচারের অনেক সুখ্যাতি আছে কিন্তু তিনি একজন ব্যয়কুণ্ঠ ব্যক্তি ছিলেন।
এলেপ্পো থেকে রওয়ানা হয়ে তুকমনদের(৪৬) নবনির্মিত শহর তিজিন হয়ে আমরা পৌঁছলাম অ্যানটাকিয়া (Antioch)। সিরিয়ার শহরগুলির ভেতর একমাত্র এ্যান্টিকয়ক। সুদৃঢ় প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত ছিল। কিন্তু আল মালিক আজ-জহির (বেবার্স) যখন এ শহরটি অধিকার করেন তখন তিনি ঐ প্রাচীর ভেঙ্গে ফেলেন।(৪৭) সুন্দর-সুন্দর অট্টালিকা। বিশিষ্ট শহরটি জনবহুল এবং এখানে গাছগাছড়া ও পানির অভাব নেই। সেখানে থেকে আমি বারাস(৪৮) দূর্গ দেখতে যাই। দূর্গটি সিনদের অর্থাৎ আর্মেনিয়ান বিধর্মীদের দেশের প্রবেশপথে অবস্থিত। তাছাড়া কয়েকটি প্রাসাদ এবং আরও কয়েকটি দূর্গে প্রবেশের একই পথ। এখানকার কয়েকটি দূর্গ ইসমাইলিটায় (Ismailites) ফিদায়ী সম্প্রদায়ের(৪৯) লোকদের অধিকারে। উক্ত সম্প্রদায়ভুক্ত লোক ছাড়া কাহারও এসব দূর্গে প্রবেশের অধিকার নেই। তারা সুলতানের তীর স্বরূপ। তাদের সাহায্যেই সুলতান তার শত্রুদের আক্রমণ করেন। শত্রুরা তখন ইরাক ও অন্যান্য দেশে গিয়ে প্রাণরক্ষা করে। সুলতানের এসব লোক নির্দিষ্ট বেতন পেয়ে থাকে। কিন্তু সুলতান যখন তাদের কাউকে কোন শত্রু নিপাত করতে পাঠান তবে তাকে জীবনের মূল্য স্বরূপ অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে থাকেন। কাজ সমাধা করে ফিরে এলে লোকটি সে অর্থ নিজেই গ্রহণ করে কিন্তু লোকটি মারা গেলে সে অর্থ দেওয়া হয় তার পুত্রদের। তাদের কাছে বিষাক্ত ছোরা থাকে এবং তাই দিয়েই তারা শত্রুদের আক্রমণ করে। অনেক সময় তাদের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয় এবং নিজেরাই মৃত্যুর কবলে পড়ে।
ফিদায়ীদের দূর্গ থেকে আমি জাবালা শহরে গেলাম। জাবালা সমুদ্র পার থেকে এক মাইল অভ্যন্তরে অবস্থিত শহর। এ শহরে প্রসিদ্ধ তাপস ইব্রাহিম-ইন-আদ্-হাম-এর কবর আছে। তিনি রাজ্য ত্যাগ করে নিজকে খোদার নামে উৎসর্গ করেছিলেন।(৫০) এখানে যারা আসে তাদের সবাই কবর রক্ষককে অন্ততঃ একটি করে মোমবাতি দিয়ে যায়। তার ফলে বহু মন মোমবাতি এখানে মৌজুদ থাকে। সমুদ্র উপকূলবর্তী এ জেলার অধিকাংশ বাসিন্দা সুনারি (Nusayis) সম্প্রদায়ভুক্ত। তারা হজরত আলীকে খোদা বলে বিশ্বাস করে (৫১)। তারা নামাজ পড়ে না, অজু গোসল করে না এবং রোজাও রাখে না। আল-মালিক আজ-জাহির এখানকার বাসিন্দাদের নিজ গ্রামে মজিদ তৈরী করতে বাধ্য করেছিলেন। তখন তারা বাসগৃহের থেকে অনেক দূরে একটি করে মসজিদ তৈরি করে রাখে। কিন্তু তারা সে মসজিদে কখনও প্রবেশ করে না বা মেরামত করে না। অনেক সময় সে সব মসজিদ তাদের গরু ও গাধার আশ্রয়স্থলরূপে ব্যবহৃত হয়। সময় সময় বিদেশী লোকরা সেসব মসজিদে আশ্রয় লয়। তখন তারা আজান দিতে লাগলে স্থানীয় লোকেরা বিদ্রূপ করে বলে “গাধার মত চীৎকার করো না, তোমার জন্য খড়বিচালী আসছে।” এ শ্রেণীর অনেক লোকের বাস এখানে।
