ভোজের দিনে দুঘার অনুষ্ঠানের পরে আসেন কবিরা। গ্রাস নামক গায়কপাখীর অনুকরণে পালকের দ্বারা তৈরী বেশবাসে সজ্জিত হয়ে তারা প্রবেশ করেন। দেখতে। যাতে ব্রাস পাখীর মাথার মতই দেখায় সেজন্যে লাল চক্ষু বিশিষ্ট একটি কাঠের মাথা কবিদের মাথায় বসানো হয়। তারা এই হাস্যকর পোশাকে সজ্জিত হয়ে সুলতানের। সামনে দাঁড়িয়ে নিজ-নিজ কবিতা আবৃত্তি করেন। শুনেছি তাদের সে কবিতা বহুলাংশে খোতবার মত। কবিতায় তারা বলেন, “যে পেপি আজ আপনি দখল করে আছেন সেখানে অমুক-অমুক রাজা এক সময়ে আসন গ্রহণ করেছেন এবং অমুক-অমুক সকাজ করে গেছেন। আপনিও সেরূপ সৎকাজ করুণ যাতে মৃত্যুর পরেও আপনার সুনাম বজায় থাকে।” কবিতা আবৃত্তির পর প্রধান কবি পেপির সিঁড়ির উপরে দাঁড়িয়ে প্রথমে ডান কাঁধে ও পরে বাঁ-কাঁধে নিজের মাথা রাখেন। এ সময়ে কবি নিজের ভাষায় সারাক্ষণই কথা বলতে থাকেন। পরে আবার পেমৃপি থেকে নেমে আসেন। তাদের এ রীতি ইসলাম ধর্ম প্রবর্তনেরও পূর্ব থেকে চলে আসছে এবং আজও অবধি তা বজায় আছে।২৬
মানসা সুলায়মানকে তার লোভের জন্য কাফ্রীরা সবাই না-পছন্দ করত। তার। পূর্ববর্তী সুলতান ছিলেন মান্সা মাঘা এবং তারও পূর্বে রাজত্ব করে গেছেন মানসা মূসা। তিনি ছিলেন দয়ালু ও ন্যায়পরায়ন শাসক। শ্বেতকায় লোকদের তিনি ভালবাসতেন। এবং পারিতোষিক দিতেন২৭। ইনিই আবু ইসহাক আস-সাহিলিকে একদিনে চার হাজার মিকাল দান করেছিলেন। আমি বিশ্বস্তসূত্রে জানতে পেরেছি, তিনি একদিন মাদরিক ইব্নে ফাঁককুসকে হাজার মিকাল দান করেছিলেন। মাদরিক ইব্নে। ফাকুসের পিতামহই মা মূসার পিতামহকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষা দেন।
কাফ্রীরা কতকগুলি প্রশংসনীয় গুণের অধিকারী। কদাচিৎ তাদের অবিচারী হতে দেখা যায়। অবিচারের প্রতি তাদের যেমন ঘৃণা এমন ঘৃণা অন্য কোনো জাতির মধ্যে কমই দেখা যায়। তাদের কেউ সামান্য অবিচারের দোষে দোষী হলেও সুলতান তাকে কখনো ক্ষমা করেন না। তাদের দেশে মানুষের জন্য পূর্ণ নিরাপত্তা বিরাজমান। বিদেশী সফরকারী বা দেশের অধিবাসী–কারও পক্ষেই দস্যুতঙ্কর বা অত্যাচারীর ভয়ে ভীত হওয়ার কারণ নেই। কোনো শ্বেতকায় তাদের দেশে মারা গেলে তার পরিত্যক্ত অপরিমেয় হলেও তারা তা বাজেয়াপ্ত করে না। বরং মৃতব্যক্তির প্রকৃত ওয়ারিশ না পাওয়া পর্যন্ত সে সম্পত্তি তারা বিশ্বাসী কোনো শ্বেতকায় ব্যক্তির হেফাজতে গচ্ছিত। রাখে। যথাসময়ে নামাজ আদায় করা সম্বন্ধে তারা বিশেষ সতর্ক। বিশেষ করে তারা। জামাতে নামাজ আদায় করতে সচেষ্ট থাকে এবং ছেলেমেয়েদের সেরূপ শিক্ষাই দিয়ে থাকে। শুক্রবার মসজিদে যেতে বিলম্ব করলে সে মসজিদের কোথাও ভিড়ের জন্য। দাঁড়াবার জায়গা পায় না। এজন্য সেখানকার রীতি হলো, জায়নামাজসহ আগেই ছেলে বা বালকভৃত্যকে মসজিদে পাঠিয়ে দেওয়া। সে গিয়ে ভাল একটি জায়গায় জায়নামাজ বিছিয়ে রাখে এবং মনিব না-আসা অবধি সেখানে অপেক্ষা করে। খেজুর গাছের মত এক রকম গাছের পাতা দিয়ে তারা নামাজের মাদুর তৈরী করে নেয়। সে গাছ খেজুর গাছের মত হলেও তাতে কোনো ফল হয় না।
