নীলনদের এদিকটায় একদিন পাড়ের অতি নিকটে আমি একটি কুমীর দেখতে পেয়েছিলাম। কুমীরটা ঠিক একটা নৌকার মত দেখাচ্ছিল। একদিন আমার ব্যক্তিগত প্রয়োজন মিটাতে নদীর পাড়ে গিয়েছিলাম। হঠাৎ দেখলাম একজন কৃষ্ণকায় নদী ও আমার মধ্যবর্তী স্থানে দাঁড়িয়ে আছে। তার মধ্যে আদব ও শ্লীলতার এ অভাব দেখে আমি বিস্মিত হলাম এবং একজনের কাছে তা প্রকাশ করলাম। সে বলল, আপনার এবং কুমীরের মধ্যস্থলে দাঁড়িয়ে কুমীরের হাত থেকে আপনাকে রক্ষা করাই ছিল তার উদ্দেশ্য।
অতঃপর আমরা কারসাধু থেকে রওয়ানা হয়ে মালীর দশ মাইল দূরে সানসারা নদীর তীরে এলাম। অনুমতি ছাড়া সেখানে কারও শহরে যাবার নিয়ম নেই। আমি আগেই সেখানকার শ্বেতকায়দের অনুরোধ করে চিঠি লিখেছিলাম আমার জন্য একখানা ঘর ভাড়া করে রাখতে। কাজেই এ নদীর পারে এসে বিনা বাধায়ই আমি খেয়া পার হয়ে গেলাম। এভাবে কাফ্রীদের ১৯ রাজধানী মালীতে এসে পৌঁছলাম।
শ্বেতকায়দের মহল্লায় গিয়ে মোহাম্মদ ইব্নে-আল-ফকির কথা জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম আমার জন্য একখানা ঘর ভাড়া করা হয়েছে। আমি সেখানে গিয়ে উঠলাম। তার জামাতা এসে আমাকে মোমবাতি ও খাবার দিয়ে গেল। পরের দিন আরও কয়েকজন গণ্যমান্য লোক সঙ্গে নিয়ে ইব্নে-আল-ফকি নিজে আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। মালীর কাজী আবদুর রহমান এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গেও আমার দেখা হল। তিনি সচ্চরিত্র একজন কাফ্রী হাজী। সেখানকার দোভাষী দূঘার সঙ্গেও আমার আলাপ হল। কাফ্রীদের মধ্যে তিনি একজন খ্যাতনামা ব্যক্তি। এঁরা সবাই আমাকে অতিথি হিসাবে খাদ্য পরিবেশন করেন এবং অনুগ্রহ প্রদর্শন করেন। খোদা যেন তাদের মঙ্গল করেন। এখানে আগমনের দশদিন পরে আলু জাতীয় বস্তু দিয়ে তৈরী এক ধরনের লাবসী খেলাম। এ লাবসী এদের সবচেয়ে প্রিয় খাদ্য। আমাদের দলের ছয়জনের সবাই অসুস্থ হয়ে পড়লাম এবং একজন এন্তেকাল করল। আমিও ফজরের নামাজ পড়তে গিয়েই সেখানেই অজ্ঞান হয়ে গেলাম। এ রোগের প্রতিষেধক কিছু আছে কিনা একজন মিশরীয়কে তা জিজ্ঞেস করায় সে আমাকে গাছ গাছড়ার শিকড় দিয়ে তৈরী ‘বেদার নামক এক রকম জিনিষ এনে দিল। তার সঙ্গে মৌরী ও চিনি পানিতে মিশিয়ে খেতেই আমার বমি হয়েই গেল। তার ফলে যা খেয়েছিলাম তার সবই বেরিয়ে গেল এবং সেই সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে পিত্তরসও বেরিয়ে গেল। খোদা আমাকে মৃত্যুর কবল থেকে রক্ষা করলেন কিন্তু দু’মাস আমাকে অসুস্থ থাকতে হল।
