তখন কাজীও ইব্নে-আল-ফাঁকি দাঁড়িয়ে বললেন, “ইনি হুজুরকে আগেই একদিন সালাম জানিয়েছেন এবং হুজুর তাকে খাবার পাঠিয়েছেন।”
এ কথার পর তিনি আমার বাসের জন্য একখানা ঘর এবং দৈনিক ব্যয়নির্বাহের জন্য কিছু অর্থ বরাদ্দ করে দিলেন। পরে ২৭ শে রমজানের রাত্রে তিনি কাজী, ইমাম ও শাস্ত্ৰজ্ঞেদের মধ্যে কিছু অর্থ বিতরণ করলেন ২৩। একে তারা জাকাত(ভিক্ষা) বলে। তাঁদের কিছু অংশ ৩৩.৩৩ মিস্কাল আমাকেও দেওয়া হল। এবং মালী ত্যাগের সময় তিনি আমাকে এক শ’ স্বর্ণমিসকাল উপঢৌকন দিয়েছিলেন।
কোনো কোনো সময় সুলতানের নিজের প্রাসাদের চত্বরে দরবারের আয়োজন হয়। সেখানে একটি গাছের নীচে তিন ধাপওয়ালা একটি বেদী আছে। এরা বেদীকে বলে পেম্পি ২৪। বেদীটি রেশমী কাপড়ে মোড়া গদীযুক্ত। উপরে রয়েছে চাঁদোয়ার মত রেশমী ছাতা, তার উপরে সোনার তৈরী একটি পাখী। পাখীটির আকার একটি বাজপাখীর সমান। হাতে একটি ধনুক, পিটে ঝুলানো তুণ নিয়ে সুলতান বেরিয়ে আসেন প্রাসাদের এক কোণের একটি দরজা খুলে। তার মাথায় একটি টুপি সোনালী ফিতায় বাঁধা। ফিতার অগ্রভাগের আকার ছুরির মত এবং লম্বায় এক বিঘতের বেশী। ইউরোপের তৈরী এক প্রকার কাপড়ের নাম মুতানফাস। লালরঙের মখমলসদৃশ্য সেই কাপড়ে তৈরী আঙরখো সুলতানের সাধারণ পোষাক। সুলতানের আগে-আগে আসে। তার বাদকদল। তাদের হাতে সোনা ও রূপার দোতারা বাদ্যযন্ত্র বা গীটার। সুলতানের। পশ্চাতে থাকে তিন শ’ সশস্ত্র ক্রীতদাস। অতি আরাম আয়াসে ধীর পদক্ষেপে সুলতান। হেঁটে আসতে থাকেন, হাঁটতে-হাঁটতে সময়-সময় থেমেও যান। বেদী অবধি পৌঁছে তিনি চারদিক তাকিয়ে দেখেন, তারপর মসজিদের ইমাম যেমন করে মিম্বারে উঠে দাঁড়ান তেমনি করে তিনিও বেদীতে ওঠেন। সুলতান আসন গ্রহণ করতেই জয়ঢাক, নাকড়া ও শিঙা বেজে ওঠে। তিনজন ক্রীতদাস দৌড়ে যায় রাজার অমাত্য ও সেনানায়কদের ডেকে আনতে। তারা তখন এসে আসন গ্রহণ করেন। অতঃপর আনা হয় জিন্ ও লাগাম লাগানো দু’টি ঘোড়া এবং সে সঙ্গে দুটি ছাগল। তারা মনে করে এগুলো কোনো কিছুর কুদৃষ্টি থেকে তাদের রক্ষা করবে। তখন দোভাষী দুঘা এসে প্রবেশদ্বারে দাঁড়ায় এবং বাকি সবাই থাকে গাছের নীচে।
কাফ্রীরা সবাই তাদের রাজার খুব অনুগত। রাজার কাছে আচারে ব্যবহারে তারা নিজেদের তুচ্ছাতিতুচ্ছ মনে করে। ‘মানসা সুলায়মান কি’২৫ বলে তারা সুলতানের নামে শপথ গ্রহণ করে। দরবারে বসে তিনি কাউকে সমন দিলে সে ব্যক্তি গায়ের জামা ও পাগড়ী খুলে ছেঁড়া জামা পরিধান করে মাথায় একটি ময়লা গোল টুপি দিয়ে পাজামা ও অন্যান্য পোশাক হাঁটু অধিক তুলে দরবারে প্রবেশ করে। তারপর সে অগ্রসর হয় নিজকে অত্যন্ত হেয় অপরাধী মনে করে। এবং কনুইয়ের সাহায্যে মাটীতে শক্ত ঘা দিয়ে সুলতান যা বলেন তা শুনবার জন্য পিঠ বাঁকিয়ে মাথা নত করে দাঁড়ায়। যদি কেউ রাজাকে কিছু বলে তার জবাব পায় তাহলে পিঠের কাপড় উন্মোচন করে পিঠ ও মাথার উপর দিয়ে ধুলি নিক্ষেপ করতে থাকে ঠিক যেমন করে কোনো জ্ঞানার্থী তার গাত্রে পানি সিঞ্চন করে। তবু তারা কেননা যে অন্ধ হয় না তাই ভেবে আমি অবাক হয়ে যেতাম। দরবারের সময় সুলতান যদি কোনো মন্তব্য করেন তবে উপস্থিত