এখানকার লোকদের ভেতর প্রচলিত একটি কাহিনী আছে। একবার একজন অপরিচিত লোক এসে নিজকে এদের কাছে মেহেদী বলে পরিচয় দিল। এ-কথা শুনে তারা এসে লোকটিকে ঘিরে ধরল। সে তখন দেশের মালিক হিসেবে সারা সিরিয়া তাদের ভেতর ভাগ করে দিল এবং প্রত্যেকটি শহরের জন্য তাদের এক-এক জনকে নিযুক্ত করল। অতঃপর তাদের প্রত্যেকের হাতে একটা করে জলপাই গাছের পাতা দিয়ে বলে দিল,”এটা তোমার নিযুক্তির প্রতীক।” এই বলে এক-এক শহরে তাদের এক-এক জনকে পাঠিয়ে দিল।
অতঃপর এদের কেউ কোন শহরে গিয়ে হাজির হলেই সেখানকার শাসনকর্তা তাকে ডেকে পাঠাতেন। লোকটি তখন হাজির হয়েই বলত, “ইমাম-আল-মেহেদী আমাকে এ শহর দিয়েছেন।” শাসনকর্তা জিজ্ঞেস করতেন, “তোমার সনদ কোথায়?” সে তখন জলপাই গাছের পাতাটি বের করে দেখাত। শাসনকর্তা তাকে কারাগারে বন্দী করে রাখতে হুকুম দিতেন। তখন সেই তথাকথিত মেহেদী তাদের যুদ্ধ করতে বলল মুসলমানদের সঙ্গে এবং জাবালাতেই প্রথম শুরু হবে সে যুদ্ধ। তরবারীর পরিবর্তে তিনি তাদের প্রত্যেককে মেদী গাছের ডালা নিয়ে যুদ্ধ করতে বললেন এবং আশ্বাস দিলেন যে, এ ডালাই তাদের হাতে যুদ্ধের সময় তরবারী হবে। এক শুক্রবার যখন মুসলমানরা মসজিদে নামাজে রত ছিল তখন সহসা তারা জাবলায় মুসলমানদের গৃহে হামলা করল এবং মেয়েলোকদের অবমাননা করল। মুসলমানরা এ খবর পেয়ে দ্রুত মসজিদ থেকে বেরিয়ে এসে অস্ত্রধারণ করল এবং যথেচ্ছভাবে তাদের হত্যা করতে লাগল। লাঠিকিয়ায় এ সংবাদ পৌঁছলে শাসনকর্তা তার সৈন্য নিয়ে এসে হাজির হলেন। এদিকে সংবাদবাহী কবুতরের সাহায্যে ত্রিপলীতে সংবাদ পাঠালে প্রধান সেনানায়ক ও একদল সৈন্য নিয়ে তাদের সঙ্গে যোগদান করলেন। বিশ হাজার বিধর্মী নুসারীকে এভাবে হত্যা করা হল। বাকি সবাই পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে এবং প্রধান সেনানায়ককে বলে পাঠায় যে তাদের প্রাণে বাঁচালে তারা মাথা পিছু এক দিনার প্রধান সেনানায়ককে নজরানা দিবে। কবুতরের সাহায্যে তাদের এ-শর্ত পুনরায় সুলতানের কাছে পাঠান হল। সুলতান তাদের কেটে ফেলতে হুকুম দিলেন। তখন প্রধান সেনানায়ক সুলতানকে বুঝিয়ে দিলেন এসব লোক মুসলমানদের জমিজমা চাষাবাদ করত। এদের সবংশে হত্যা করা হলে পরে মুসলমানদের বহু অসুবিধা হবে। এর ফলে লোকগুলির জীবন রক্ষা পেল
