তিনি বললেন,”এগুলি হিপোপোটেমাস, ডাঙ্গায় চড়ে বেড়াতে এসেছে।” হিপোপোটেমাস আকারে ঘোড়ার চেয়ে বড় কিন্তু তাদের কেশরও আছে লেজও আছে। এমন কি তাদের মাথাও ঘোড়ার মাথার মতই, শুধু পা হাতীর পায়ের মত। হিপোপোটেমাস আরেকবার দেখেছিলাম নীলনদ দিয়ে তাবাতু থেকে গাওগাও যাবার পথে। নদীতে সাঁতার কাটতে-কাটতে সেগুলি এক একবার মাথা তুলে জোরে নিঃশ্বাস ছাড়ছিল। নৌকার সোকেরা নদীর কিনার ঘেসে চলছিল, তাদের ভয় পাছে বা হিপোপোটেমাস তাদের নৌকাই ডুবিয়ে দেয়।
তাদের আরও একটি প্রশংসনীয় কাজ হলো, শুক্রবার পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন সাদা। পোশাক পরিধান করা। যদি কোনো ব্যক্তির ছেঁড়া একটি কামিজ ছাড়া আর কিছুই না থাকে তবুও সেটি সযতে ধৌত করে সে শুক্রবার জুমার নামাজে যযাগদান করবে। এ ছাড়া কোরাণ শরীফ কণ্ঠস্থ করার প্রতিও তাদের যথেষ্ট আগ্রহ। এ-কাজে ছেলেমেয়েদের মধ্যে কোনো শৈথিল্য দেখলে তারা তাদের বেঁধে রাখে এবং কোরাণের পড়া কণ্ঠস্ব না করা পর্যন্ত মুক্তি দেয় না। এক পর্বের দিনে আমি কাজির সঙ্গে দেখা করতে তাঁর বাড়ীতে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখলাম তিনি তার ছেলেমেয়েদের বেঁধে রেখেছেন। কাজী সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম, “এদের কি আজ ছেড়ে দেবেন না?”
তিনি বললেন, “কোরাণের পড়া মুখস্থ না-করা অবধি ওদের ছাড়া হবে না।”
তাদের ভেতর কতকগুলি কুরীতিও প্রচলিত আছে। চাকরাণী বাদী বা যুবতী মেয়েরা কোনো রকম বস্ত্র পরিধান বা করেই অবাধে উলঙ্গ অবস্থায় সকলের সামনে আনাগোনা করে। মেয়েরা সুলতানের সামনে যেতেও কোনো রকম আচ্ছাদন ব্যবহারের প্রয়োজন বোধ করে না। এমন কি সুলতানের কন্যারাও উলঙ্গ থাকে। তারপর রয়েছে মাথায় ও গায়ে ধূলা ছড়িয়ে সম্মান প্রদর্শনের রীতি এবং উপরে বর্ণিত কবির জলসার হাস্যকর অনুষ্ঠান। তাদের ভেতর অনেকেরই আরেকটি দুষণীয় অভ্যাস হলো গলিত মাংস এবং কুকুর ও গাধার মাংস ভক্ষণ।
আমি মালীতে পৌঁছে ৭৫৩ হিজরীর ১৪ই জমাদিয়ল আউয়াল মাসে (২৮শে জুন, ১৩৫২ খৃষ্টাব্দ) এবং মালী ত্যাগ করি পরের বছরের ২২শে মহম (২৭শে ফেব্রুয়ারী, ১৩৫৩)। আমার সঙ্গী ছিলেন আবুবকর ইব্নে ইয়াকুব। আমরা মিমার পথে চলতে লাগলাম। আমার একটি উট ছিল। আমি সেই উটে সওয়ার হয়ে যাচ্ছিলাম। কারণ। ঘোড়ার মূল্য এখানে খুব বেশী। প্রতিটির মূল্য প্রায় একশ মিশকাল! আমরা প্রশস্ত একটি খালের ধারে এসে পৌঁছলাম। নীলনদ থেকে এ খালটি বয়ে এসেছে। নৌকা ছাড়া এ খাল পার হওয়া যায় না। এখানে মশার উৎপাত খুব বেশী। রাত্রে ছাড়া কেউ। পথ চলতে পারে না। এখানে পৌঁছার পর বিশালকায় ষোলটি জন্তু নজরে পড়ল সে গুলিকে হাতী মনে করে আমি বিস্মিত হলাম। কারণ সে দেশে হাতী যথেষ্ট দেখা যায়। পরে দেখতে পেলাম, জন্তগুলি সব খালে গিয়ে নামল। তখন আমার সঙ্গী আবুবকরকে জিজ্ঞেস করলাম, “এগুলি আবার কি রকম জীব?”