তাদের আরও একটি প্রশংসনীয় কাজ হলো, শুক্রবার পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন সাদা পোশাক পরিধান করা। যদি কোনো ব্যক্তি ছেঁড়া একটি কামিজ ছাড়া আর কিছুই না। থাকে তবুও সেটি সযত্নে ধৌত করে সে শুক্রবার জুমার নামাজে যোগদান করবে। এ ছাড়া কোরাণ শরীফ কণ্ঠস্থ করার প্রতিও তাদের যথেষ্ট আগ্রহ। এ-কাজে ছেলেমেয়েদের মধ্যে কোনো শৈথিল্য দেখলে তারা তাদের বেঁধে রাখে এবং কোরাণের পড়া কণ্ঠৰ না করা পর্যন্ত মুক্তি দেয় না। এক পর্বের দিনে আমি কাজির সঙ্গে দেখা করতে তাঁর বাড়ীতে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখলাম তিনি তার ছেলেমেয়েদের বেঁধে রেখেছেন। কাজী সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম, “এদের কি আজ ছেড়ে দেবেন না?”
তিনি বললেন, “কোরাণের পড়া মুখস্থ না-করা অবধি ওদের ছাড়া হবে না।”
তাদের ভেতর কতকগুলি কুরীতিও প্রচলিত আছে। চাকরাণী বাদী বা যুবতী মেয়েরা কোনো রকম বস্ত্র পরিধান বা করেই অবাধে উলঙ্গ অবস্থায় সকলের সামনে আনাগোনা করে। মেয়েরা সুলতানের সামনে যেতেও কোনো রকম আচ্ছাদন ব্যবহারের প্রয়োজন বোধ করে না। এমন কি সুলতানের কন্যারাও উলঙ্গ থাকে। তারপর রয়েছে মাথায় ও গায়ে ধূলা ছড়িয়ে সম্মান প্রদর্শনের রীতি এবং উপরে বর্ণিত কবির জন্সার হাস্যকর অনুষ্টান। তাদের ভেতর অনেকেরই আরেকটি দুষণীয় অভ্যাস হলো গলিত মাংস এবং কুকুর ও গাধার মাংস ভক্ষণ।
আমি মালীতে পৌঁছে ৭৫৩ হিজরীর ১৪ই জমাদিয়ল আউয়াল মাসে (২৮শে জুন, ১৩৫২ খৃষ্টাব্দ) এবং মালী ত্যাগ করি পরের বছরের ২২শে মহরম (২৭শে ফেব্রুয়ারী, ১৩৫৩)। আমার সঙ্গী ছিলেন আবুবকর ইব্নে ইয়াকুব। আমরা মিমার পথে চলতে লাগলাম। আমার একটি উট ছিল। আমি সেই উটে সওয়ার হয়ে যাচ্ছিলাম। কারণ ঘোড়ার মূল্য এখানে খুব বেশী। প্রতিটির মূল্য প্রায় একশ মিশকাল! আমরা প্রশস্ত একটি খালের ধারে এসে পৌঁছলাম। নীলনদ থেকে এ খালটি বয়ে এসেছে। নৌকা ছাড়া এ খাল পার হওয়া যায় না। এখানে মশার উৎপাত খুব বেশী। রাত্রে ছাড়া কেউ পথ চলতে পারে না। এখানে পৌঁছার পর বিশালকায় ষোলটি জন্তু নজরে পড়ল সে গুলিকে হাতী মনে করে আমি বিস্মিত হলাম। কারণ সে দেশে হাতী যথেষ্ট দেখা যায়। পরে দেখতে পেলাম, জগুলি সব খালে গিয়ে নামল। তখন আমার সঙ্গী আবুবকরকে জিজ্ঞেস করলাম, “এগুলি আবার কি রকম জীব?”