শ্রোতারা মাথার পাগড়ী নামিয়ে রেখে নিঃশব্দে তা মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করে। সময়-সময় তাদের। একজন সুলতানের সামনে উঠে দাঁড়ায় এবং সুলতানের জন্য সে কি করেছে তা প্রকাশ। করে। সে বলে, “অমুক দিন আমি এ কাজ করেছি অথবা আমি অমুক দিন অমুককে হত্যা করেছি। এ বিষয় যারা জ্ঞাত থাকে তারা তখন তার কথা সমর্থন করে তীর ছুঁড়বার মত করে তার নিজের ধনুকের ছিলো টানে। তখন সুলতান যদি বলেন যে সত্য কথাই বলেছে অথবা যদি তাকে তিনি ধন্যবাদ দেন তবে সে পিঠের কাপড় সরিয়ে পিঠে ও মাথায় ধূলা ছড়াতে থাকে। এই তাদের দ্র ব্যবহার।
ইব্নে জুজাই বলেন, “শুনেছি হাজী মুসা-আল-ওয়ানজারাতি(ম্যানডিংগো) যখন মাসা সুলায়মানের দূত হিসাবে খলিফা আবুল হাসানের দরবারে এসেছিলেন তখন তার একজন সঙ্গী এক টুকরি খুলিও সঙ্গে এনেছিল। আমাদের খলিফা যখনই কোনো ভাল কথা বলতেন তখনই দূত তাঁর নিজের দেশের রীতি অনুযায়ী সেই ধূলা গায়ে নিক্ষেপ করতেন।”
আমি মালীতে থাকাকালে দুবার কোরবানী ও একবার ঈদুল ফেতর দেখেছি। এ সব উৎসবের দিনে জহরের নামাজের পর সুলতান গিয়ে পেমপিতে আসন গ্রহণ করেন। তখন যুদ্ধের সাজসজ্জা বহনকারীরা সুদৃশ্য অস্ত্রপাতি যথা, সোনা ও রূপার তৈরী তুণ, সোনার কারুকার্য খচিত তরবারী, তরবারীর সোনালী খাপ, রূপার বর্শা, স্ফটিকের রাজদণ্ড প্রভৃতি সেখানে এনে হাজির করে। ঘোড়ার জি-রিকাবের মত এক রকম রৌপ্য অলঙ্কার হাতে দিয়ে চারজন আমীর সুলতানের পেছনে দাঁড়িয়ে মাছি তাড়ান। সেনাপতি, কাজী ও ইমাম এসে তাদের নির্দিষ্ট আসনে বসেন। দোভাষী দুঘা আসেন তাঁর চার বিবি ও বাদীদের নিয়ে। বাঁদী-বালিকাদের সংখ্যা প্রায় শতেক। তাদের পরিচ্ছদ অতি মনোরম। মাথায় স্বর্ণ ও রৌপ্য খচিত ফিতা। ফিতায় ঝুলানো সোনা ও রূপার বল। দুঘার আসন হিসাবে সেখানে একখানা চেয়ার রাখা হয়। নলদ্বারা তৈরী এবং নিম্নদিকে লাউয়ের খেলায় লাগানো একটি বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে দোভাষী সুলতানের সাহসিকতাও বীরত্বসূচক একটি কবিতা আবৃত্তি করেন। মেয়েরা তার সঙ্গে গান করে এবং ধনুক নিয়ে খেলা করে। তাদের সঙ্গে থাকে মাথার শাফা টুপি ও লাল রংএর উলেন খেলকা পরিহিত প্রায় ত্রিশ জন যুবক। কাঁধ থেকে ঝুলানো জয়ঢাক বাজায় সে সব যুবকেরা। তারপরে আসে তাঁর শিষ্য বালক দল। তারা খেলা করে এবং সিন্ধুর অধিবাসীদের মত শূন্যে চাকা ঘুরায়। এ খেলায় তাদের তৎপরতা ও উৎসাহ প্রশংসনীয়। তাদের তরবারী খেলাও চাতুর্যপূর্ণ। দুঘা নিজেও ভাল তরবারী খেলতে পারেন। অতঃপর সুলতান দোভাষীকে পুরস্কার দিতে হুকুম করেন। দু’শ মিশকাল মূল্যের স্বর্ণরেণু পূর্ণ একটি তোেড়া তাঁকে পুরস্কার দেওয়া হয়। এবং তা উপস্থিত সকলের সম্মুখে ঘোষণা করা হয়। তখন সেনা-নায়করা উঠে তাদের ধনুকে টঙ্কার দিয়ে সুলতানকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে। পরের দিন তাদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ পদমর্যাদানুযায়ী এক একটি উপহার দেন দোভাষীকে। প্রতি শুক্রবার আসরের নামাজের। পরে দুঘা উপরোল্লিত অনুষ্ঠানের পুনরাবৃত্তি করেন।