তিনি বললেন,”এগুলি হিপোপোটেমাস, ডাঙ্গায় চড়ে বেড়াতে এসেছে।” হিপোপোটেমাস আকারে ঘোড়ার চেয়ে বড় কিন্তু তাদের কেশরও আছে লেজও আছে। এমন কি তাদের মাথাও ঘোড়ার মাথার মতই, শুধু পা হাতীর পায়ের মত। হিপোপোটেমাস আরেকবার দেখেছিলাম নীলনদ দিয়ে তামাকতু থেকে গাওগাও যাবার পথে। নদীতে সাঁতার কাটতে-কাটতে সেগুলি এক একবার মাথা তুলে জোরে নিঃশ্বাস ছাড়ছিল। নৌকার লোকেরা নদীর কিনার ঘেসে চলছিল, তাদের ভয় পাছে বা হিপোপোটেমাস তাদের নৌকাই ডুবিয়ে দেয়।
এদেশের লোকের হিপোপোটেমাস শিকারের কৌশলটি চমৎকার। এ কাজে শক্ত দড়ি লাগানো বর্শা তারা ব্যবহার করে। বর্শা নিক্ষেপ করলে তা যদি জন্তুটার পায়ে বা ঘাড়ে লাগে তবে এপিট-ওপিঠ হয়ে যায়। তারপর তারা সেই জন্তুটাকে দড়ির সাহায্যে টেনে ডাঙ্গায় তোলে। তারা তখন সেটাকে মেরে তার মাংস ভক্ষণ করে। নদীর তীরে হিপোপোটেমাসের বহু পরিমাণ হাড়গোড় পড়ে থাকতে দেখা যায়।
এ নদীর ধারেই বড় একটি গ্রামে এসে আমরা উঠলাম। গ্রামের মোড়ল ফারবা মাঘা নামে একজন কাফ্রী হাজী। তিনি একজন সৎ লোক। ইনি সুলতান মানসা মুসার সঙ্গে হজ করেছেন। ফারবা মাঘার কাছে শুনলাম, একবার সুলতান মানসা মুসা যখন এ খালের ধারে এসেছিলেন তখন তার সঙ্গে একজন শ্বেতকায় কাজী ছিলেন। এ কাজী চার হাজার মিশকাল নিয়ে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করছিলেন। সুলতান তা জানতে পেরে ভয়ানক রেগে যান এবং সেই শ্বেতকায় কাজীকে নরখাদক জংলীদের দেশে নির্বাসিত করেন। কাজী চার বছর তাদের মধ্যে বেঁচে ছিলেন। পরে সুলতান তাকে আনিয়ে তার দেশে পাঠিয়ে দেন। লোকটি শ্বেতকায় ছিলেন বলেই জংলীরা তার মাংস ভক্ষণ করেনি। জংলীদের ধারণা, শ্বেতকায় লোকদের মাংস হজম হয় না, কারণ তাদের মাংস ‘পরিপক্ক’ নয়। পক্ষান্তরে তাদের মতে কৃষ্ণকায় লোকদের মাংস পরিপক।
নরখাদক এ কাফ্রীদের একটি দল একবার এসেছিল সুলতান মানসা সুলায়মানের সঙ্গে দেখা করতে। সঙ্গে তাদের আমীরও ছিল। এরা কানে বড় বড় আংটী ব্যবহার। করে। আংটীর ভেতরকার পরিধি হবে প্রায় এক বিঘত। গাত্রাবরণ হিসাবে ব্যবহার করে আঙরাখা। তাদের দেশে একটা স্বর্ণখনি আছে। সুলতান সসম্মানে তাদের অভ্যর্থনা জানালেন। একটি নিগ্রো বালিকাকে তাদের হাতে দিয়ে অতিথি সকার করলেন। তারা সেই বালিকাকে হত্যা করে তার মাংস ভক্ষণ করল। তারপর সুলতানকে ধন্যবাদ জানাতে এল সেই বালিকার রক্ত মুখে ও হাতে মেখে। শুনেছি সুলতানের দরবারে এলে। এই তাদের প্রচলিত অনুষ্ঠান। এদের সম্বন্ধে বলতে গিয়ে একজন আমাকে বলেছে। নারীদেহের বক্ষ ও হাতের মাংস এদের কাছে সবচেয়ে পছন্দসই।