মালীর সুলতানের নাম মানসা সুলায়মান। সুলায়মান ২১ তার আসল নাম এবং মাসা অর্থ সুলতান। তিনি একজন কৃপণ প্রকৃতির রাজা। তার কাছে কেউ কোনো মুল্যবান পারিতোষিক পাবার আশাও করতে পারে না। আমি অসুস্থ থাকায় এ দু’মাস তার সঙ্গে দেখা করতে পারিনি। অবশেষে তিনি আমাদের খলিফা মরোক্কোর ভূতপূর্ব। সুলতান আবুল হাসানের স্মৃতি উদ্যাপনোপলক্ষে এক ভোজসভার আয়োজন করলেন। সেনাপতি, চিকিৎসক কাজী, ইমাম প্রভৃতি সবাই তাতে নিমন্ত্রিত হয়েছিলেন। তাদের সঙ্গে আমিও ভোজসভায় যোগদান করলাম। সেখানে কোরাণ শরীফ পাঠের পর খলিফা আবুল হাসান ও মান্সা সুলায়মানের জন্য মোনাজাত করা হল। অনুষ্ঠান শেষ হতেই আমি মান্সা সুলায়মানের কাছে এগিয়ে গিয়ে তাঁকে সালাম করলাম। কাজী, ইমাম ও ইব্নে-আল-ফকি তাকে আমার পরিচয় দিতে তিনি তাদের ভাষায় উত্তর দিলেন। তাঁরা আমাকে বললেন, “সুলতান খোদাকে ধন্যবাদ দিতে বলছেন।”
আমি বললাম, “সকল অবস্থার ভেতরেই তার প্রশংসা করি এবং তাকে ধন্যবাদ জানাই ২২।
আমি সেখান থেকে ফিরে আসার পর সুলতান আমাকে মেহমান হিসাবে খাদ্য পাঠালেন। প্রথমে তা পাঠানো হয়েছিলো কাজীর গৃহে। কাজী নিজের লোক দিয়ে সে। সব পাঠালেন ইব্নে-আল-ফকির গৃহে। ইব্নে-আল্-ফকি নগ্নপদেই তাড়াতাড়ি আমার গৃহে প্রবেশ করে বললেন”উঠে দাঁড়ান, এই যে আপনার জন্য সুলতানের দেওয়া, পারিতোষিক এসেছে।”
আমি উঠে দাঁড়ালাম এবং পারিতোষিক বলাতে ভাবলাম, নিশ্চয়ই সুলতান আমাকে সম্মানসূচক পরিচ্ছদ ও অর্থ পাঠিয়েছেন। কিন্তু দেখলাম তিনি পাঠিয়েছেন তিন খান। রুটি, পিঠা, ও তেলে ভাজা এক টুকরো গরুর গোশত এবং এক পাত্র টক দৈ। এ সামান্য বস্তু উপলক্ষে করে এতটা ঘটা তারা করতে পারে দেখে আমি সশব্দে হেসে উঠলাম।
এ ঘটনার পর দু’মাস আমি আর কিছুই পেলাম না। তারপর শুরু হল রমজান মাস। ইত্যবসরে আমি প্রায়ই সুলতানের প্রাসাদে যেতে আরম্ভ করেছি। সেখানে গিয়ে সুলতানকে সালাম দিয়ে কাজী ও ইমামের পাশে বসে থাকতাম। তখন দোভাষী দুঘর আমাকে একদিন বললেন,”সুলতানের সঙ্গে নিজে কথা বলুন। আমি পরে আপনার তরফ থেকে তাকে আপনার প্রয়োজনের কথা বুঝিয়ে বলব।”
রমজানের প্রথম দিকে সুলতান যখন এক দরবারের আয়োজন করলেন, আমি তার সামনে দাঁড়িয়ে বললাম,”আমি দুনিয়ার অনেক দেশ সফর করেছি এবং সেখানকার সুলতানদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। অজি চার মাস হতে চলেছে আমি এখানে এসেছি কিন্তু আজ অবধি হুজুর আমাকে কোনো পারিতোষিক বা অন্য কিছুই দেননি। আপনার সম্বন্ধে আমি অপর সুলতানদের কাছে কি বলব?”
সুলতান বললেন, “আমি আপনাকে দেখিনি বা কেউ আপনার কথা আমাকে জানায়ওনি।”
